বিশ্বকাপ না খেলেও যে সুযোগ বাংলাদেশের সামনে

ফজলে নিপুন
ফজলে নিপুন
বিশ্বকাপ না খেলেও যে সুযোগ বাংলাদেশের সামনে
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতিতে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা অনেকের চোখে সংকট হিসেবে ধরা দিলেও বাস্তবে এটি হতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেট পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ।

নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, ক্রিকেট মাঠে নামার আগে একজন খেলোয়াড়ের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও বোর্ডের প্রথম কর্তব্য। কোনো দেশ বা বোর্ড যদি নিরাপত্তার অজুহাতে অযৌক্তিক টালবাহানা করে, তবে সেখানে আপসের জায়গা নেই। বরং খেলোয়াড়, সমর্থক, গণমাধ্যম ও সরকার - সবার ঐক্যবদ্ধ অবস্থানই হওয়া উচিত একমাত্র জবাব। আত্মসম্মান ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া কখনোই বাড়াবাড়ি নয়; এটি একটি আত্মবিশ্বাসী জাতির স্বাভাবিক প্রতিফলন।

আইসিসি কিংবা বিসিসিআইয়ের মতো প্রভাবশালী বোর্ডগুলোর একপাক্ষিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ক্রিকেট যে চাপের মুখে পড়েছে, সেটিকে শুধু ক্ষতির চোখে দেখলে ভুল হবে। ইতিহাস বলে, বড় পরিবর্তনের সূচনা হয় এমনই চাপের মুহূর্তে। কেবল আন্তর্জাতিক ফিক্সচারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে এখন সময় এসেছে নিজেদের ঘর শক্ত করে নিজস্ব ক্রিকেট কাঠামো, বাজার এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু গড়ে তোলার।

বিশ্ব ক্রিকেট এখন আর শুধুই মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম। যদি অর্থনৈতিক শক্তি দিয়েই ক্রিকেট রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে বাংলাদেশকেও সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের পথেই হাঁটতে হবে। সরকার, ক্রিকেট বোর্ড ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সমন্বয়ে একটি টেকসই ও আধুনিক ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

শুধু বিপিএল নয়— বছরব্যাপী জুনিয়র, একাডেমি, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে মানসম্মত লিগ আয়োজন করতে হবে। উন্নত উইকেট, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং বিদেশি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের ক্রিকেট বাজার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

একই সঙ্গে ক্রিকেট কূটনীতি কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, স্কটল্যান্ড, ইতালি, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সহযোগী সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে পারে। এসব দেশের সঙ্গে নিয়মিত টি-২০ টুর্নামেন্ট আয়োজনের পাশাপাশি সেখানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ক্লাবভিত্তিক টি-১০ লিগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও একটি মানসম্মত ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক টি-১০ লিগ চালু করা যেতে পারে। এই লিগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের বাজার ও অবকাঠামো উন্মুক্ত রাখা হলে তা একদিকে যেমন বৈদেশিক বিনিয়োগ টানবে, অন্যদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করবে।

বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের কেবল খেলোয়াড় হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলাও জরুরি। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার ও বড় রাজস্ব প্রবাহ তৈরি করতে পারলে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষেই বাংলাদেশ ক্রিকেটকে অবহেলা করা সম্ভব হবে না। বরং উল্টোভাবে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ ক্রিকেটে বিনিয়োগের জন্য মুখিয়ে থাকবে।

বিশ্ব ক্রিকেট দ্রুত শর্টার ভার্সন ও লিগনির্ভর ব্যবসায়িক মডেলের দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তনের স্রোতে ভেসে না গিয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস দেখাতে পারলেই বাংলাদেশ লাভবান হবে। পুরনো খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসার এটাই উপযুক্ত সময়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই তা হলো ক্রিকেট দর্শকের দিক থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষ সারির দেশগুলোর একটি। ভারত ও পাকিস্তানের পর বাংলাদেশের ক্রিকেট দর্শকসংখ্যা এবং এনগেজমেন্ট দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। মাঠে উপস্থিতি, টেলিভিশন সম্প্রচার কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সবখানেই বাংলাদেশের দর্শক অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী। এই বিশাল দর্শকভিত্তি কেবল আবেগের জায়গা নয়, এটি একটি সরাসরি অর্থনৈতিক সম্পদ।

বিশ্ব ক্রীড়া ব্যবসায়ের বাস্তবতা হলো- যেখানে দর্শক আছে, সেখানেই বিনিয়োগ আসে। ব্রডকাস্ট রাইটস, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল অ্যাডভার্টাইজিং, মার্চেন্ডাইজিং ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ভ্যালু এইসব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে দর্শকসংখ্যা ও দর্শকের সম্পৃক্ততা। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে কোটি কোটি মানুষ নিয়মিত ক্রিকেট দেখে, সেখানে মানসম্মত ও ধারাবাহিক লিগ কাঠামো তৈরি করা গেলে রেভিনিউ জেনারেশনের সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণে বেড়ে যায়।

এই দর্শক শক্তিই বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় আশ্বাস। একটি ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক টি-১০ বা টি-২০ লিগে বিনিয়োগ মানে শুধু একটি দলের মালিকানা নয়; বরং একটি বিশাল, আবেগী ও সক্রিয় মার্কেটের অংশ হয়ে যাওয়া। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন দেখবেন বাংলাদেশে ক্রিকেট একটি ‘হাই-এনগেজমেন্ট প্রোডাক্ট’, তখন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে তাদের দ্বিধা থাকবে না। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের দর্শকভিত্তি হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে প্রবেশের একটি কৌশলগত গেটওয়ে।

সুতরাং, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কেবল খেলার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শকনির্ভর ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম হিসেবে দেখতে পারলেই বিনিয়োগ, রাজস্ব এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব-তিনটিই একসঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব। দর্শকের এই শক্তিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারাই হবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। সঠিক কৌশল, দৃঢ় অবস্থান ও দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে আগামী এক–দুই বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেটে কেবল একটি অংশগ্রহণকারী দল নয়, বরং একটি অপরিহার্য ক্রিকেট ‘হাব’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে এখন সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়াই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সম্পর্কিত