রাশেদুর রহমান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভিয়েতনামের মাই লাই গণহত্যার ঘটনা সারা বিশ্বের মানুষকে আলোড়িত করেছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালে ১৯৬৮ সালের ১৬ মার্চ তৎকালীন দক্ষিণ ভিয়েতনামের মাই লাই গ্রামে আমেরিকান সেনাবাহিনীর একটি দল নিরস্ত্র নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ কয়েক শ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছিল। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ৩৪৭ থেকে ৫০৪ জন নিহত হয়েছিল। মাই লাই গণহত্যা ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে জঘন্য অপরাধগুলোর মধ্যে একটি।
মাই লাই গণহত্যার খবর মার্কিন বাহিনী ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি। এক বছর আট মাস পর সিমোর হার্শ নামে একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক পুরো ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) মাধ্যমে। সেই সূত্রে এ ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট করে টাইম, লাইফ ও নিউজউইক ইত্যাদি ম্যাগাজিন এবং সিবিএস টেলিভিশন। এ ছাড়া, প্লেইন ডিলার নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ করে গণহত্যার কিছু ছবি। তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে মাই লাইয়ের ঘটনা।
এই ঘটনার তিন বছর পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর শুরু করেছিল তাদের গণহত্যার মিশন ‘অপারেশন সার্চলাইট’। সাঁজোয়া যানের আওয়াজ, গুলির শব্দ, গোলার বিস্ফোরণ আর মানুষের আর্তচিৎকারে ঢাকা বিভীষিকার শহরে পরিণত হয়। পরদিন ২৬ মার্চ সারা দিন ও রাতে সান্ধ্য আইন জারি করে পাকিস্তানি সেনারা দলে দলে রাস্তায় নেমে ভবন, বস্তি ও বাড়িতে আক্রমণ চালায়। দুপুরে পুরান ঢাকার হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় চারদিক থেকে ঘিরে বাড়িগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়। হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
এদিকে তখন ঢাকায় ছিলেন অনেক বিদেশি সাংবাদিক। সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ যাতে তারা যাতে না দেখতে পারেন, সে জন্য তাদের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকে রাখা হয়েছিল। ২৭ মার্চ তাদের ঢাকা থেকে বিমানযোগে বাংলাদেশের বাইরে পাঠানো হয়। সেনাবাহিনীর এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কৌশলে হোটেলে থেকে গিয়েছিলেন ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিবেদক সাইমন ড্রিং। তিনি পাকিস্তানি সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়েন। সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞের বেশির ভাগ প্রমাণ লুকিয়ে ফেলার পরও তিনি তার প্রমাণ দেখতে পান। পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার উপস্থিতি টের পায় এবং তাকে বিমানে ব্যাংককে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে পৌঁছেই তিনি পাকিস্তানিদের বর্বরতা নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন লেখেন। সেই প্রতিবেদন ৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

এই প্রতিবেদন থেকেই বিশ্ববাসী প্রথম বিশদভাবে বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতা সম্পর্কে জানতে পারে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তানে ট্যাংক আক্রমণ: ৭,০০০ নিহত, ঘরবাড়ি ভস্মীভূত’। প্রতিবেদনটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা এখন ধ্বংস ও আতঙ্কের নগরী। ২৩ ঘণ্টা ধরে অবিরাম শেল বর্ষণ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঠান্ডা মাথায় সাত হাজারের বেশি লোক হত্যা করেছে। সেনা অভিযানে ঢাকাসহ সব মিলিয়ে ১৫ হাজার লোক নিহত হয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ এখানেই শেষ ছিল না। ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তারা আরও অনেক বেশি নির্মম, নিষ্ঠুর ও বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। এর মধ্যে খুলনা জেলার চুকনগর গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র দল মাত্র ৪-৫ ঘণ্টায় চুকনগরে হত্যা করেছিল ১০ থেকে ১২ হাজার নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৯৫ সালে বসনিয়া যুদ্ধকালে ১১ জুলাই থেকে পরবর্তী ১১ দিন ধরে চলা স্রেব্রেনিকা গণহত্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ৮ হাজার বসনিয়ান মুসলিম। সার্বিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা বসনিয়ান-সার্ব বাহিনী মুসলমানদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। স্রেব্রেনিকা ছিল জাতিসংঘের ঘোষিত নিরাপদ অঞ্চল। নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞের বিভীষিকায় স্তম্ভিত হয়ে ওঠে পুরো বিশ্ববাসী। স্রেব্রেনিকা গণহত্যার ঘটনাও বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করছিল।
কিন্তু মাই লাই, স্রেব্রেনিকা এবং ২৫-২৬ মার্চে ঢাকার গণহত্যাও চুকনগর গণহত্যাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। সমসাময়িক মানব ইতিহাসে এত কম সময়ে এমন ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর গণহত্যা বিশ্বের আর কোথাও ঘটেছে বলে জানা যায় না। বিশ্ব ইতিহাসে বৃহত্তম ও নিষ্ঠুর গণহত্যা-চুকনগর গণহত্যা।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রাম চুকনগর। ভদ্রা নদীর তীরবর্তী একটি গ্রাম। এলাকাটি জেলা শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং ভারত সীমান্তবর্তী।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাত থেকে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত সংঘটিত হতে থাকে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের মতো ঘটনা। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসহায় মানুষজন ছুটতে থাকেন ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে।
এপ্রিল ও মে মাসে বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাধীনতাকামী বাঙালি, বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং পাকিস্তানপন্থী বাঙালি ও অবাঙালিদের নির্যাতন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বসবাস যেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি হয়ে ওঠে। তখন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল অর্থাৎ বৃহত্তর খুলনা ও বরিশালের নানা প্রান্ত থেকে আসা হিন্দু শরণার্থী মানুষের ঢল চুকনগর হয়ে সীমান্ত মুখী। রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটার বিপুলসংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষেরা চুকনগর হয়ে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিতে থাকেন। চুকনগর ছিল যশোর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার সংযোগস্থল এবং তিন দিকে নদী ঘেরা। সেই সময় ওই এলাকার মানুষের ভারত সীমান্তে যাওয়ার জন্য ভদ্রা নদী দিয়ে নৌকায় চুকনগরে আসা ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ।
চুকনগর থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারলেই সাতক্ষীরা হয়ে ভারত সীমান্ত। ফলে ভৌগোলিক কারণে চুকনগর বাজার সবার কাছে পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি ছিল অন্যতম একটি ট্রানজিট পয়েন্ট। তখন পাকিস্তানি বাহিনীর আনাগোনা ওই এলাকায় নেই বললেই চলে। চুকনগর ছিল নিরাপদ এলাকা। তখন প্রতিদিন সেখানে দলে দলে মানুষ আসছে। আবার দলে দলে ভারতের উদ্দেশে যাচ্ছে।
১৮-১৯ মে নৌকায় করে ভদ্রা নদী ও ঘ্যাংরাইল নদ দিয়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ চুকনগরের পাতখোলা বিল, কাঁচাবাজার, মাছবাজার, কাপুড়িয়া পট্টি, গরুহাটা, বাজারের কালী মন্দির, বটতলাসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেন। চুকনগরে মানুষ আসছিল নানা প্রান্ত থেকে। উদ্দেশ্য ওখানে রাত কাটিয়ে পরদিন সীমান্তের উদ্দেশে যাত্রা করা।
মানুষের ভিড়ে চারদিক গমগম করছিল। কেউ রান্না করছেন, কেউ সওদাপাতি কিনছেন, কেউ জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত। তাদের অনেকে রাত কাটিয়েছেন নির্ঘুম চোখে। একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করছিল তাদের মধ্যে। পরদিন ২০ মে বৃহস্পতিবার। সকালে অল্পসংখ্যক মানুষ ভারতের পথে রওনা দিয়েছিলেন। বাকিরা রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
এমন সময় হঠাৎ বেলা ১১টার দিকে সাতক্ষীরা-খুলনা সড়ক ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র দল ট্রাক ও জিপে করে চুকনগর বাজারের পশ্চিম পাশে ঝাউতলায় আসে। সামনে পাতখোলা মাঠ তখন লোকে লোকারণ্য। পাকিস্তানি সেনাদের দল ঝাউতলায় পৌঁছেই ভাগ হয়ে পাতখোলা বিল থেকে চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, চুকনগর স্কুল, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া, ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে জমা হওয়া মানুষের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। ৪-৫ ঘণ্টা ধরে চলে এই গুলিবর্ষণ। চুকনগরের আকাশ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে গুলির শব্দ আর অস্ফুট আর্তনাদ ও মৃত্যু যন্ত্রণা। রক্তে ভিজে যায় পাতখোলা মাঠ, চুকনগর বাজার, মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা। ভদ্রা নদীতে নৌকায় অবস্থান করছিলেন অনেক মানুষ, তারাও রেহাই পাননি। সেদিন যারা নদীর ওপারে পৌঁছাতে পেরেছিল, তারাই বাঁচতে পেরেছিল। ভদ্রা নদীর জল সেদিন লাল টকটকে রক্তে ভেসে গিয়েছিল। কোথাও লাশের কারণে নদী পথ আটকে যায়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই গণহত্যার ঘটনা ১৯৯৩ সালের আগে অজানাই ছিল। ওই সময় গঠিত হয় চুকনগর গণহত্যা ৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহকালে এই গণহত্যার খবর আরও সামনে আসে।
নির্মম এই গণহত্যার শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। না পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, নিহতদের মধ্যে স্থানীয় কয়েকজন থাকলেও বাকি সবাই ছিলেন অন্য অঞ্চলের। তারা বেশির ভাগ এসেছিলেন রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ থেকে।
সেদিন পাকিস্তানি সেনার দল হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে চলে যাওয়ার পর স্থানীয় কিছু মানুষ ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। কিন্তু তারা হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়েন। দুই দিন পর অর্থাৎ ২২ মে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা মরদেহগুলো নদীতে ফেলার ও মাটিতে পুঁতে রাখার উদ্যোগ নেন। এ জন্য ২২ জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের ও অন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যমতে এই গণহত্যায় শহীদ হয়েছেন কমপক্ষে ১০-১২ হাজারের মতো নিরীহ মানুষ।
২০ মে পাকিস্তানি সেনারা বেলা ১১টার দিকে যখন গোলাগুলি শুরু করে তখন বাজারে ছিলেন চুকনগরের বাসিন্দা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চুকনগর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ বি এম শফিকুল ইসলাম। তিনি ১৯৭১ সালে শিক্ষার্থী ছিলেন, তখনো মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি। সেদিন আকস্মিক গোলাগুলির শব্দে ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে তিনি দ্রুত বাজার থেকে পালিয়ে যান। পাকিস্তানি সেনারা চলে যাওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। বাজারে এসে চারদিকে শত শত নিহত মানুষ দেখে এবং আহত মানুষের আর্তনাদ শুনে আতঙ্কগ্রস্থ ও ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন। পরে আবার এসেছিলেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, “পরে আবার চুকনগর বাজারে আসলাম। এসে দেখি এলাকার বেশ কিছু লোকজন ওখানে। তারা লাশগুলো মাটি চাপা বা নদীতে ফেলার ব্যবস্থা করছেন। কত যে লাশ এই চুকনগর বাজারের আশপাশ দিয়ে, তা তখন হিসাব করা সম্ভব ছিল না। পরবর্তীতে এখানকার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং মেম্বার সাহেবরা ওখানে বেশ কিছু লোক নিয়োগ করেছিলেন। তারা দুজন দুজন করে গ্রুপ হয়ে বেশির ভাগ লাশ নদীতে ফেলে দেয়। সেটাই নাকি তখন সহজ ছিল লাশ সৎকারের। তারা আমার কাছে একটা হিসাব দিয়েছিল। তারা আমাকে বলেছিল সাড়ে ৪ হাজারের মতো লাশ নদীতে ফেলবার পর তারা নাকি আর গুনতে পারেনি। আমি নিজেও দেখেছি ওই সময় হাজার হাজার লাশ নদীতে ফেলা হয়েছে। পরে কেউ কেউ এসে বা আত্মীয়-স্বজনেরা এসে অনেক লাশ নিয়ে গেছে। অনেক লাশ মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছিল। অনেক নারী পুরুষ নদীতে পড়েও মারা গেছে। সেই সময় মাত্র ভাটা শুরু হয়েছিল। সে জন্য নদীতে তীব্র স্রোত ছিল। অনেকে হুড়োহুড়ির ভেতর নদীতে পড়ে গেছে। তাদের মধ্যে যারা সাঁতার জানত না তারা ভেসে গেছে। এদের সংখ্যাও কম ছিল না।”
চুকনগরের বাসিন্দা ওয়াজেদ মিয়া (পিতা আসাদ সরদার) মরদেহ নদীতে ফেলা ও মাটিচাপা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি তখন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (তখন কাউন্সিল) চৌকিদার ছিলেন। ওয়াজেদ মিয়াসহ আরও কিছু মানুষ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের নির্দেশে মরদেহ নদীতে এবং মাটিতে পুঁতে ফেলেন।
ওয়াজেদ মিয়া বলেন, “চেয়ারম্যান সাহেব আমারে লোক দিয়া কাউন্সিল অফিসে ডাইকে নিয়া গেল। কাউন্সিল অফিসে যাওয়ার পর চেয়ারম্যান সাহেব আমারে বলতেছে, তোমারে এই লাশগুলা ফেলি দিতি হবে। তখন আমি কলাম, আমি একা আর কয়টা লাশ ফেলিব। একা তো এতো লাশ ফেলানো সম্ভব না। তখন চেয়ারম্যান সাহেব কলো, তুমি একা না। এহানে আরও লোক আছে। তুমি তাগো সঙ্গে নিয়া লাশ ফেলবা। উনি আমারেসহ ২২ জনরে ডাইকে আনিছে। এর মধ্যি বিহারি পাড়ার কয়েকজন ছিল। চেয়ারম্যান সাহেব আমাগো বলিল, তোমাগো প্রত্যেককে টাকা দিব। লাশগুলো তোমরা নদীতে ফেলে দিবা। চেয়ারম্যান সাহেব আমাগো ২ হাজার টাকা করি নগদ দিয়া দিলেন। ভয় আর টাকার লোভে সেই লাশ আমি নদীতে ফেলানো শুরু করিলাম। আমরা ২২ জনে সব লাশ ফেলিলাম।…লাশ সব বাঁশে বাঁধে ঘাড়ে করি নিয়া ফেলিলাম।…সব গাঙেতে। শনিবার [২২ মে] দিন থাকেই আমরা ফেলানো শুরু করছি। ওই দিন ফেলছি। রবিবার সারা দিন ফেলছি। সোমবারও লাশ ফেলছি। তখন লাশ অনেক পইচে গেছিল। সোমবার দিন গর্তেই বেশি লাশ ফেলিছি। এগুলা পইচে গেছিল। একেকটা গর্তের মধ্যি ৮/৯ টা লাশ ফেইলে মাটি চাপা দিছি। ওই রাস্তার ধারে কয়েকটা গর্ত করিছিলাম।…সোমবারেই শেষ হইছে, তখন আর কোনো লাশ ছিল না।
ধরেন ৪ হাজার পর্যন্ত গুনিলাম। তারপরে আর গুনি নাই।…৪ হাজার গুনিলাম আপনার সোমবার দুপুর পর্যন্ত। শনিবার থাকে আরম্ভ করি রবিবার, তারপর সোমবার দিন বেলা দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৪ হাজার গুনি ঠিক করা হইল। এইগুলা আমরা ২২ জন মিলি ফেলিছি। তারপরে বাজারে এবং পাথর খোলায় আরও যেগুলা ছিল সেগুলা আর গোনা হয় নাই। ওখানে তা ধরেন ৩০০ হবে। এর বেশি ছাড়া কম হবে না। মানে এগুলা পইচে একদম খারাপ হয়ে গেছিল। সে জন্য এগুলা আর গুনতি পারি নাই।
এর বাইরে গাঙে যা ছিল তাতো আমাগো গোনার মধ্যি না। গাঙেও তো বহু লোক মরি পড়িছিল। গাঙেও মেলিটারিরা গুলি করিল। বহু লোক গাঙে মরিল। ওহানেও ৪/৫শ লোক মরিছে।
গাঙে নৌকোর ভিতর অনেক লোক ছিল। গুলি শুরু হওয়ার পর অনেক লোক গাঙে ঝাঁপায় পড়িছে। তখন খানেরা [পাকিস্তানি সেনা] ওহানেও গুলি করিছে। তাদের লাশ তো ভাটায় ভাইসে গেছে।”
মাই লাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশের পর অভিযুক্ত সেনাদের বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শালের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়া লেফট্যানেন্ট ক্যালিকে শাস্তি দেওয়া হয়। তিনি স্বীকার করেছিলেন তার জঘন্য কর্মকাণ্ডের কথা। তবে একইসঙ্গে ক্যালি উল্লেখ করেন, তিনি ‘আদেশ পালন’ করেছেন মাত্র। তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। অবশ্য দুই দিন পর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে শুধুমাত্র গৃহবন্দী রাখার নির্দেশ দেন। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে স্রেব্রেনিকা হত্যাকাণ্ডের জন্য বসনিয়ান-সার্ব বাহিনীর জেনারেল রাটকো ম্লাদিচের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার হয়েছিল। বিচারে ম্লাদিচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং তিনি এখনো সাজা ভোগ করছেন। এ ছাড়া, সাবেক সার্বিয়ান প্রেসিডেন্ট স্লোবোডান মিলোসেভিচকেও বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে বিচার শেষ হওয়ার আগেই তিনি কারাবন্দী অবস্থায় মারা যান। অপর এক সার্ব রাজনৈতিক নেতা রাদোভান কারাদিচকেও ২০০৮ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। তারও বিচারের পর কারাদণ্ড হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে স্রেব্রেনিকা গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে ১১ জুলাইকে স্রেব্রেনিকা গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
মাই লাই, স্রেব্রেনিকা ও ঢাকার গণহত্যার সংবাদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় সারা বিশ্বের আলোড়িত হয়েছিল। মাই লাই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আমেরিকান সেনাদের বিচার হয়েছিল। স্রেব্রেনিকা হত্যাকাণ্ডের জন্যও বিচার হয়েছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। বিভিন্ন স্থানে চালিয়েছে গণহত্যা। তার মধ্যে ঢাকায় ২৫-২৬ মার্চের গণহত্যা এবং চুকনগর গণহত্যা অন্যতম। বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তানি সেনাদের বিচার তো দূরের কথা বিচারের আওতায়ও আনা সম্ভব হয়নি। কোনো গণহত্যাই পায়নি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধে খুলনা ও চুয়াডাঙ্গা: অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, সম্পাদনা সুকুমার বিশ্বাস
দ্য টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ ১৯৭১
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ৩০ মার্চ ১৯৭১
বিবিসি নিউজ বাংলা, ১১ জুলাই ২০২০
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভিয়েতনামের মাই লাই গণহত্যার ঘটনা সারা বিশ্বের মানুষকে আলোড়িত করেছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালে ১৯৬৮ সালের ১৬ মার্চ তৎকালীন দক্ষিণ ভিয়েতনামের মাই লাই গ্রামে আমেরিকান সেনাবাহিনীর একটি দল নিরস্ত্র নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ কয়েক শ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছিল। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ৩৪৭ থেকে ৫০৪ জন নিহত হয়েছিল। মাই লাই গণহত্যা ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে জঘন্য অপরাধগুলোর মধ্যে একটি।
মাই লাই গণহত্যার খবর মার্কিন বাহিনী ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি। এক বছর আট মাস পর সিমোর হার্শ নামে একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক পুরো ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) মাধ্যমে। সেই সূত্রে এ ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট করে টাইম, লাইফ ও নিউজউইক ইত্যাদি ম্যাগাজিন এবং সিবিএস টেলিভিশন। এ ছাড়া, প্লেইন ডিলার নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ করে গণহত্যার কিছু ছবি। তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে মাই লাইয়ের ঘটনা।
এই ঘটনার তিন বছর পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর শুরু করেছিল তাদের গণহত্যার মিশন ‘অপারেশন সার্চলাইট’। সাঁজোয়া যানের আওয়াজ, গুলির শব্দ, গোলার বিস্ফোরণ আর মানুষের আর্তচিৎকারে ঢাকা বিভীষিকার শহরে পরিণত হয়। পরদিন ২৬ মার্চ সারা দিন ও রাতে সান্ধ্য আইন জারি করে পাকিস্তানি সেনারা দলে দলে রাস্তায় নেমে ভবন, বস্তি ও বাড়িতে আক্রমণ চালায়। দুপুরে পুরান ঢাকার হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় চারদিক থেকে ঘিরে বাড়িগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়। হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
এদিকে তখন ঢাকায় ছিলেন অনেক বিদেশি সাংবাদিক। সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ যাতে তারা যাতে না দেখতে পারেন, সে জন্য তাদের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকে রাখা হয়েছিল। ২৭ মার্চ তাদের ঢাকা থেকে বিমানযোগে বাংলাদেশের বাইরে পাঠানো হয়। সেনাবাহিনীর এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কৌশলে হোটেলে থেকে গিয়েছিলেন ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিবেদক সাইমন ড্রিং। তিনি পাকিস্তানি সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়েন। সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞের বেশির ভাগ প্রমাণ লুকিয়ে ফেলার পরও তিনি তার প্রমাণ দেখতে পান। পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার উপস্থিতি টের পায় এবং তাকে বিমানে ব্যাংককে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে পৌঁছেই তিনি পাকিস্তানিদের বর্বরতা নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন লেখেন। সেই প্রতিবেদন ৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

এই প্রতিবেদন থেকেই বিশ্ববাসী প্রথম বিশদভাবে বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতা সম্পর্কে জানতে পারে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তানে ট্যাংক আক্রমণ: ৭,০০০ নিহত, ঘরবাড়ি ভস্মীভূত’। প্রতিবেদনটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা এখন ধ্বংস ও আতঙ্কের নগরী। ২৩ ঘণ্টা ধরে অবিরাম শেল বর্ষণ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঠান্ডা মাথায় সাত হাজারের বেশি লোক হত্যা করেছে। সেনা অভিযানে ঢাকাসহ সব মিলিয়ে ১৫ হাজার লোক নিহত হয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ এখানেই শেষ ছিল না। ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তারা আরও অনেক বেশি নির্মম, নিষ্ঠুর ও বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। এর মধ্যে খুলনা জেলার চুকনগর গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র দল মাত্র ৪-৫ ঘণ্টায় চুকনগরে হত্যা করেছিল ১০ থেকে ১২ হাজার নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৯৫ সালে বসনিয়া যুদ্ধকালে ১১ জুলাই থেকে পরবর্তী ১১ দিন ধরে চলা স্রেব্রেনিকা গণহত্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ৮ হাজার বসনিয়ান মুসলিম। সার্বিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা বসনিয়ান-সার্ব বাহিনী মুসলমানদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। স্রেব্রেনিকা ছিল জাতিসংঘের ঘোষিত নিরাপদ অঞ্চল। নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞের বিভীষিকায় স্তম্ভিত হয়ে ওঠে পুরো বিশ্ববাসী। স্রেব্রেনিকা গণহত্যার ঘটনাও বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করছিল।
কিন্তু মাই লাই, স্রেব্রেনিকা এবং ২৫-২৬ মার্চে ঢাকার গণহত্যাও চুকনগর গণহত্যাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। সমসাময়িক মানব ইতিহাসে এত কম সময়ে এমন ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর গণহত্যা বিশ্বের আর কোথাও ঘটেছে বলে জানা যায় না। বিশ্ব ইতিহাসে বৃহত্তম ও নিষ্ঠুর গণহত্যা-চুকনগর গণহত্যা।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রাম চুকনগর। ভদ্রা নদীর তীরবর্তী একটি গ্রাম। এলাকাটি জেলা শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং ভারত সীমান্তবর্তী।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাত থেকে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত সংঘটিত হতে থাকে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের মতো ঘটনা। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসহায় মানুষজন ছুটতে থাকেন ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে।
এপ্রিল ও মে মাসে বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাধীনতাকামী বাঙালি, বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং পাকিস্তানপন্থী বাঙালি ও অবাঙালিদের নির্যাতন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বসবাস যেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি হয়ে ওঠে। তখন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল অর্থাৎ বৃহত্তর খুলনা ও বরিশালের নানা প্রান্ত থেকে আসা হিন্দু শরণার্থী মানুষের ঢল চুকনগর হয়ে সীমান্ত মুখী। রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটার বিপুলসংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষেরা চুকনগর হয়ে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিতে থাকেন। চুকনগর ছিল যশোর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার সংযোগস্থল এবং তিন দিকে নদী ঘেরা। সেই সময় ওই এলাকার মানুষের ভারত সীমান্তে যাওয়ার জন্য ভদ্রা নদী দিয়ে নৌকায় চুকনগরে আসা ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ।
চুকনগর থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারলেই সাতক্ষীরা হয়ে ভারত সীমান্ত। ফলে ভৌগোলিক কারণে চুকনগর বাজার সবার কাছে পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি ছিল অন্যতম একটি ট্রানজিট পয়েন্ট। তখন পাকিস্তানি বাহিনীর আনাগোনা ওই এলাকায় নেই বললেই চলে। চুকনগর ছিল নিরাপদ এলাকা। তখন প্রতিদিন সেখানে দলে দলে মানুষ আসছে। আবার দলে দলে ভারতের উদ্দেশে যাচ্ছে।
১৮-১৯ মে নৌকায় করে ভদ্রা নদী ও ঘ্যাংরাইল নদ দিয়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ চুকনগরের পাতখোলা বিল, কাঁচাবাজার, মাছবাজার, কাপুড়িয়া পট্টি, গরুহাটা, বাজারের কালী মন্দির, বটতলাসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেন। চুকনগরে মানুষ আসছিল নানা প্রান্ত থেকে। উদ্দেশ্য ওখানে রাত কাটিয়ে পরদিন সীমান্তের উদ্দেশে যাত্রা করা।
মানুষের ভিড়ে চারদিক গমগম করছিল। কেউ রান্না করছেন, কেউ সওদাপাতি কিনছেন, কেউ জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত। তাদের অনেকে রাত কাটিয়েছেন নির্ঘুম চোখে। একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করছিল তাদের মধ্যে। পরদিন ২০ মে বৃহস্পতিবার। সকালে অল্পসংখ্যক মানুষ ভারতের পথে রওনা দিয়েছিলেন। বাকিরা রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
এমন সময় হঠাৎ বেলা ১১টার দিকে সাতক্ষীরা-খুলনা সড়ক ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র দল ট্রাক ও জিপে করে চুকনগর বাজারের পশ্চিম পাশে ঝাউতলায় আসে। সামনে পাতখোলা মাঠ তখন লোকে লোকারণ্য। পাকিস্তানি সেনাদের দল ঝাউতলায় পৌঁছেই ভাগ হয়ে পাতখোলা বিল থেকে চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, চুকনগর স্কুল, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া, ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে জমা হওয়া মানুষের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। ৪-৫ ঘণ্টা ধরে চলে এই গুলিবর্ষণ। চুকনগরের আকাশ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে গুলির শব্দ আর অস্ফুট আর্তনাদ ও মৃত্যু যন্ত্রণা। রক্তে ভিজে যায় পাতখোলা মাঠ, চুকনগর বাজার, মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা। ভদ্রা নদীতে নৌকায় অবস্থান করছিলেন অনেক মানুষ, তারাও রেহাই পাননি। সেদিন যারা নদীর ওপারে পৌঁছাতে পেরেছিল, তারাই বাঁচতে পেরেছিল। ভদ্রা নদীর জল সেদিন লাল টকটকে রক্তে ভেসে গিয়েছিল। কোথাও লাশের কারণে নদী পথ আটকে যায়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই গণহত্যার ঘটনা ১৯৯৩ সালের আগে অজানাই ছিল। ওই সময় গঠিত হয় চুকনগর গণহত্যা ৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহকালে এই গণহত্যার খবর আরও সামনে আসে।
নির্মম এই গণহত্যার শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। না পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, নিহতদের মধ্যে স্থানীয় কয়েকজন থাকলেও বাকি সবাই ছিলেন অন্য অঞ্চলের। তারা বেশির ভাগ এসেছিলেন রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ থেকে।
সেদিন পাকিস্তানি সেনার দল হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে চলে যাওয়ার পর স্থানীয় কিছু মানুষ ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। কিন্তু তারা হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়েন। দুই দিন পর অর্থাৎ ২২ মে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা মরদেহগুলো নদীতে ফেলার ও মাটিতে পুঁতে রাখার উদ্যোগ নেন। এ জন্য ২২ জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের ও অন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যমতে এই গণহত্যায় শহীদ হয়েছেন কমপক্ষে ১০-১২ হাজারের মতো নিরীহ মানুষ।
২০ মে পাকিস্তানি সেনারা বেলা ১১টার দিকে যখন গোলাগুলি শুরু করে তখন বাজারে ছিলেন চুকনগরের বাসিন্দা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চুকনগর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ বি এম শফিকুল ইসলাম। তিনি ১৯৭১ সালে শিক্ষার্থী ছিলেন, তখনো মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি। সেদিন আকস্মিক গোলাগুলির শব্দে ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে তিনি দ্রুত বাজার থেকে পালিয়ে যান। পাকিস্তানি সেনারা চলে যাওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। বাজারে এসে চারদিকে শত শত নিহত মানুষ দেখে এবং আহত মানুষের আর্তনাদ শুনে আতঙ্কগ্রস্থ ও ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন। পরে আবার এসেছিলেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, “পরে আবার চুকনগর বাজারে আসলাম। এসে দেখি এলাকার বেশ কিছু লোকজন ওখানে। তারা লাশগুলো মাটি চাপা বা নদীতে ফেলার ব্যবস্থা করছেন। কত যে লাশ এই চুকনগর বাজারের আশপাশ দিয়ে, তা তখন হিসাব করা সম্ভব ছিল না। পরবর্তীতে এখানকার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং মেম্বার সাহেবরা ওখানে বেশ কিছু লোক নিয়োগ করেছিলেন। তারা দুজন দুজন করে গ্রুপ হয়ে বেশির ভাগ লাশ নদীতে ফেলে দেয়। সেটাই নাকি তখন সহজ ছিল লাশ সৎকারের। তারা আমার কাছে একটা হিসাব দিয়েছিল। তারা আমাকে বলেছিল সাড়ে ৪ হাজারের মতো লাশ নদীতে ফেলবার পর তারা নাকি আর গুনতে পারেনি। আমি নিজেও দেখেছি ওই সময় হাজার হাজার লাশ নদীতে ফেলা হয়েছে। পরে কেউ কেউ এসে বা আত্মীয়-স্বজনেরা এসে অনেক লাশ নিয়ে গেছে। অনেক লাশ মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছিল। অনেক নারী পুরুষ নদীতে পড়েও মারা গেছে। সেই সময় মাত্র ভাটা শুরু হয়েছিল। সে জন্য নদীতে তীব্র স্রোত ছিল। অনেকে হুড়োহুড়ির ভেতর নদীতে পড়ে গেছে। তাদের মধ্যে যারা সাঁতার জানত না তারা ভেসে গেছে। এদের সংখ্যাও কম ছিল না।”
চুকনগরের বাসিন্দা ওয়াজেদ মিয়া (পিতা আসাদ সরদার) মরদেহ নদীতে ফেলা ও মাটিচাপা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি তখন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (তখন কাউন্সিল) চৌকিদার ছিলেন। ওয়াজেদ মিয়াসহ আরও কিছু মানুষ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের নির্দেশে মরদেহ নদীতে এবং মাটিতে পুঁতে ফেলেন।
ওয়াজেদ মিয়া বলেন, “চেয়ারম্যান সাহেব আমারে লোক দিয়া কাউন্সিল অফিসে ডাইকে নিয়া গেল। কাউন্সিল অফিসে যাওয়ার পর চেয়ারম্যান সাহেব আমারে বলতেছে, তোমারে এই লাশগুলা ফেলি দিতি হবে। তখন আমি কলাম, আমি একা আর কয়টা লাশ ফেলিব। একা তো এতো লাশ ফেলানো সম্ভব না। তখন চেয়ারম্যান সাহেব কলো, তুমি একা না। এহানে আরও লোক আছে। তুমি তাগো সঙ্গে নিয়া লাশ ফেলবা। উনি আমারেসহ ২২ জনরে ডাইকে আনিছে। এর মধ্যি বিহারি পাড়ার কয়েকজন ছিল। চেয়ারম্যান সাহেব আমাগো বলিল, তোমাগো প্রত্যেককে টাকা দিব। লাশগুলো তোমরা নদীতে ফেলে দিবা। চেয়ারম্যান সাহেব আমাগো ২ হাজার টাকা করি নগদ দিয়া দিলেন। ভয় আর টাকার লোভে সেই লাশ আমি নদীতে ফেলানো শুরু করিলাম। আমরা ২২ জনে সব লাশ ফেলিলাম।…লাশ সব বাঁশে বাঁধে ঘাড়ে করি নিয়া ফেলিলাম।…সব গাঙেতে। শনিবার [২২ মে] দিন থাকেই আমরা ফেলানো শুরু করছি। ওই দিন ফেলছি। রবিবার সারা দিন ফেলছি। সোমবারও লাশ ফেলছি। তখন লাশ অনেক পইচে গেছিল। সোমবার দিন গর্তেই বেশি লাশ ফেলিছি। এগুলা পইচে গেছিল। একেকটা গর্তের মধ্যি ৮/৯ টা লাশ ফেইলে মাটি চাপা দিছি। ওই রাস্তার ধারে কয়েকটা গর্ত করিছিলাম।…সোমবারেই শেষ হইছে, তখন আর কোনো লাশ ছিল না।
ধরেন ৪ হাজার পর্যন্ত গুনিলাম। তারপরে আর গুনি নাই।…৪ হাজার গুনিলাম আপনার সোমবার দুপুর পর্যন্ত। শনিবার থাকে আরম্ভ করি রবিবার, তারপর সোমবার দিন বেলা দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৪ হাজার গুনি ঠিক করা হইল। এইগুলা আমরা ২২ জন মিলি ফেলিছি। তারপরে বাজারে এবং পাথর খোলায় আরও যেগুলা ছিল সেগুলা আর গোনা হয় নাই। ওখানে তা ধরেন ৩০০ হবে। এর বেশি ছাড়া কম হবে না। মানে এগুলা পইচে একদম খারাপ হয়ে গেছিল। সে জন্য এগুলা আর গুনতি পারি নাই।
এর বাইরে গাঙে যা ছিল তাতো আমাগো গোনার মধ্যি না। গাঙেও তো বহু লোক মরি পড়িছিল। গাঙেও মেলিটারিরা গুলি করিল। বহু লোক গাঙে মরিল। ওহানেও ৪/৫শ লোক মরিছে।
গাঙে নৌকোর ভিতর অনেক লোক ছিল। গুলি শুরু হওয়ার পর অনেক লোক গাঙে ঝাঁপায় পড়িছে। তখন খানেরা [পাকিস্তানি সেনা] ওহানেও গুলি করিছে। তাদের লাশ তো ভাটায় ভাইসে গেছে।”
মাই লাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশের পর অভিযুক্ত সেনাদের বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শালের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়া লেফট্যানেন্ট ক্যালিকে শাস্তি দেওয়া হয়। তিনি স্বীকার করেছিলেন তার জঘন্য কর্মকাণ্ডের কথা। তবে একইসঙ্গে ক্যালি উল্লেখ করেন, তিনি ‘আদেশ পালন’ করেছেন মাত্র। তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। অবশ্য দুই দিন পর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে শুধুমাত্র গৃহবন্দী রাখার নির্দেশ দেন। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে স্রেব্রেনিকা হত্যাকাণ্ডের জন্য বসনিয়ান-সার্ব বাহিনীর জেনারেল রাটকো ম্লাদিচের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার হয়েছিল। বিচারে ম্লাদিচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং তিনি এখনো সাজা ভোগ করছেন। এ ছাড়া, সাবেক সার্বিয়ান প্রেসিডেন্ট স্লোবোডান মিলোসেভিচকেও বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে বিচার শেষ হওয়ার আগেই তিনি কারাবন্দী অবস্থায় মারা যান। অপর এক সার্ব রাজনৈতিক নেতা রাদোভান কারাদিচকেও ২০০৮ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। তারও বিচারের পর কারাদণ্ড হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে স্রেব্রেনিকা গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে ১১ জুলাইকে স্রেব্রেনিকা গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
মাই লাই, স্রেব্রেনিকা ও ঢাকার গণহত্যার সংবাদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় সারা বিশ্বের আলোড়িত হয়েছিল। মাই লাই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আমেরিকান সেনাদের বিচার হয়েছিল। স্রেব্রেনিকা হত্যাকাণ্ডের জন্যও বিচার হয়েছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। বিভিন্ন স্থানে চালিয়েছে গণহত্যা। তার মধ্যে ঢাকায় ২৫-২৬ মার্চের গণহত্যা এবং চুকনগর গণহত্যা অন্যতম। বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তানি সেনাদের বিচার তো দূরের কথা বিচারের আওতায়ও আনা সম্ভব হয়নি। কোনো গণহত্যাই পায়নি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধে খুলনা ও চুয়াডাঙ্গা: অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, সম্পাদনা সুকুমার বিশ্বাস
দ্য টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ ১৯৭১
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ৩০ মার্চ ১৯৭১
বিবিসি নিউজ বাংলা, ১১ জুলাই ২০২০
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভিয়েতনামের মাই লাই গণহত্যার ঘটনা সারা বিশ্বের মানুষকে আলোড়িত করেছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালে ১৯৬৮ সালের ১৬ মার্চ তৎকালীন দক্ষিণ ভিয়েতনামের মাই লাই গ্রামে আমেরিকান সেনাবাহিনীর একটি দল নিরস্ত্র নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ কয়েক শ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছিল।

বাংলাদেশে নারীরা তাই সব সময়ই দোষের দায় নিতেই অভ্যস্ত। সাম্প্রতিক দোষটা এসেছে হামের সংক্রমণ উপলক্ষে। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলেছেন, এখনকার মায়েরা নাকি ফিটনেস ধরে রাখতে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না! হ্যাঁ, প্রকাশ্যেই বলা হয়েছে এমন কথা। সংবাদ সম্মেলনে এমনটা বলেছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ