ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য উইক-কে ডা. শফিকুর রহমান

জামায়াত বহুত্ববাদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনে অঙ্গীকারাবদ্ধ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
জামায়াত বহুত্ববাদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনে অঙ্গীকারাবদ্ধ
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, জুলাই আন্দোলনের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞদের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক। গুরুত্ব বিবেচনায় পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করছে চরচা।

দ্য উইক: নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে জামায়াতে ইসলামী কতটা প্রস্তুত?

ডা. শফিকুর রহমান: যদিও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র কয়েক দিন আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, বাস্তবে ২০১৩ সাল থেকেই দলটিকে কার্যত নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারব্যবস্থার অপব্যবহারের মাধ্যমে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয় এবং তাদের নির্বাচনী প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়।

এই দমন-পীড়নের সময়ই বাংলাদেশে নির্বাচনী গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে। সর্বশেষ প্রকৃত অর্থে অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০১ সালে। ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে পড়ে। ২০১৮ সালের নির্বাচন কুখ্যাতভাবে ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত হয়, যেখানে ভোটের আগেই ব্যালট ভর্তি করার অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের নির্বাচনও ক্ষমতাসীন শিবিরের ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও ভোটারদের সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হয়।

নিবন্ধন বাতিল, গণগ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের পরও জামায়াতে ইসলামী কখনো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আমাদের ফলাফল আমাদের সাংগঠনিক দৃঢ়তা ও জনপ্রিয়তার সমর্থনের প্রমাণ দেয়। সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান এবং আদালতের মাধ্যমে জামায়াতের নিবন্ধন ও প্রতীক পুনঃপ্রতিষ্ঠা আমাদের সমর্থকদের নতুন করে উদ্দীপ্ত করেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে আমরা সক্রিয়ভাবে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি–৩০০ আসনের প্রতিটিতে প্রার্থী চিহ্নিত করা এবং সরাসরি জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমাদের ছাত্রসংগঠনের বিজয় তরুণ ভোটারদের মধ্যে বাড়তে থাকা আস্থার প্রতিফলন। সেই অর্থে জামায়াতে ইসলামী শুধু প্রস্তুতই নয়–আমরা পুরোপুরি তৈরি। সর্বোপরি, আমাদের প্রধান দাবি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন।

দ্য উইক: আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে কাটানো বছরগুলো থেকে জামায়াত কী শিক্ষা নিয়েছে?

ডা. শফিকুর রহমান: আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকলেও জামায়াতে ইসলামী কখনো গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততা থেকে সরে আসেনি। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আমরা বিএনপির সঙ্গে জোট করে একটি অভিন্ন প্রতীকের অধীনে অংশগ্রহণ করি। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে– যখন গণতন্ত্র নিজেই হুমকির মুখে থাকে, তখন গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ঐক্য কতটা জরুরি।

এইসব সময়ে শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীকে আরও শক্তিশালী করেছে। আমরা আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো সুসংহত করেছি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জোরদার করেছি এবং তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা গভীর করেছি। একই সঙ্গে সমসাময়িক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের রাজনৈতিক কৌশলগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করেছি। জামায়াতে ইসলামী একটি প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী ইসলামী রাজনৈতিক দল, যা গণতান্ত্রিক ও জনগণকেন্দ্রিক রাজনীতির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে নীতিমালা পরিমার্জন করে চলে।

দ্য উইক: জামায়াতকে প্রায়ই ক্যাডারভিত্তিক আদর্শিক দল বলা হয়। এই আদর্শিক অবস্থানকে কীভাবে গণভিত্তিক নির্বাচনী সমর্থনে রূপ দিচ্ছেন?

ডা. শফিকুর রহমান: জামায়াতে ইসলামী নিঃসন্দেহে একটি ক্যাডারভিত্তিক আদর্শিক দল। তবে আমাদের আদর্শের ভিত্তি হলো শৃঙ্খলা, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও জনসেবা। জামায়াত তার গঠনতন্ত্রের অক্ষর ও চেতনা–উভয়ই কঠোরভাবে অনুসরণ করে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে দমন-পীড়নের সময়েও আমরা অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেছি।

যে সময়ে দুর্নীতি ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতি মানুষের আস্থা নষ্ট করেছে, সে সময়ে মানুষ ধারাবাহিকতা ও সততাকে বেশি মূল্য দিচ্ছে। বিভিন্ন স্বাধীন জরিপে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আজকের রাজনৈতিক পরিবেশে ভোটাররা সুযোগসন্ধান নয়, নীতিকে; ফাঁপা বক্তব্য নয়, বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের আদর্শিক অবস্থান কোনো দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি।

দ্য উইক: তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে জামায়াতের কৌশল কী?

ডা. শফিকুর রহমান: দুর্নীতি, ভঙ্গ প্রতিশ্রুতি ও অকার্যকর শাসনে হতাশ একটি প্রজন্মের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিভঙ্গির গভীর মিল রয়েছে। তরুণরা অর্থবহ জীবন, সততা ও সুযোগ চায়– আর জামায়াত মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তুলে ধরে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এই সংযোগ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট।

আমাদের নীতিগত অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা গড়ে তোলার দিকে, যাতে তরুণরা বিদেশে যেতে বাধ্য না হয়ে দেশেই সম্মানজনক কর্মজীবন গড়তে পারে। আমরা তরুণদের কোনো সমস্যা হিসেবে দেখি না; বরং জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখি। গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে তরুণদের আত্মত্যাগের যে ‘জুলাইয়ের চেতনা’, জামায়াত সেটিকে সম্মান করে ও ধারণ করে।

দ্য উইক: সমালোচকদের মতে, জামায়াতের অতীত এখনো তার বর্তমানকে ছায়াচ্ছন্ন করে রেখেছে।

ডা. শফিকুর রহমান: আমি এ কথার সঙ্গে একমত নই। বাংলাদেশের মানুষ জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস সম্পর্কে অবগত এবং বিভিন্ন সময়ে ব্যালটের মাধ্যমে আমাদের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে। কোনো দলের অতীতকে বিচ্ছিন্নভাবে মূল্যায়ন করে বর্তমানের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ অস্বীকার করা উচিত নয়।

তবে জামায়াত নৈতিক দায়িত্ব ও পুনর্মিলনে বিশ্বাস করে। জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে আমি প্রকাশ্যে বলেছি– ১৯৪৭ সালের পর থেকে জামায়াতের কোনো সদস্যের কর্মকাণ্ডে যদি কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তবে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করি। এটি আমাদের বিনয়, নৈতিক জবাবদিহি ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

দ্য উইক: অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট বা নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়ে জামায়াত কতটা উন্মুক্ত?

ডা. শফিকুর রহমান: বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা অপরিহার্য। জামায়াতে ইসলামী স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ নয়, নীতির ভিত্তিতে জোটে বিশ্বাস করে।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তিনটি আপসহীন নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে– জুলাইয়ের চেতনার প্রতি অঙ্গীকার ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান; দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা; এবং জাতীয় স্বার্থ ও জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রকৃত বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি। এই নীতির আলোকে জামায়াত ইতিমধ্যে দশটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে জাতীয় পুনর্গঠনের জন্য আদর্শভিত্তিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

দ্য উইক: গণতন্ত্র, নারীর অংশগ্রহণ ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে জামায়াতের অবস্থান কী? নারী প্রার্থী কেন নেই?

ডা. শফিকুর রহমান: জামায়াতে ইসলামী গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের প্রতি দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দু হলো ন্যায়বিচার, সমান নাগরিকত্ব এবং সব বাংলাদেশির মানবিক মর্যাদা। এই অঙ্গীকারের প্রতিফলন হিসেবে জামায়াত একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, যা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের প্রতি আমাদের বাস্তব প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে।

নারী অংশগ্রহণের বিষয়ে জামায়াতের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সংগঠনের নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। নারী প্রার্থী না থাকার কারণ হলো জোটভিত্তিক আসন বণ্টন, যেখানে প্রতি আসনে একজন করে প্রার্থী মনোনীত হয়েছে। জোটসঙ্গী দলগুলোর মনোনীত নারী প্রার্থীদের জামায়াত সম্পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে যৌথ জোটপ্রার্থী হিসেবে।

অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত বহু নারী প্রার্থী দিয়েছে এবং সংসদীয় কার্যক্রম ও নীতি প্রণয়নে নারী সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের নীতিমালার লক্ষ্য একটি বিস্তৃতভিত্তিক জাতীয় সরকার, যেখানে নারী, সংখ্যালঘু, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে–সব পর্যায়ে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য উইকের দিল্লি ব্যুরোর প্রধান নম্রতা বিজি আহুজা

সম্পর্কিত