নির্বাচন হলেও বাংলাদেশে স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা নেই

তৌফিক ই. ফারুক
তৌফিক ই. ফারুক
নির্বাচন হলেও বাংলাদেশে স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা নেই
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে একটি জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শক্তিশালী ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা এই সংস্কার প্যাকেজের লক্ষ্য। ২০২৪ সালে ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের পর প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে ফেরার ঘটনা হবে এই ভোট। ওই আন্দোলন শেখ হাসিনার অধীনে ১৫ বছরের স্বৈর শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। নিঃসন্দেহে এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং পররাষ্ট্রনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কেবল ব্যালট বাক্সের মাধ্যমেই যে সমাধান হবে-এমনটা বলা কঠিন।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করছে। প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার রেষারেষির মধ্য দিয়ে এই উত্তরণকাল অতিবাহিত হচ্ছে।

১৮ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে গড় বয়স ২৬ বছর। ফলে ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে এমন এক প্রজন্ম ভোট দেবে, যারা ২০০৮ সালের পর ভোটার হয়েছেন এবং আগে কখনো জাতীয় পর্যায়ে সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন দেখেননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনই ছিল সর্বশেষ গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি; কারণ ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বিরোধী দলগুলো বর্জন করেছিল এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হলেও পদ্ধতিগত কারচুপির কারণে কলঙ্কিত ছিল, যা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে টানা জয় এনে দিয়েছিল। বর্তমানে ১২ কোটি ৭ লাখেরও বেশি যোগ্য ভোটার থাকলেও, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ায় তারা তাদের ভোটাধিকার কীভাবে প্রয়োগ করবেন সে সম্পর্কে খুব একটা স্বচ্ছ ধারণা নেই। এছাড়া ইতোপূর্বে বঞ্চিত হওয়া প্রবাসীদের ভোটের সুযোগ নির্বাচনী হিসাবকে আরও বিস্তৃত ও জটিল করে তুলেছে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ২০২৪ সালের সহিংসতায় দলের ভূমিকা তদন্তাধীন থাকায় আওয়ামী লীগের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, ফলে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে দলটিকে মূলধারার রাজনীতিতে ফেরানোর ব্যাপারে তীব্র প্রতিরোধ রয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে লন্ডন থেকে ফিরে আসায় দলটির অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও সুসংহত হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামী এবং ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণকারী তরুণনির্ভর রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) মধ্যকার জোট বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে, এনসিপির ইসলামপন্থী জোটে যাওয়া নিয়ে দলটির ভেতর বিভক্তি তৈরি হয়েছে এবং এটি তরুণদের ভোট এক জায়গায় আনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জরিপগুলোতে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান কমছে। ফলে জামায়াত-এনসিপি জোট একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যা বিএনপির দীর্ঘ নির্বাচনী অভিজ্ঞতাকে পরীক্ষার মুখে ফেলবে। জামায়াতের জন্য এই নির্বাচন ঐতিহাসিকভাবে একটি বিরল সুযোগ, যেখানে দলটি কেবল ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রথমবারের মতো একটি জোটের নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র মেরু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও, কিছু আসনে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি থাকায় তাদের ভোটাররা ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।

বিদ্যমান নিরাপত্তাহীনতা

কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতা নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই নির্বচানের জন্য চাপের মুখে ছিল, বিশেষ করে বিএনপির দিকে থেকে। এখন যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তখন নিরাপত্তা ঝুঁকি চরমে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছে এবং ভোট বানচাল করতে দলটি সহিংসতার আশ্রয় নিতে পারে বলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা নির্বাসিত বা কারাবন্দী থাকলেও দেশজুড়ে তাদের তৃণমূল নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর এই উত্তেজনা আরও বাড়ে এবং আওয়ামী লীগপন্থী গোষ্ঠীগুলো ধর্মঘট ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। ভারতে আত্মগোপনে থাকা শেখ হাসিনা যেভাবে উসকানিমূলক বার্তা দিচ্ছেন, তা ভারতের হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত ভীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।

জুলাই আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। ফাইল ছবি
জুলাই আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। ফাইল ছবি

শেখ হাসিনা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। নতুন বিন্যাসে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর রেষারেষি মাঝেমধ্যেই প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত এবং সাত হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। এসব সহিংসতার মূল কারণ ছিল স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও আয়ের উৎসগুলোর নিয়ন্ত্রণ দখল করা। ৯ শতাংশ সহিংস ঘটনায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। ভুল তথ্য ও গুজব এসব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এসব ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, সহিংসতার কাঠামোগত কারণগুলো সমাধান না করেই বাংলাদেশ এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করছে।

১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী থেকে প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে, যাদের সহায়তায় থাকবে ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার মতো নজরদারি ব্যবস্থা। এই বিশাল মোতায়েন মাঠপর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণে রূপ নেয় কি না-তাই হবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা। তবে, বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে থাকলেও নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তা দাতা হিসেবে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নির্বাচনী পরিবেশ গঠনে নির্ধারক হয়ে থাকবে। পুলিশের ভঙ্গুর দশা এবং দলীয়করণের কারণে সেনাবাহিনীর ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন বিশ্বব্যাপী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কারণ দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সরাসরি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই মিয়ানমার থেকে আসা দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় ২০২৪-২০২৫ সালে আরও প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। ঢাকায় একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার না থাকলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়বে, ফলে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত ভঙ্গুর থেকে যাবে এবং বাস্তুচ্যুতি ও সীমান্ত ওপারের সহিংসতা অব্যাহত থাকার ঝুঁকি থাকবে।

এই নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিদেশি শক্তিগুলোর সম্পর্কের ধরনও নির্ধারণ করে দেবে। আমেরিকা সম্ভবত বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে একটি লেনদেন-ভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখবে। পাশাপাশি শরণার্থী পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে, চীন তাদের প্রথাগত অর্থনৈতিক, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারত্বের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করে ও যুদ্ধবিমানসহ উন্নত সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির সম্ভাবনার মাধ্যমে তার কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে ভারত, শেখ হাসিনার পতনের পর একটি তীব্র কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ দীর্ঘদিনের মিত্রের পতনে ঢাকায় নয়াদিল্লির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভারত চুপি চুপি নির্বাচন-পরবর্তী পুনর্সংযোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হয়। বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে এবং পেছনের দিক দিয়ে জামায়াতের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে যে সরকারই ভোটের পর ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা প্রকাশ্যে সংঘাতে না গিয়ে সম্ভবত নয়াদিল্লির সঙ্গে বাণিজ্য ও যোগাযোগকেন্দ্রিক একটি বাস্তবসম্মত সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইবে। তবে সাবেক দণ্ডপ্রাপ্ত নেত্রীকে আশ্রয় দিয়ে রাখার কারণে ভারতের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক পরিসরে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চেষ্টাকে সীমিত করে রাখছে। আস্থার এই সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে বিতর্কের মতো ছোটোখাটো ঘটনাগুলো বারবার সামনে আসছে।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

নির্বাচনের পর বাংলাদেশ সম্ভবত বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো অমীমাংসিত ইস্যুতে নতুন করে সম্পৃক্ততার ওপর ভিত্তি করে একটি বাস্তববাদী সম্পর্ক অনুসরণ করবে। একই সঙ্গে, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট জাতীয়তাবাদের ওপর ভর করে পরবর্তী সরকার আরও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের লক্ষ্যে বৈশ্বিক অংশীদারদের পরিসর বিস্তৃত করতে চাইবে এবং হাসিনা-যুগে ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকারের প্রতি যে অতিমাত্রার আনুগত্য ছিল, তা থেকে সরে আসতে পারে।

আগামীর প্রত্যাশা

এই নির্বাচন কেবল কে ক্ষমতায় যাবে তার জন্য নয়, বরং পরবর্তী সরকার অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারবে কি না তার পরীক্ষা। দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেও এখনো কোভিড মহামারির আগের গতিপথে ফিরতে পারেনি। ২০২৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে এবং মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা জনগণের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে-যা সুযোগের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিও নিয়ে আসবে। শুল্ক-সুবিধা ও রেয়াতি অর্থায়ন হারানোর ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপ বাড়তে পারে, যদি না উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও উন্নত বাণিজ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা যায়। এই পরিস্থিতিতে দেশের রাজনীতি যদি স্থিতিশীল থাকে এবং সরকার যদি আগেভাগে বোঝা যায় এমন, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে। এতে করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলোও তুলনামূলকভাবে সহজ ও ঝামেলামুক্তভাবে সামলানো সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে, এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলো দেখায় যে বাংলাদেশের নির্বাচন বাস্তবে কী সমাধান দিতে পারে এবং কী পারে না। নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্যভাবে হয়, তবে এটি একটি স্পষ্ট নির্বাচনী ম্যান্ডেটসহ সরকার গঠনের সুযোগ দেবে-যা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সংহত করতে, অনিশ্চয়তা কমাতে, আইনশৃঙ্খলা উন্নত করতে, বিনিয়োগকারী ও জনআস্থা পুনরুদ্ধার করতে এবং একটি সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে করতে সক্ষম হবে। জুলাই সনদের ওপর গণভোটটি পাস হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ দেশের মানুষ দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পর পরিবর্তন চায়। ফলে আগত সরকারের ওপর এসব সংস্কার বাস্তবায়নের প্রবল চাপ থাকবে। তা করতে ব্যর্থ হলে নতুন করে গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হবে।

একই সঙ্গে, নির্বাচন তাৎক্ষণিকভাবে সমঝোতা বা রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান ঘটাতে পারে না। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনে জমে থাকা ক্ষোভ, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর গভীর মেরূকরণ এবং জবরদস্তিমূলক প্রেশার গ্রুপের স্থায়িত্ব-এসব এক ভোটেই মিলিয়ে যাবে না। ফলে পরবর্তী সরকারকে দুর্বল হয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, দীর্ঘদিনের বিলম্বিত সংস্কার বাস্তবায়ন এবং দেশে-বিদেশে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সক্ষমতার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, নির্বাচন নিজে কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং সম্ভাব্য স্থিতিশীলতার পথে একটি সূচনা মাত্র।

(ওয়াশিংটন-ভিত্তিক অলাভজনক, দলনিরপেক্ষ থিঙ্ক ট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের প্রকাশনা সাউথ এশিয়ান ভয়েসের নিবন্ধটি অনুবাদ করে প্রকাশিত। স্টিমসন সেন্টার বৈশ্বিক শান্তি-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে।)

লেখক:উনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের একজন পিএইচডি গবেষক

সম্পর্কিত