Advertisement Banner

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

মৃত্যুঞ্জয় রায়
মৃত্যুঞ্জয় রায়
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের বিরুদ্ধে চিংড়ির রেণুর গাড়ি আটকে চাঁদাবাজি, জাটকা ইলিশ মাছের গাড়ি আটকে চাঁদাবাজি, ঠিকাদারের বিলের জন্য প্রকৌশলীকে চেয়ার ছুড়ে মারা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়ক নির্মাণে ঠিকাদারের কাছে চাঁদা দাবিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে পটুয়াখালী থেকে আসা চিংড়ির রেণুবাহী একটি গাড়ি বরিশাল জিরো পয়েন্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা-কর্মীরা ধাওয়া করে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ভোলা রোডে নিয়ে আটক করে। গাড়ি আটকে বাসের সহকারী ও চালককে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মেরিন একাডেমির নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে মারধর করে ভয়ভীতি দেখিয়ে পোনার মালিককে কল দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। এসময় জীবন বাঁচাতে চালক বিকাশে তিনটি নম্বরে মোট ৯৫ হাজার টাকা এবং নগদ পাঁচ হাজার টাকাসহ মোট ১ লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি উদ্ধার করেন।

পরবর্তীতে, প্রথম গাড়িটি আটকের খবর পেয়ে চিংড়ি রেণু বহনকারী দ্বিতীয় মাইক্রোবাসটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে থামার সংকেত দিলে চালক দ্রুত গাড়িটি নিয়ে রুপাতলীর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে একটি মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও একজন আহত হয়। পরে ঐ গাড়ির পিছু নেয় ববি ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা।

ওরা দুইটা নম্বর থেকে ৯৫ হাজার টাকা বিকাশে নিয়েছে। আর পাঁচ হাজার টাকা নগদ নিয়েছে। এমনকি বিকাশ খরচ ৫০০ টাকা নিয়েছে এবং চালকের কাছে কিছু টাকা ছিল সেই টাকাও ওরা নিয়েছে। ওদের দাবি ছিল, পাঁচ লাখ। ওরা আমাদের বলে এটা অবৈধ মাছ , টাকা দেওয়া লাগবে। আমি বলি এটা কোনো অবৈধ মাছ না। ওরা প্রায় ১৬/১৭ জন ছিল।

গাড়িটি রুপাতলী ট্রাফিক পুলিশ বক্সের কাছে পুলিশের টহল গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭/৮ জন শিক্ষার্থী পুলিশের সামনেই মাইক্রোবাসের চালক ও সহকারীকে মারতে থাকে। এতে চালক ও সহকারী আহত হন। এ সময় তারা মাইক্রোবাসটির গ্লাস ও অন্যান্য অংশে ভাঙচুর করে। আহত শিক্ষার্থী হলেন ববির ১০ ব্যাচের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলকর্মী মো. আরাফাত।

এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি রাত ১১টার দিকে ভোলা-বরিশাল মহাসড়কের তালুকদার মার্কেট এলাকায় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মধ্যরাতে ইলিশ মাছের গাড়ি আটকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি ও চালককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহাই পেতে ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুলিশের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন ট্রাকচালক।

চাঁদাবাজির শিকার হওয়া প্রথম গাড়ির চিংড়ি রেণুর মালিক মো. আফতাব হোসেন বলেন, “ওরা দুইটা নম্বর থেকে ৯৫ হাজার টাকা বিকাশে নিয়েছে। আর পাঁচ হাজার টাকা নগদ নিয়েছে। এমনকি বিকাশ খরচ ৫০০ টাকা নিয়েছে এবং চালকের কাছে কিছু টাকা ছিল সেই টাকাও ওরা নিয়েছে। ওদের দাবি ছিল, পাঁচ লাখ। ওরা আমাদের বলে এটা অবৈধ মাছ , টাকা দেওয়া লাগবে। আমি বলি এটা কোনো অবৈধ মাছ না। ওরা প্রায় ১৬/১৭ জন ছিল।”

পোনা বহনকারী দ্বিতীয় মাইক্রোবাস চালক বলেন, “ওরা প্রথম মাছের গাড়ি দাড় করিয়ে ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে গেছে , এবং টাকা আদায় করেছে। প্রথম গাড়ি থেকে আমাদের ফোন দিয়ে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যেন গাড়ি না থামায়। তখন গাড়ি না থামিয়ে টান দেয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে ৮/১০ টা মোটরসাইকেল আমাদের ধাওয়া করে। সামনে পুলিশের গাড়ি দেখে গাড়ি থামালে আমাকে ওরা মারধর করে এবং গাড়ি ভাংচুর করেছে।”

মাছের গাড়ি আটকে মহাসড়কে চাঁদাবাজির ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সহ-সভাপতি মিয়া বাবুল, সহ-সভাপতি মো. মিথুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. স্বজন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. ইমরান মাহমুদসহ একাধিক নেতা-কর্মী।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রদলে সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসাইন শান্ত ও সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমানের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মহাসড়কে এসব চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। চাঁদার টাকার ভাগ তাদের পকেটেও যায় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত সহ-সভাপতি মিয়া বাবুল অভিযোগ অস্বীকার করে চরচাকে জানান, তিনি নিজেই জানেন না তার নাম কেন বার বার আসছে। কোনো প্রমাণ ছাড়াই যারা এগুলো করছে, তাদের নামে একটা মানহানি মামলা করার কথাও ভাবছেন তিনি।

মিয়া বাবুল আরও বলেন, “বর্তমানে শিবিরের একটা চক্রান্ত চলছে ছাত্রদলকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য। যে কোনো একজন দুজনকে টার্গেট করে পুরো টিমকে বিতর্কে ফেলার জন্য তারা এই গুজব ছড়াচ্ছে।”

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি

এ ছাড়া আরও অভিযোগ রয়েছে, গত মার্চ মাসের ২ তারিখে চাঁদা দাবি করে না পাওয়ায় ববির প্রশাসনিক ভবনের সামনে সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগে রয়েছে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রেজা শরীফ, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজমাইন সাকিবের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় ঠিকাদার আওলাদ হোসেনের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন ঠিকাদার।

গত ১৭ মে ঠিকাদারি কাজের বিল দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার তদবিরকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. মামুন অর রশিদের ওপর চেয়ার ছুঁড়ে মারার অভিযোগ উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের এক নম্বর সহ-সভাপতি মিনহাজুল ইসলামের (মিনহাজ সাগর) বিরুদ্ধে।

এই পোনার মূল সমন্বয়কারী মিয়া বাবুল ও মিঠুন। এরা সভাপতি মোশাররফ ও সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানের অধীনে সবকিছু করে, এরা ছাত্রলীগ করতো বলে সব লাইনঘাট চেনা, তাইতো ছাত্রদলের ৪ নম্বর সহ-সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক ও বর্তমান বরিশাল জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ সাকিন চরচাকে বলেন , “কত আবেগ নিয়ে রাজনীতিটা করছিলাম। ১১ বছর রাজনীতি করেছি, বদনামের পরিমাণ খুবই সীমিত ছিল। এখন কতগুলো চাঁদাবাজের হাতে রাজনীতি চলে গেছে। ওরা ইউনিটের সঙ্গে দলকেও ডুবাবে।”

ববি ইউনিটকে কলঙ্কিত করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে এক ফেসবুক পোস্টে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হাসিবুর রহমান সিফাত বলেন, “বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের রাজনীতি করি– এটা যেন গর্বের সাথে বলতে পারি।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাখা ছাত্রদলের একজন সহ-সভাপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একটি কমিটির ‘সুপার ফাইভ’ যে একযোগে চাঁদাবাজির সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেছে, এমন ঘটনা ইতিহাসে বিরল। মাছের পোনা আটকানো, জমি দখল, সালিশি এমন কোনো অপকর্ম নেই–যা এরা করে না। কিছুদিন পূর্বে জাটকা ধরতে গিয়ে এরা সেনাবাহিনীর হাতেও ধরা পড়ে। সবথেকে যোগ্য ও ত্যাগীদের বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক টিম বিপুল অর্থের বিনিময়ে একটি সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে এই কমিটি গঠন করে। এখন সেই টাকা তো এদের উত্তোলন করতেই হবে! এমনকি এই চাঁদাবাজি ও লুটপাটের ভাগ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক টিমও পায়, তাই তারা বরাবরের মতোই চুপ। এবারও এদের কিছুই হবে না, মিলিয়ে নিয়েন।”

তিনি আরও বলেন, “এই পোনার মূল সমন্বয়কারী মিয়া বাবুল ও মিঠুন। এরা সভাপতি মোশাররফ ও সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানের অধীনে সবকিছু করে, এরা ছাত্রলীগ করতো বলে সব লাইনঘাট চেনা, তাইতো ছাত্রদলের ৪ নম্বর সহ-সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন চরচাকে বলেন, “চাঁদাবাজির সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমার নাম জড়াচ্ছে, তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ থাকলে সেটা সামনে আনার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। পাশাপাশি আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার। দলের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ অন্যায় বা অনিয়মের সাথে জড়িত থাকে এবং তা যদি প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছেলেকে মোটরসাইকেলসহ মেরে দেয় একটি হায়েস মাইক্রোবাস। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঐটা ধাওয়া করে। পরবর্তীতে মাইক্রোবাসচালক পুলিশের কাছে ৯৯৯ এ কল দিয়ে সাহায্য চাইলে পুলিশ তাদেরকে থানায় নিয়ে আসে। যেহেতু এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ডাকা হয়েছিল। বিষয়টি মীমাংসা করে দেওয়া হয়েছে। মাছের গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”

গাড়ি আটক করে চাঁদাবাজির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ওসি বলেন, “এমন ঘটনা ঘটতেছে না– বিষয়টি আমি বলব না। তবে, বিষয়টি যেহেতু বন্দর থানাধীন, সংশ্লিষ্ট পুলিশ এটার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।”

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বন্দর থানার ওসি মো. ইসমাইল হোসেন চরচাকে বলেন, “মাছের যে রেণুটা আসে, এটা অবৈধ। যার কারণে অবৈধ রেণু নিয়ে কেউ হয়রানির শিকার হলে আমাদের ও জানায় না। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের চাঁদাবাজির সংবাদ শুনেছি, তবে এ বিষয়ে কেউ আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ দেয়নি। যদি কেউ অভিযোগ দেয়, তখন আমরা সেটা তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেব। আর বৈধ রেণু কিংবা জাটকা মাছের গাড়ি ধরার ব্যাপারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

সম্পর্কিত