‘ভঙ্গুর’ বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘গ্লোবাল সাউথ’ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?
দিলনোজা ওবায়দুল্লায়েভা
‘ভঙ্গুর’ বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘গ্লোবাল সাউথ’ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?
দিলনোজা ওবায়দুল্লায়েভা
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৮: ২৬
আগামী বিশ্বব্যবস্থার চেহারা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে এই গ্লোবাল সাউথই। ছবি: রয়টার্স
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিশ্বের সেই অল্পসংখ্যক নেতাদের মধ্যে একজন, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে সৃষ্ট বিশ্ব ব্যবস্থার ‘বিপর্যস্ত’ রূপ নিয়ে প্রথম সরব হয়েছিলেন। উদার বিশ্বব্যবস্থা যেটুকু অবশিষ্ট রয়েছে তা রক্ষায় তিনি তথাকথিত ‘মধ্যম শক্তি’র দেশগুলোকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান।
তবে এই পুরো প্রেক্ষাপটে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর ভূমিকা ঠিক কী হবে?
অনেকের বিশ্বাস এটিই সবকিছুর ফয়সালা করে দেবে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব মন্তব্য করেছিলেন, “আগামী বিশ্বব্যবস্থার চেহারা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে এই গ্লোবাল সাউথই।”
গ্লোবাল সাউথ আসলে কী?
পাশ্চাত্য-শাসিত বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘোষণা করার সময় সম্ভবত এখনো আসেনি। যদিও ইরানে চলমান যুদ্ধ অনেক দেশকে বর্তমান ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করছে। কারণ এখানে এখন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিই প্রধান বলে মনে হচ্ছে। তবে ‘গ্লোবাল সাউথ’ মোটেও কোনো ঐক্যবদ্ধ জোট নয়।
প্রথমত, ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কোনো সর্বসম্মত সংজ্ঞা বা পরিধি নেই। এই নামটির দ্বারা দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত দেশগুলোকে বোঝানো হলেও, গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশই বিষুবরেখার উত্তরে অবস্থিত। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড (ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণে হলেও) ‘গ্লোবাল নর্থ’ বা উত্তর বিশ্বের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আগামী বিশ্বব্যবস্থার চেহারা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে এই গ্লোবাল সাউথই
কেউ কেউ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়াকে গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশ হিসেবে একত্রে বিবেচনা করেন, তবে এটি অত্যন্ত সরলীকরণ হয়ে যায়। এছাড়া চীনের মতো একটি বড় অর্থনীতির দেশকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে? কেউ কেউ একে গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভুক্ত করেন, আবার কেউ কেউ করেন না।
গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে কিছু সাধারণ মিল রয়েছে। যেমন-এই দেশগুলোর বেশিরভাগই কোনো না কোনো শক্তিশালী দেশের উপনিবেশ ছিল। এগুলো মূলত উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশ যারা দ্রুত উন্নতির আশা করছে। আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই দেশগুলো অনেক সময় পশ্চিমা দেশগুলোর (গ্লোবাল নর্থ) তুলনায় কম প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
গ্লোবাল সাউথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এমন কোনো একক রাষ্ট্র নেই যাকে এর নেতা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত বলা যায় কিংবা এ ধরনের নেতৃত্বের প্রতি কোনো জোরালো সমর্থনও নেই।
চীন তার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু অংশে প্রভাবশালী হলেও, পশ্চিমের দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ভারত সম্ভবত চীনের বৈশ্বিক নেতৃত্ব মেনে নেবে না।
যে সংজ্ঞাই ব্যবহার করা হোক না কেন, গ্লোবাল সাউথের কিছু রাষ্ট্রের আচরণ এটিই প্রমাণ করে যে, তারা একই সাথে একাধিক পক্ষের সাথে বৈদেশিক নীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তারা মূলত নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে রেখে বিভিন্ন জোটে যোগ দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোর মোকাবিলায় এই গোষ্ঠীগুলো খুব একটা কার্যকর বা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, যা তাদের প্রভাবের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
উদাহরণস্বরূপ ব্রিকস-এর কথা ধরা যাক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জোটটি ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মোট ১০টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে।
তা সত্ত্বেও, চলমান যুদ্ধ নিয়ে জোটটি কোনো ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। চীন ও রাশিয়া ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানালেও, ভারতের মতো অন্যান্য সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে।
কিছু বিশ্লেষক একটি মূল সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। ব্রিকস সদস্যরা অনেক মৌলিক কৌশলগত ইস্যুতে এখনো বিভক্ত এবং তাদের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধগুলো মীমাংসা করার জন্য কোনো কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম নেই। ইরান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের কথা যখন আসে, তখন গ্লোবাল সাউথের প্রতিটি দেশের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা থাকে।
গ্লোবাল সাউথ মূলত উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশ যারা দ্রুত উন্নতির আশা করছে। ছবি: রয়টার্স
উদাহরণস্বরূপ, ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটলে চীন তাদের একজন প্রধান অংশীদারকে হারাবে। ইরান চীন-নিয়ন্ত্রিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের একজন সদস্য এবং পশ্চিমা-শাসিত শাসনব্যবস্থার বিকল্প তৈরির প্রচেষ্টায় চীনের এক গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। তাছাড়া, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ পথের জন্য চীন ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
অন্যদিকে, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি তাদের জন্য বিশ্বমঞ্চে অনেক বড় ভূমিকা রাখার একটি সুযোগ। তবে দেশটি একই সাথে এটি নিশ্চিত করতেও আগ্রহী যাতে তাদের প্রতিরক্ষা অংশীদার সৌদি আরব একটি ব্যাপক যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে না পড়ে। তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরব আক্রান্ত হলে পাকিস্তানকে অবশ্যই সহায়তা করতে হবে।
আর ভারত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখে, যা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর যেমনটি উল্লেখ করেছেন, ভারত কোনো পশ্চিমা দেশ নয়, আবার এটি পাশ্চাত্য-বিরোধীও নয়। এই অবস্থানের কারণেই ভারত একদিকে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান কৌশলগত অংশীদার থাকতে পারছে, অন্যদিকে পুনরায় ইরানের কাছ থেকে তেল ও গ্যাস কেনাও শুরু করতে পারছে।
প্রভাব বিস্তারের অন্যান্য পথ
আলেকজান্ডার স্টাব তার বই, ‘দ্য ট্রায়াঙ্গেল অফ পাওয়ার’-এ যুক্তি দিয়েছেন যে, বিশ্ব বর্তমানে তিনটি অংশে বিভক্ত হচ্ছে—গ্লোবাল ওয়েস্ট (যার নেতৃত্বে এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), গ্লোবাল ইস্ট (যার নেতৃত্বে চীন ও রাশিয়া) এবং গ্লোবাল সাউথ (যা আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার মধ্যম ও ক্ষুদ্র শক্তিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত)।
স্টাবের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এখন পূর্ব ও পশ্চিমের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ‘গ্লোবাল সাউথ’ হলো সেই দোদুল্যমান পেন্ডুলাম যা নির্ধারণ করবে বিশ্ব শেষ পর্যন্ত কোন দিকে ঝুঁকবে। পুরনো উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে পশ্চিমের দেশগুলোকে অবশ্যই গ্লোবাল সাউথকে তাদের নিজেদের পক্ষে টানতে হবে।
কিন্তু আবারও বলছি, এটি অত্যন্ত সরল একটি দৃষ্টিভঙ্গি। আমি বিশ্বাস করি, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ঝোঁক মূলত বহুকেন্দ্রিকতা বা মাল্টিপোলারিটির দিকে; অর্থাৎ এমন এক বিশ্বব্যবস্থা যা যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো কোনো একক শক্তির দ্বারা শাসিত হবে না।
তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের কণ্ঠস্বর জোরালভাবে তুলে ধরতেও আগ্রহী। যেহেতু গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশই একসময় পশ্চিমা শক্তিগুলোর উপনিবেশ ছিল, তাই তারা ঔপনিবেশিক আমলের সেই ক্ষতি বা অন্যায়ের বিচার চায়, যা তাদের মতে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাতেও বিদ্যমান। গাজায় যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজি) ইসরায়েলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার পদক্ষেপটি এরই একটি বড় উদাহরণ।
একই সাথে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বর্তমান ফাটলগুলো বিকল্প কূটনৈতিক ক্ষেত্র এবং নমনীয় জোট গঠনের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি রাষ্ট্রগুলোকে এমন এক সুযোগ করে দিচ্ছে যাতে তারা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী যখন প্রয়োজন অংশীদার পরিবর্তন করতে পারে।
এর অর্থ হলো, যখন সুবিধা হয় তখন পশ্চিমের সাথে সহযোগিতা করা, আবার একই সাথে চীন, রাশিয়া বা অন্যান্য ব্লক ও শক্তিগুলোর সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখা।
ইন্দোনেশিয়া এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গত এক মাসের মধ্যেই দেশটি ওয়াশিংটনের সাথে একটি বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, আবার দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রবোয়ো সুবিয়ান্তো মস্কো সফর করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন।
আজকের ক্ষমতার রাজনীতিতে গ্লোবাল সাউথ যে ক্রমশ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা স্পষ্ট। তবে এই দেশগুলো শেষ পর্যন্ত কীভাবে তাদের প্রভাব কাজে লাগাবে, তা দেখার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: গবেষক এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্ভুক্ত ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজে লেকচারার
নিবন্ধটি দ্য কনভারসেশন থেকে অনূদিত
আগামী বিশ্বব্যবস্থার চেহারা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে এই গ্লোবাল সাউথই। ছবি: রয়টার্স
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিশ্বের সেই অল্পসংখ্যক নেতাদের মধ্যে একজন, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে সৃষ্ট বিশ্ব ব্যবস্থার ‘বিপর্যস্ত’ রূপ নিয়ে প্রথম সরব হয়েছিলেন। উদার বিশ্বব্যবস্থা যেটুকু অবশিষ্ট রয়েছে তা রক্ষায় তিনি তথাকথিত ‘মধ্যম শক্তি’র দেশগুলোকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান।
তবে এই পুরো প্রেক্ষাপটে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর ভূমিকা ঠিক কী হবে?
অনেকের বিশ্বাস এটিই সবকিছুর ফয়সালা করে দেবে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব মন্তব্য করেছিলেন, “আগামী বিশ্বব্যবস্থার চেহারা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে এই গ্লোবাল সাউথই।”
গ্লোবাল সাউথ আসলে কী?
পাশ্চাত্য-শাসিত বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘোষণা করার সময় সম্ভবত এখনো আসেনি। যদিও ইরানে চলমান যুদ্ধ অনেক দেশকে বর্তমান ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করছে। কারণ এখানে এখন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিই প্রধান বলে মনে হচ্ছে। তবে ‘গ্লোবাল সাউথ’ মোটেও কোনো ঐক্যবদ্ধ জোট নয়।
প্রথমত, ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কোনো সর্বসম্মত সংজ্ঞা বা পরিধি নেই। এই নামটির দ্বারা দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত দেশগুলোকে বোঝানো হলেও, গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশই বিষুবরেখার উত্তরে অবস্থিত। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড (ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণে হলেও) ‘গ্লোবাল নর্থ’ বা উত্তর বিশ্বের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আগামী বিশ্বব্যবস্থার চেহারা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে এই গ্লোবাল সাউথই
কেউ কেউ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়াকে গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশ হিসেবে একত্রে বিবেচনা করেন, তবে এটি অত্যন্ত সরলীকরণ হয়ে যায়। এছাড়া চীনের মতো একটি বড় অর্থনীতির দেশকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে? কেউ কেউ একে গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভুক্ত করেন, আবার কেউ কেউ করেন না।
গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে কিছু সাধারণ মিল রয়েছে। যেমন-এই দেশগুলোর বেশিরভাগই কোনো না কোনো শক্তিশালী দেশের উপনিবেশ ছিল। এগুলো মূলত উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশ যারা দ্রুত উন্নতির আশা করছে। আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই দেশগুলো অনেক সময় পশ্চিমা দেশগুলোর (গ্লোবাল নর্থ) তুলনায় কম প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
গ্লোবাল সাউথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এমন কোনো একক রাষ্ট্র নেই যাকে এর নেতা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত বলা যায় কিংবা এ ধরনের নেতৃত্বের প্রতি কোনো জোরালো সমর্থনও নেই।
চীন তার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু অংশে প্রভাবশালী হলেও, পশ্চিমের দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ভারত সম্ভবত চীনের বৈশ্বিক নেতৃত্ব মেনে নেবে না।
যে সংজ্ঞাই ব্যবহার করা হোক না কেন, গ্লোবাল সাউথের কিছু রাষ্ট্রের আচরণ এটিই প্রমাণ করে যে, তারা একই সাথে একাধিক পক্ষের সাথে বৈদেশিক নীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তারা মূলত নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে রেখে বিভিন্ন জোটে যোগ দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোর মোকাবিলায় এই গোষ্ঠীগুলো খুব একটা কার্যকর বা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, যা তাদের প্রভাবের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
উদাহরণস্বরূপ ব্রিকস-এর কথা ধরা যাক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জোটটি ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মোট ১০টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে।
তা সত্ত্বেও, চলমান যুদ্ধ নিয়ে জোটটি কোনো ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। চীন ও রাশিয়া ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানালেও, ভারতের মতো অন্যান্য সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে।
কিছু বিশ্লেষক একটি মূল সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। ব্রিকস সদস্যরা অনেক মৌলিক কৌশলগত ইস্যুতে এখনো বিভক্ত এবং তাদের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধগুলো মীমাংসা করার জন্য কোনো কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম নেই। ইরান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের কথা যখন আসে, তখন গ্লোবাল সাউথের প্রতিটি দেশের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা থাকে।
গ্লোবাল সাউথ মূলত উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশ যারা দ্রুত উন্নতির আশা করছে। ছবি: রয়টার্স
উদাহরণস্বরূপ, ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটলে চীন তাদের একজন প্রধান অংশীদারকে হারাবে। ইরান চীন-নিয়ন্ত্রিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের একজন সদস্য এবং পশ্চিমা-শাসিত শাসনব্যবস্থার বিকল্প তৈরির প্রচেষ্টায় চীনের এক গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। তাছাড়া, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ পথের জন্য চীন ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
অন্যদিকে, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি তাদের জন্য বিশ্বমঞ্চে অনেক বড় ভূমিকা রাখার একটি সুযোগ। তবে দেশটি একই সাথে এটি নিশ্চিত করতেও আগ্রহী যাতে তাদের প্রতিরক্ষা অংশীদার সৌদি আরব একটি ব্যাপক যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে না পড়ে। তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরব আক্রান্ত হলে পাকিস্তানকে অবশ্যই সহায়তা করতে হবে।
আর ভারত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখে, যা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর যেমনটি উল্লেখ করেছেন, ভারত কোনো পশ্চিমা দেশ নয়, আবার এটি পাশ্চাত্য-বিরোধীও নয়। এই অবস্থানের কারণেই ভারত একদিকে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান কৌশলগত অংশীদার থাকতে পারছে, অন্যদিকে পুনরায় ইরানের কাছ থেকে তেল ও গ্যাস কেনাও শুরু করতে পারছে।
প্রভাব বিস্তারের অন্যান্য পথ
আলেকজান্ডার স্টাব তার বই, ‘দ্য ট্রায়াঙ্গেল অফ পাওয়ার’-এ যুক্তি দিয়েছেন যে, বিশ্ব বর্তমানে তিনটি অংশে বিভক্ত হচ্ছে—গ্লোবাল ওয়েস্ট (যার নেতৃত্বে এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), গ্লোবাল ইস্ট (যার নেতৃত্বে চীন ও রাশিয়া) এবং গ্লোবাল সাউথ (যা আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার মধ্যম ও ক্ষুদ্র শক্তিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত)।
স্টাবের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এখন পূর্ব ও পশ্চিমের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ‘গ্লোবাল সাউথ’ হলো সেই দোদুল্যমান পেন্ডুলাম যা নির্ধারণ করবে বিশ্ব শেষ পর্যন্ত কোন দিকে ঝুঁকবে। পুরনো উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে পশ্চিমের দেশগুলোকে অবশ্যই গ্লোবাল সাউথকে তাদের নিজেদের পক্ষে টানতে হবে।
কিন্তু আবারও বলছি, এটি অত্যন্ত সরল একটি দৃষ্টিভঙ্গি। আমি বিশ্বাস করি, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ঝোঁক মূলত বহুকেন্দ্রিকতা বা মাল্টিপোলারিটির দিকে; অর্থাৎ এমন এক বিশ্বব্যবস্থা যা যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো কোনো একক শক্তির দ্বারা শাসিত হবে না।
তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের কণ্ঠস্বর জোরালভাবে তুলে ধরতেও আগ্রহী। যেহেতু গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশই একসময় পশ্চিমা শক্তিগুলোর উপনিবেশ ছিল, তাই তারা ঔপনিবেশিক আমলের সেই ক্ষতি বা অন্যায়ের বিচার চায়, যা তাদের মতে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাতেও বিদ্যমান। গাজায় যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজি) ইসরায়েলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার পদক্ষেপটি এরই একটি বড় উদাহরণ।
একই সাথে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বর্তমান ফাটলগুলো বিকল্প কূটনৈতিক ক্ষেত্র এবং নমনীয় জোট গঠনের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি রাষ্ট্রগুলোকে এমন এক সুযোগ করে দিচ্ছে যাতে তারা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী যখন প্রয়োজন অংশীদার পরিবর্তন করতে পারে।
এর অর্থ হলো, যখন সুবিধা হয় তখন পশ্চিমের সাথে সহযোগিতা করা, আবার একই সাথে চীন, রাশিয়া বা অন্যান্য ব্লক ও শক্তিগুলোর সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখা।
ইন্দোনেশিয়া এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গত এক মাসের মধ্যেই দেশটি ওয়াশিংটনের সাথে একটি বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, আবার দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রবোয়ো সুবিয়ান্তো মস্কো সফর করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন।
আজকের ক্ষমতার রাজনীতিতে গ্লোবাল সাউথ যে ক্রমশ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা স্পষ্ট। তবে এই দেশগুলো শেষ পর্যন্ত কীভাবে তাদের প্রভাব কাজে লাগাবে, তা দেখার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: গবেষক এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্ভুক্ত ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজে লেকচারার