যখন একজন বৃদ্ধা বাংলাদেশ থেকে আমাকে ফোন করলেন

রকিবউজ জামান
রকিবউজ জামান
যখন একজন বৃদ্ধা বাংলাদেশ থেকে আমাকে ফোন করলেন
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ছবি: রয়টার্স

জুন মাসের এক গুমোট গরমে, আমি আর আমার এক সহকর্মী আসামের বরপেটা জেলায় একটি সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম। ঠিক তখনই আমার ফোনটা বেজে উঠল।

ফোন করেছিলেন মোস্তাফিজুর তারা, বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার একজন সাংবাদিক।  তার সঙ্গে এক সপ্তাহ আগে আমি যোগাযোগ করেছিলাম। আসামের সেই ১৪ জন মানুষের গল্প তুলে ধরতে মোস্তাফিজুর আমাকে সাহায্য করছিলেন, যাদের গত ২৭ মে গভীর রাতে মাটিয়া ডিটেনশন সেন্টার থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

গুজব ছড়িয়েছিল যে তাদের বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে পরের দিন সকালে মোস্তাফিজুরের একটি ভিডিও রিপোর্ট প্রমাণ দেয় যে, যারা সারা জীবন ভারতে কাটিয়েছেন, সেই ১৪ জন নারী-পুরুষকে জোরপূর্বক দেশ থেকে বের করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এর একটি জলাভূমিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

আমি ফোন ধরলাম। মোস্তাফিজুর প্রায় সাথে সাথেই ফোনটি একজন বৃদ্ধার হাতে তুলে দিলেন। তিনি কাঁদছিলেন, তার কণ্ঠস্বর ছিল ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া।

তিনি বললেন, ‘‘দয়া করে আমাকে আসামে ফিরিয়ে নিয়ে যান। এখানে আমার কেউ নেই।’’

ষাটোর্ধ্ব ওই নারী জানান, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) তাকে আরও কয়েকজন ‘ ঘোষিত বিদেশির’ সঙ্গে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। উল্লেখ্য, আসামের যেসব বাসিন্দাদের পরিচয়পত্রের ঘাটতির কারণে ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, তাদেরই ‘ঘোষিত বিদেশি’ বলা হয়।

কিন্তু ওই বৃদ্ধা বেশি দূর দৌড়াতে পারেননি। পায়ে চোট পেয়ে তিনি পড়ে যান। বাংলাদেশের কিছু গ্রামবাসী তাকে খাবার ও আশ্রয় দিয়েছেন। বাংলাদেশি ওই সাংবাদিক জানালেন, চোটের কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। তিনি আরও বললেন, ‘‘তিনি হাঁটার মতো অবস্থায় নেই। দয়া করে উনার পরিবারকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন।’’

ভিনদেশে আটকে পড়া একজন অসহায় নারীর কণ্ঠ শুনে আমি ভীষণ অস্থির বোধ করতে লাগলাম। সাংবাদিক হিসেবে যাদের খবর আমরা সংগ্রহ করি, তাদের কাছ থেকে তথ্যের জন্য যোগাযোগ করা বা তাদের গল্প বলার দায়িত্ব আমাদের ওপর আসাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের কিছু সীমা মেনে চলতে হয়।

টহল দিচ্ছেন এক বিএসএফ সদস্য। ছবি: রয়টার্স
টহল দিচ্ছেন এক বিএসএফ সদস্য। ছবি: রয়টার্স

একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি যে নিয়মগুলো মেনে চলি, তার মধ্যে একটি হলো ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে না পড়া। আমার সংবাদটি কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং বৃহত্তর আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দিয়ে তৈরি হওয়া উচিত। আমার ভয় হয় যে, কাউকে সাহায্য করতে গেলে হয়তো নৈতিকতা বিঘ্নিত হবে। আমার সাহায্যের প্রস্তাব কি আমার লেখার ওপর প্রভাব ফেলবে? পাঠকরা কি এখানে স্বার্থের সংঘাত খুঁজে পাবেন? আর রাষ্ট্র যাকে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে বের করেছে , তাকে সাহায্য করার অর্থই বা কী?

কিন্তু আসামের নাগরিকত্ব পরীক্ষার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আমি মানুষের চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি হয়েছি। সেখানে বিপুল সংখ্যক বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

আমার সেই জীর্ণ বৃদ্ধ লোকটির কথা মনে পড়ে, যাকে অন্যদের সাথে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি কোনোভাবে আসামে ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করার মতো কোনো আইনজীবী তার ছিল না। আইনজীবীর খরচ চালানোর সামর্থ্যহীন সেই পরিবারটি আমার দিকে আশার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। গুয়াহাটির এক আইনজীবীর সাথে তাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। ওই আইনজীবী বিনামূল্যে তাদের সাহায্য করতে রাজি হয়েছিলেন।

জুলাই মাসে গোয়ালপাড়া জেলায় উচ্ছেদ অভিযানের সময় আমার দেখা হয় ৫৪ বছর বয়সী আব্দুল বারেকের সাথে। চার দশকেরও বেশি সময় সেখানে বাস করেন তিনি। জানা গেল, আব্দুল বারেক এবং আরও এক হাজার ৮০টি পরিবারের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ঘটনা জানাজানির অনেক দিন পর পর্যন্ত বারেক আমাকে ফোন করতেন। কীভাবে নিজের জমি ফিরে পাওয়া যায় তার পথ খুঁজতে। একদিন তিনি ভেঙে পড়ে বললেন, ‘‘এই ভারী বৃষ্টির মধ্যে আমাদের রাস্তার ওপর থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে।’’

১৮০০ সালের শেষ দিকে এবং ১৯০০ সালের শুরুতে যারা বাংলা থেকে আসামে গেছেন, সেই ‘মিয়া’ মুসলিমদের জীবন বরাবরই কঠিন। ছবি: সংগৃহীত
১৮০০ সালের শেষ দিকে এবং ১৯০০ সালের শুরুতে যারা বাংলা থেকে আসামে গেছেন, সেই ‘মিয়া’ মুসলিমদের জীবন বরাবরই কঠিন। ছবি: সংগৃহীত

বারেকদের মতো মানুষের এই হাহাকারের মূল কারণ হলো, তাদের জন্য কোথাও থেকে কোনো সাহায্য আসছে না। না রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে, না আসামের সুশীল সমাজের কাছ থেকে। ১৮০০ সালের শেষ দিকে এবং ১৯০০ সালের শুরুতে যারা বাংলা থেকে আসামে গেছেন, সেই ‘মিয়া’ মুসলিমদের জীবন বরাবরই কঠিন। তাদের জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয় এবং অভিবাসনের ইতিহাসের কারণে তাদের সবসময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। তাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে গালি দেওয়া হয়।

কিন্তু এই বছর, এই সম্প্রদায়টি রাষ্ট্রের নজিরবিহীন আক্রমণের মুখে পড়েছে। এই সম্প্রদায়ের অংশ আমিও। এই সম্প্রদায়ের নিয়মিত ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। গৃহহীন মানুষের এই অসহায়ত্ব প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায় ফুটে ওঠে, যেখানে তাদের প্রতি সহমর্মিতা খুব কমই দেখা যায়।

তাই বাংলাদেশে পরিত্যক্ত সেই বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলার সময় আমার দৃঢ়তা কিছুটা টলে গিয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যায় আমি ‘অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’-এর সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করি, তারা ওই নারীর পরিবার সম্পর্কে কিছু জানে কি না দেখার জন্য। মধ্যরাতের মধ্যেই তারা তার ছেলের ফোন নম্বর জোগাড় করে দেয়।

আমি সাথে সাথেই ছেলেকে ফোন করি। ছেলে জানতেন যে তার মাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার সাথে যোগাযোগ করার কোনো পথ তার জানা ছিল না। আমি তাকে মোস্তাফিজুরের নম্বর দিলাম এবং ভালো কিছুর আশা করলাম।

এক মাস পর তিনি আমাকে ফোন করেন। তার মা আসামে নিজের গ্রামে ফিরে আসতে পেরেছেন।

লেখাটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল থেকে অনুবাদ করা হয়েছে

সম্পর্কিত