বাংলাদেশের ২০২৬ নির্বাচন: বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক পুনরুত্থানের এক অগ্নিপরীক্ষা

মুজাহিদ ইসলাম
মুজাহিদ ইসলাম
বাংলাদেশের ২০২৬ নির্বাচন: বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক পুনরুত্থানের এক অগ্নিপরীক্ষা
প্রতীকী ছবি

সারা বিশ্বে যখন কর্তৃত্ববাদের অবস্থান শক্ত হচ্ছে, তখন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্ভবত নির্ধারণ করবে যে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ আদৌ সম্ভব কিনা। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামল— যা কারচুপির ভোট, রাজনৈতিক নির্দেশে চলা আদালত এবং ব্যাপক নজরদারি দ্বারা জর্জরিত ছিল। ২০২৪ সালে একটি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ওই সরকার অপসারিত হয়। এটি কোনো অভিজাত শ্রেণির অভ্যুত্থান বা বিদেশি হস্তক্ষেপ ছিল না, বরং এটি ছিল সাধারণ মানুষের একটি স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ, দীর্ঘদিন ধরে জনগণের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

এখন, নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটটি নির্ধারণ করবে যে বাংলাদেশ এই ভঙ্গুর আশাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারবে কি না। অন্যথায়, ভেনেজুয়েলা থেকে বেলারুশের মতো ব্যর্থ রূপান্তরের দীর্ঘ তালিকায় নাম লিখিয়ে একটি রূঢ় শিক্ষা দেবে যে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেয়ে কর্তৃত্ববাদকে সুসংহত করা অনেক সহজ।

যদি এই নির্বাচন সফল হয়, তবে বাংলাদেশ এশিয়া এবং এর বাইরের কোণঠাসা গণতন্ত্রকামীদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। আর যদি না হয়, তবে এটি সেই সব হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতাকেই বৈধতা দেবে। যারা নির্বাচনের অনুকরণ করলেও আদতে প্রতিযোগিতার পথ রুদ্ধ করে দেয়।

গত প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশিরা একটি অন্তঃসারশূন্য গণতন্ত্র এবং ভয়ের রাজত্ব সহ্য করেছে। নির্বাচনগুলো সময়মতো অনুষ্ঠিত হলেও ব্যালট বক্স ভর্তি করা, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এবং গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের মাধ্যমে ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত থাকত। এই শাসনের আসল শক্তি ছিল মানুষের মধ্যে একধরনের অনীহা বা উদাসীনতা তৈরি করা। নাগরিকরা জানতেন যে তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই এবং প্রতিবাদ করার অর্থ হলো চরম ব্যক্তিগত ঝুঁকি। মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশিরা প্রতিরোধের নিরর্থকতা মেনে নিয়েছে।

হাসিনার পতন এই প্রচলিত ধারণা বা স্ক্রিপ্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সূত্রপাত হলেও, সাধারণ পরিবার, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষ যুক্ত হওয়ার ফলে তা দ্রুত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সুদান বা মিয়ানমারের মতো উচ্চপদস্থদের দ্বারা পরিচালিত বিদ্রোহের বিপরীতে এটি ছিল তৃণমূল পর্যায়ের এক বিদ্রোহ। নিরাপত্তা বাহিনী যখন দমন-পীড়ন চালিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করল, তখন তা মানুষের মধ্যে আরও ক্ষোভ উসকে দিল। তিউনিসিয়ার আরব বসন্তের মতো এখানেও মানুষ যখন বুঝতে পারল তারা একা নয়, তখন ভয় কর্পূরের মতো উবে গেল।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনার। ফাইল ছবি
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনার। ফাইল ছবি

এই গণঅভ্যুত্থান রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়েও গভীর কিছু ফিরিয়ে দিয়েছে, তা হলো মর্যাদা। বাংলাদেশিরা তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে। তারা শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন নয়, বরং নাগরিক হিসেবে সম্মান দাবি করেছে। আজ ভোটার নিবন্ধনের হার বেড়েছে, সভা-সমাবেশ হচ্ছে এবং হাটবাজার থেকে শুরু করে অনলাইন ফোরামগুলোতে উন্মুক্ত আলোচনা চলছে। এই নাগরিক জাগরণ ২০১৯ সালের হংকং প্রতিবাদ বা ২০২২ সালের ইরানের নারী-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের প্রতিফলন, যেখানে সম্মিলিত অবাধ্যতা কর্তৃত্ববাদী বিচ্ছিন্নতাকে চূর্ণ করেছিল।

তবে ইতিহাস সতর্ক করে যে, এমন মুহূর্তগুলো ক্ষণস্থায়ী। হংকং এবং ইরান—উভয় ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া এই উজ্জ্বল আশা সহজেই হতাশায় রূপ নিতে পারে।

গণতান্ত্রিক উত্তরণ কেবল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সফল হয় না। এটি নির্ভর করে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ওপর। স্বৈরাচারীরা সমাজকে বিচ্ছিন্ন করে টিকে থাকে, যাতে প্রতিবাদকে একাকী এবং আত্মঘাতী মনে হয়। বাংলাদেশের সফলতা সেখানেই, যেখানে সম্মিলিত পদক্ষেপ এই বিভ্রমকে ভেঙে চূর্ণ করেছে এবং অংশগ্রহণের একটি জোয়ার তৈরি করেছে।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এখন একটি অত্যন্ত কঠিন কাজের সম্মুখীন। গণজাগরণকে টেকসই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার এই চ্যালেঞ্জকে অনেকে মিশন ইম্পসিবল বলছেন। নির্বাচন কমিশন সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার করেছেন ড. ইউনূস। তবে চ্যালেঞ্জও পাহাড়সম।

২০২৪-এর দমন-পীড়নে জড়িত নিরাপত্তা বাহিনীর আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন, সংস্কারের সময়সীমা ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে অভিজাত শ্রেণির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক মেরুকরণ, ক্রমবর্ধমান মব ভায়োলেন্স ও ক্রমাগত অর্থনৈতিক চাপ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস

অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০১১ সালে তিউনিসিয়ার বিপ্লব অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে সাময়িকভাবে সফল হয়েছিল, কিন্তু অর্থনৈতিক দুর্দশা ও অভিজাতদের ক্ষমতা দখলের কারণে তা আবার পিছিয়ে যায়। অন্যদিকে, মিশরের আরব বসন্ত সংস্কারের অভাবে সামরিক শাসনে পরিণত হয়। বাংলাদেশকে এই ফাঁদগুলো এড়াতে হবে। স্বচ্ছ ভোটার তালিকা, নিরপেক্ষ পুলিশিং এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ পাকিস্তান বা থাইল্যান্ডের মতো প্রতিবেশীদের জন্য একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে, যেখানে নির্বাচনী কারচুপি এখন এক নিয়মিত ঘটনা।

বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের যখন মন্দা চলছে, তখন বাংলাদেশের ভাগ্য এর সীমান্তের বাইরেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ডেমোক্রেসি ইনডেক্স বা গণতন্ত্র সূচক অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের অবনতি ঘটছে। হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান বা ভারতের নরেন্দ্র মোদির মতো প্রভাবশালী নেতারা প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদকে নিখুঁত রূপ দিয়েছেন। গণতন্ত্রের এই পতনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি বিরল উদাহরণ। দেশটিতে গণজাগরণ হয়েছে বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই। এমনকি দীর্ঘদিনের শাসকদেরও উৎখাত করতে সক্ষম হয়েছে। এখন শর্ত শুধু একটাই, প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই অর্জন দ্রুত সুসংহত করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের জন্য ঢাকার এই রূপান্তরকে সমর্থন করা তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষ করে চীনের প্রভাব মোকাবিলায়। বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রজেক্ট বাংলাদেশকে ঋণের জালে ফেলেছে, অন্যদিকে ভারত তাদের সীমান্তে অস্থিতিশীলতার ভয়ে দীর্ঘদিন হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে এসেছে এবং এখন নতুন নেতৃত্বের সাথে সাবধানে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন মিত্রতাকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে ব্যর্থতা স্বৈরাচারীদের আরও সাহসী করে তুলবে— এই বার্তা দিয়ে যে নাগরিক অভ্যুত্থান কেবল সাময়িক জয় আনে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে কারিগরি সহায়তা, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অন্তর্বর্তী সময়কে স্থিতিশীল করতে অর্থনৈতিক ত্রাণ দিয়ে ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের নীতিনির্ধারকদের উচিত বাংলাদেশের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দিল্লি ও বেইজিংয়ের জন্যও স্থিতিশীলতা বাণিজ্যের জন্য সহায়ক, যদিও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। বাংলাদেশের প্রকৃত স্থিতিশীলতা শেষ পর্যন্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই আসবে, যেখানে মানুষ যাকে খুশি ভোট দেবে, ফলাফল সম্মান করা হবে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে।

২০২৬ সালের নির্বাচন কোনো সাধারণ ভোট নয়। এটি বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্যগুলোকে সংহত করার একটি গণভোট। গণতন্ত্রের ওপর বিশ্বাস ফিরে এসেছে, তবে এর জন্য বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ নিরাপত্তা বাহিনী, ন্যায়বিচার এবং মুক্ত গণমাধ্যম। যদি কারচুপির সন্দেহ দেখা দেয় বা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তবে জনবিশ্বাস কর্পূরের মতো উড়ে যাবে, যা পপুলিস্ট শক্তিশালী নেতা বা সামরিক হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করবে।

সফল হতে হলে ইউনূস সরকারকে সংস্কারের গতি বাড়িয়ে একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে, সুশীল সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং বিশেষ মহলের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা রুখে দিতে হবে। বিশ্বকে কেবল পর্যবেক্ষণই নয়, সহায়তাও করতে হবে। বাংলাদেশ দুর্বল বলে নয়, বরং তার এই পরীক্ষাটি একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রের টিকে থাকার সক্ষমতা যাচাই করছে। এটি সফল হলে তা সারা বিশ্বের নিপীড়িত সমাজকে মনে করিয়ে দেবে যে, পরিবর্তন সম্ভব। আর ব্যর্থ হলে স্বৈরাচারীদের জন্য বার্তাটি হবে স্পষ্ট, ভিড় সরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকো, ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত ফিরে আসবেই।

লেখক: নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এসএসএইচআরসি পোস্টডক্টরাল ফেলো

(নিবন্ধটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনূদিত)

সম্পর্কিত