ভোটের বাক্সে স্বপ্ন, চোখে সংশয়

হামিদ রায়হান
হামিদ রায়হান
ভোটের বাক্সে স্বপ্ন, চোখে সংশয়
ছবি: চরচা

শীতের ভোরে, ঘুম থেকে ওঠার পূর্বে মনে হয়-আজ আবার সেই প্রশ্ন যেন আমার গোপন কণ্ঠে ফিসফিস করে: আমার ভোটের মূল্য কত? মনে পড়ে, নির্বাচনের দিন যত কাছে আসে, তত কাছে আসে সেসব জনমতের অনুভূত দোলাচল, আর প্রত্যাশা ও হতাশা এক অদৃশ্য রেখায় লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। এখনো ভোটের দিন হিসেবে ১২ ফেব্রুয়ারি ঠিক আছে। সঙ্গে, আছে গণভোটও-সেই সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য যা ভোটের সঙ্গে একসাথে অনুষ্ঠিত হবে।

আজও খবরের শিরোনামে দেখা যায়, ভোটাররা কী ভাবছে, কাকে পছন্দ করছে, কাকে না-সেটা বোঝা যাচ্ছে না, কাগজে কলমে ভরা এ রাজনৈতিক তালিকাগুলো যেন মানুষের মনের তালুর মতো বদলে যাচ্ছে নেওয়া-দেওয়ার সুরে। “জনগণের মুখে তালা আছে”, এমন একটি কথা প্রচলিত সম্প্রতি মানুষের মধ্যে। এটা বলা হচ্ছে, ভোটের মাত্র ৯ দিন বাকি কিন্তু ভোটারদের সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে।

মনে পড়ে, গ্রামে খাল ঘেঁষে বসে থাকা সেই বুড়ো, যিনি দিনের আলো ফোটার পূর্বেই বলেছিলেন, “আমরা ভোট দিয়েই তো দেশ গড়ার কথা ভাবতাম।” তার চোখে স্মৃতি আর কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস-পুরোনো দিনের কথা, দায়িত্ববোধ, স্বাধীনতার প্রথম অনুভূতি যেন আবার ফিরে আসে তার বয়োজ্যেষ্ঠ কণ্ঠে। গ্রাম জুড়ে যেন বয়ে চলেছে সেই পুরোনো আশা-ভোট হলেই এ বদল আসবে। একইভাবে, শহরের সেই ছোট্ট চায়ের দোকান-ক্যাফেগুলোতে চা চুমুক দিতে দিতে এক যুবক বলল, ভোট দেব, তবে বদলটা কোথায়? তার কথার রঙ আপন মনে নিজের ইতিহাসে ঢুকে পড়ে, যেন প্রত্যাশার আলো ও বাস্তবতার ছায়া একসঙ্গে তাকে টেন টেনে নিচ্ছে। কারণ, অন্তর্নিহিত একটি জরিপেই দেখা গেছে বাংলাদেশে তরুণদের একটি বড় অংশ, ৮২.৭% বলেছেন তারা রাজনীতিতে অংশ নিতে চায় না। বিশেষত রাজনৈতিক সংঘাতে ভয় এবং দুর্নীতির কারণে।

এ একই তরুণ সমাজের ভেতর অন্য একটি আরেকটি অনুভূতি-ভোট দিতে ইচ্ছুক তরুণও অনেক আছে। বেশির ভাগ তরুণ আজ ভোটের জন্য নিজেকে প্রস্তুত মনে করে-একটি বড় জরিপে প্রায় ৭৪.২% তরুণ বলেছেন, তারা ভোট দিতে চান। তাদের ভাষায়, ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ভোট দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একা একা সেই তরুণ-তরুণীরা তাদের মনের কথাগুলো কতটা শব্দে প্রকাশ করতে পারে-এটা চাখবার মতো। কেউ বলে, ভোট দিলেই কি আমার জীবনে কাজ, শিক্ষা, নিরাপত্তা বা মর্যাদা আসবে? আর কেউ বলছে, আমি অংশ নিতে চাই, দেশ গড়তে চাই, স্বচ্ছতা চাই। সংবাদে পড়া যায় রাজনৈতিক দলগুলোও এখন তরুণদের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ইশতেহারে দীক্ষিত-তাদের জন্য ইশতেহারে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ভোটারদের মন জয় করতে।

কোনো এক বিকেলের অন্ধকারে ভাবি, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত, সকালের ঘুম থেকে রাতের নিদ্রাহীন অবস্থা পর্যন্ত, সব জায়গায় যেন একটি একটাই প্রশ্ন মোড়ানো: আমি অংশ নেব কি নেব না? এ প্রশ্নটি মাতাল ভাবের মতো ঘুরে বেড়ায় মানুষের ভেতর। আদৌ কি অংশগ্রহণ মানেই যদি বিপদ? বা অংশ নিলেই যদি স্বপ্ন বোনা যায়? গ্রামে সেই বুড়ো বলেন, “ভোট দিয়েই আমাদের অধিকার”-ঔষধি গলার মতো। শহরে তরুণ বলে, “ভোট দেব-কিন্তু কাকে?”-এ যেন বিরক্তি আর দৃষ্টি একসাথে। আর শহরের মধ্যের রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কেউ এ ভাবছে, ভোট মানেই নতুন জীবন, বা আবার পুরোনো প্রত্যাশার পুনরাবৃত্তি।

সন্ধ্যার আকাশে রং নাড়া আলো-এ ভোটেরা যেন মানুষের মনে লেগে থাকা এক পরাবাস্তব গল্পের মতো।

একদিকে প্রৌঢ়রা তাদের পুরোনো স্বপ্ন গাঁথছেন, অন্যদিকে তরুণরা আধুনিক জীবনের সঙ্গে ভোটের কারণ খুঁজছেন-আর সেই খোঁজের পথ যেন কখনো শেষ হচ্ছে না। এভাবেই, প্রতিটি মন, প্রতিটি অনুভূতি একটিমাত্র সাধারণ বাক্যে মিলেমিশে যায়-আমার ভোট আমার গল্প, আমার আশা, আমার ভয়, আমার ভবিষ্যৎ।

গ্রাম আর শহরের দৃষ্টিভঙ্গি, যেন দুই ভিন্ন নদীর মতো-একটি ধীরে, একটিকে দ্রুত বয়ে নিয়ে যায় নিজেদের হিসেব, নিজের ধ্বনি। গ্রামের মানুষের কাছে ভোট মানে এক জীবন্ত উৎসব-সেই দিনটি যেখানে সকলেই গৃহ থেকে বের হয়, হাঁটাহাঁটি করে, চেনা-অচেনা মুখগুলোকে দেখে জানে, আজ দায়িত্ব আমার। তারা দিনের শুরুর ঠান্ডা বাতাসে বলেছে, ভোট না দিলে অন্যায় হবে। মনে মনে যেন সেই ভোটটা তাদের সমাজিক পরিচয়ের অংশ-গ্রামের মাঝির পাড়ের আলাপ, গাছতলায় স্বরের মেলা, চায়ের কাপে কাঁটা, ঠোঁট, হাসি গ্রামের মানুষ শুধু ভোট দেয় না, তারা ভোটকে অনুভব করে-এটা তাদের জীবনের অংশ, তাদের আত্মার অংশ। শহরে ভিন্ন সুর শোনা যায়-রাস্তায় গাড়ির হর্ন, ব্যস্ত মানুষের পদক্ষেপ, আর তরুণদের মুখে প্রশ্ন ভোট দিলেই কি কিছু বদলাবে? শহরের খেলাপি গালপিটে দাঁড়িয়ে কেউ আবার বলছে, আমি ভোট দেব, কিন্তু কি সেটা আমার জীবনে কাজ করবে? এ প্রশ্ন জীবনের প্রতিটা কোণে ঘুরে বেড়ায়-কারণ শহর মানেই বিশ্লেষণ, সন্দেহ আর হিসাব-কতোটা সুরক্ষা, কি শর্তে ভোট হবে, কি ফলাফল আসবে-সব কিছুই আবার প্রশ্নের ঝাঁজে জড়ানো।

এ ভিন্নতাই আজ জাতীয় মানসিকতার বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে-গ্রামের বিশ্বাস আর শহরের অবিশ্বাস পাশাপাশি বসবাস করছে। সাম্প্রতিক সার্ভে রিপোর্টেও দেখা গেছে ভোটারদের মধ্যে সচেতনতার পার্থক্য-গ্রামীণ এলাকায় অনেকে নির্বাচনী পদ্ধতি সম্পর্কে কম জানে, আর শহরে জানলেও সন্দেহ বেশি। উদাহরণস্বরূপ, জনমতের People’s Election Pulse Survey-তে বলা হয়েছে যে, গ্রামীণ মানুষের মধ্যে নবায়নকৃত নির্বাচনী ধারণা সম্পর্কে কম সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে শহরের অনেক ভোটার নতুন পদ্ধতি বা রাজনৈতিক প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে আরও বেশি প্রশ্ন করে থাকতে দেখা যায়। গ্রামে ৫৯% মানুষ কিছু বিষয় সম্পর্কে কম জানে। আর শহরে তা তুলনামূলক কম-৪৯%; এ তথ্যই দেখায় নিরীহভাবে যে ভিন্ন ভিন্ন জীবনের অভিজ্ঞতা ভোটের ব্যাখ্যায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখে-দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অভ্যাস, দলীয় আনুগত্য, বিরোধিতার সংকীর্ণতা-এগুলো মানুষের আস্থায় ফাটল দেয়। শহরের তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিশেষ করে সেই সংকট আরও তীব্র। অনেকে মনে করে, রাজনীতি ও সাধারণ জীবনের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে গেছে এবং ভোট কেবল ক্ষমতার বদল নয়, বিশ্বাসের নবায়ন হওয়া উচিত-কিন্তু কখন, কীভাবে তা হবে-তার কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে শহরের ভোটাররা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আরও তীক্ষ্ণ উদ্বেগ প্রকাশ করছে, এবং অনেকেই প্রশ্ন তুলেছে-এ নির্বাচন কি সত্যিই নির্ভীক ও ন্যায্য হবে?

এমন পরিস্থিতিতে, যখন জনগণ ভোটকে জীবনের এক নিয়ত অংশ বানাতে চায়, তখন অর্থনীতি এ গল্পে নীরব কিন্তু শক্তিশালী চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়। বাজারদর, কর্মসংস্থান, আয়-সবকিছু ভোটের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। শিক্ষিত তরুণদের বহু পরিবারই জানে যে চাকরি খুঁজে পাওয়া সহজ নয়-একাধিক শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানের দরজাগুলো খোলা থাকে খুব কম কিছু ক্ষেত্রে। ফলে ভোট আর কেবল নাগরিক দায়িত্ব মনে হয় না; অনেকের কাছে এটি হয়ে ওঠে শেষ আশ্রয়-শেষ একবারের আশা। তবু সেই আশ্রয় যখন দুর্বল মনে হয়। মানুষ বলে ওঠে, “ভোট দিই বা না দিই।” এ বাক্যটিই যেন বড় একটা মনের ঘুরপথ-একদিকে যারা নির্ভয়ে ভোট দিতে চায়, অন্যদিকে যারা প্রশ্ন করে- ভোট থেকে কি সত্যি কোনো বদল আসবে? এ দ্বন্দ্ব আর দ্বিধা মানুষের মধ্যে নতুন করে জন্ম নেয়, বারবার, ধীরে ধীরে।

সাম্প্রতিক সার্ভেও এ একই চিত্র বলছে, অনেকে ভোট দিতে আগ্রহী, অথচ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পূর্বে আরেকবার ভাবেন, ফল কি আলাদা হবে?

এ মানসিকতার পেছনে সামাজিক কারণগুলো গভীর-বারবার প্রতিশ্রুতি, বারবার ভাঙন, বারবার আশা, বারবার ক্লান্তি-মানুষ শিখে গেছে প্রত্যাশা কমাতে, আবেগ লুকোতে, আবার শান্তভাবে নিজেকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাতে। নির্বাচনের আগেই অনেকেই নিজের মনে হিসাব করে, আমি গেলাম, না গেলাম, ভোট দিলে কি ফলাফল বদলায়, কি অপরিবর্তিত থাকে-সব কিছু ছায়ার মতো ভেসে ওঠে।

তবুও গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ এ জনগণ পুরোপুরি নিরাশ নয়। তারা এখনো দাঁড়িয়ে আছে স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে-সম্ভাবনার অপেক্ষায়, পরিবর্তনের অপেক্ষায়। তারা এখনো শুনতে চায়, দেখতে চায়, বিশ্বাস করতে চায়। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে সেই পুরোনো প্রশ্ন আবার জেগে ওঠে-এ এবার কিছু বদলাবে।

এ ‘হয়ত’র মধ্যেই, এ সিদ্ধান্তহীনতার, এ আশা-ভরসার মধ্যেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রাণ লুকিয়ে আছে-বন্ধুদের কাছে যাওয়ার আগে, নিজের প্রতিফলনে নিজেকে বার্তা দেয়, ‘হয়ত এবার ...’ আর সেই ‘হয়ত’য় গড়ে ওঠে নতুন দিনের আখ্যান।

হামিদ রায়হান: লেখক ও গবেষক

সম্পর্কিত