Advertisement Banner

সাংবাদিকতা যখন কাম নাই করতে…

সাংবাদিকতা যখন কাম নাই করতে…
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

‘আপনের কাম নাই করতে…’

এই কথাটি একটি ভিডিওর কল্যাণে বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার কারণেই অনেক অনেক মানুষ ভিডিওটি দেখে ফেলেছে। এ নিয়ে হাসাহাসিও হচ্ছে বেশ। ওপরের কথাটির আগে, পরে আরো কিছু কথা আছে। এ লেখা যারা পড়ছেন, তারা তা জানেন ধরে নিয়েই এগোনো যাক।

ঘটনা হলো, ভিডিওটিতে একজন নারী ও পুরুষের সামনে বুম নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক সাংবাদিক। তিনি কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তার প্রত্যুত্তরে ওই নারী বেশ ক্ষোভ নিয়েই কথাগুলো বলছিলেন। সেই কথাগুলোয় স্পষ্টভাবে যে বিষয় নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল, তা হলো–কারো ব্যক্তিগত সীমায় নিজেকে সাংবাদিক দাবি করা ওই ব্যক্তির অনধিকার প্রবেশ নিয়ে। নারীর বক্তব্য ছিল, নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে তিনি কী করবেন, সেটি একান্তই তার ব্যাপার। এরপরই আসে তার সেই জনপ্রিয় জিজ্ঞাসা, “আপনের কাম নাই করতে...?”

প্রথমটির পর দ্বিতীয় আরেকটি প্রশ্নও করেছিলেন ওই নারী। বেশ ক্ষোভের সাথেই। গালিজাতীয় হওয়ায় তা উল্লেখ না করাই ভালো। তবে মনের ভাব সঠিকভাবে প্রকাশ করাই যদি ভাষার মূল কাজ হয়ে থাকে, তবে ওই প্রশ্নটি সার্থক এবং চূড়ান্ত মাত্রায় সফল। এভাবে অন্যের ব্যক্তিসীমায় প্রবেশ করা সাংবাদিককে সঠিক প্রশ্নটি হয়তো অনেকেই করতে পারেন না। অনেকে হয়তো সাংবাদিকের সীমা কতটুকু, সেটিও জানেন না। আর আমাদের দেশে ব্যক্তির অধিকার তো বরাবরই কম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

আর ঠিক এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়েই আমাদের দেশে এক কিম্ভূত ধরনের সাংবাদিকতা চালু হয়ে গেছে। সেটি হলো, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিউ পাওয়ার জন্য যা ইচ্ছা তাই করার সাংবাদিকতা। যেভাবেই হোক আলোচনায় আসতে হবে, মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ লাগবে। আর সেই কারণে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বা অফিশিয়াল চেকপোস্টে গিয়ে অপরাধী না হলেও সাধারণ মানুষের মুখের সামনে ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। হয়তো একজনের বাইকের লাইসেন্স চেক করা হচ্ছে। অমনি ফুটেজ নিয়ে আপলোড করে দেওয়া হচ্ছে এই বলে যে, ‘পুলিশের তল্লাশিতে বাইকার ধরা’! হয়তো ওই ব্যক্তির সব লাইসেন্স ঠিকই ছিল, তবুও তাকে অপরাধী বানিয়ে ভিডিও ছেড়ে দেওয়া হবে ফেসবুক, ইউটিউবে। আসল কথা হলো–ভিউ, তা এখন যেভাবেই আসুক না কেন।

এ তো খুবই সাধারণ উদাহরণ দেওয়া হলো। আরো মারাত্মক মারাত্মক কাজও হয়। এই যেমন কোনো হোটেলে হয়তো অভিযান চালাল পুলিশ, সেখানে বেছে বেছে নারীদের মুখের ওপর ক্যামেরা ধরা হলো। তিনি কোনো অপরাধে যুক্ত কি না, সেসব নিশ্চিত হওয়ার বালাই নেই। অপরাধের অভিযোগ থাকলেও অবশ্য এমনটি করা যায় না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী সেটিও অনেক সময় অনৈতিক। তারপরও এসব হরহামেশা হয়। অথবা পার্কে গিয়ে ক্যামেরা জুম করে ধরে রাখা হয় নারী, পুরুষের প্রতি। তারা যদি হাসাহাসিও করে, তবু সেটিই কনটেন্ট। এর বাইরে আছে জাতীয় দিবসে গিয়ে যে কারো মুখের সামনে বুম রেখে বাচ্চাকে পড়া ধরার মতো করে কখনো বাংলা মাসের নাম, পড়াশোনা করে প্রেম করবে কিনা, কবে কোন দিবস, ঈদে কত টাকা দিয়ে জামাকাপড় কেনা হয়েছে ইত্যাদির মতো ব্যক্তিসীমা লঙ্ঘণকারী প্রশ্ন করা। আর কেউ সেই ফাঁদে পা দিয়ে মন খুলে বা মজা করেও কিছু বলে ফেললে তো কথাই নেই। হয়ে যাবে ‘ভাইরাল’!

এমন ভাইরাল বা ভিউ ব্যবসার ভাইরাসে এখন কম-বেশি সব সংবাদমাধ্যমই আক্রান্ত। বিশেষত ডিজিটাল মাধ্যমকে এখানে মূখ্য ধরা হয়। যেহেতু ডিজিটাল মাধ্যমের মধ্যে সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলো পড়ে, এবং সেখান থেকে ভিউ কামাতে চায় সংবাদমাধ্যমগুলো, তাই সেসবেই এসব ‘ছাপড়ি’ কনটেন্টের বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়। হাতেগোণা কিছু সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বাদে প্রায় সবই এখন এমন ভাইরাসে আক্রান্ত। এ ভাইরাস প্রথমেই ভুলিয়ে দেয় সাংবাদিকতার নৈতিকতা। এর পর শুধুই ভিউয়ের লিফট দিয়ে নিচে নামা কেবল!

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা যে ‘কাম নাই করতে’ অবস্থায় পৌঁছাল, সেটি আসলে শুধুই মোবাইল জার্নালিস্টদের অবদান নয়। বরং নিউজ মিডিয়ার পুরো ইকোসিস্টেমই এর জন্য দায়ী। ভোক্তারাও দায়ী। সবাই মিলেই একে নেওয়া হয়েছে খাদের কিনারায়। এখন কেবল পেছন থেকে একটা জোরে ধাক্কা দেওয়া বাকি।

ইদানীং আবার আরেক অভিযোগ উঠছে মোবাইল, গিম্বল নিয়ে কাজ করা মোবাইল জার্নালিস্টদের বিরুদ্ধে। সেটি হলো– অনেকে নাকি ভিউ বাড়ানোর মতো ঘটনা সংঘটিত করতেও ভূমিকা রাখা শুরু করে দিয়েছে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনায় সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে যে, মব সংঘটিত করতে নাকি কয়েকজন মোবাইল জার্নালিস্ট ভূমিকা রেখেছেন এবং সেইসাথে ওই মব হওয়ার পর ভুক্তভোগীদের ভিডিও করে সেসব তথাকথিত সংবাদমাধ্যমের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে প্রকাশও করা হয়েছে। এটি খুবই গুরুতর একটি অভিযোগ। এটি প্রমাণিত হলে এর অর্থ দাঁড়ায়, নিজেদের সাংবাদিক দাবি করা ব্যক্তিরা অপরাধ সংগঠনেই ভূমিকা রাখা শুরু করে দিচ্ছেন এবং ওই অপরাধের ভিডিও করছেন ভিউয়ের স্বার্থে।

আবার এমন অভিযোগও উঠেছে যে, বিভিন্ন পাবলিক ইভেন্টে মোবাইল জার্নালিস্টরা নাকি শুধুই নারীদের ওপর ফোকাস রেখে নানা ধরনের ভিডিও করছে। এই ভিডিওর উদ্দেশ্য হলো–নারীদের বিভিন্ন অসতর্ক মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করা। এবং তারপর ‘এ কী করলেন’ ঘরানার টাইটেল দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া। এমনই একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এরই মধ্যে একজন মোবাইল জার্নালিস্টকে তার পেশা সংশ্লিষ্ট সংগঠন থেকে বহিষ্কার করার তথ্য সম্প্রতি সামনে এসেছে। এসবের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন শো-বিজের তারকারা। এমনই একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন নারী মোবাইল জার্নালিস্টকে উঁচু থেকে ধরা মোবাইল নামাতে বলছেন। কারণ তার আশঙ্কা, ওপর থেকে ধরা মোবাইলের ক্যামেরায় আসলে ওই নারীর অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ফুটেজই ধারণের চেষ্টা হচ্ছিল!

অভিযোগের যেন মেলা একেবারে। এত এত অভিযোগই উঠছে হালের মোবাইল জার্নালিস্টদের বিরুদ্ধে। বলা হচ্ছে, একটি মোবাইল আর বুম নিয়ে তারা নাকি এক অর্থে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলছে। ওপরে যত ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে অবশ্য ‘জিম্মি’ শব্দটাও কিছুটা হালকা হয়ে যায়। এর চেয়ে বেশি কিছুই আসলে হচ্ছে। একেবারে ফৌজদারি অপরাধই হচ্ছে। কিন্তু, কেন? শুধু কি মোবাইল জার্নালিস্টরাই ভুলে যাচ্ছে জার্নালিজম? তাদেরই দোষ? নাকি সমস্যা সবখানেই?

বাংলাদেশের নিউজ ইন্ডাস্ট্রিও প্রচণ্ড অপেশাদার। সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা এ দেশে কচু পাতার উপরে টলটল করা পানির মতো। বেতনের কথা তুললে তো বৈষম্য আরও দৃশ্যমান হয়। অর্থনৈতিক সংকটের ফাঁক দিয়ে আরো প্রবল হয়ে ওঠে যোগ্যতা‑সংক্রান্ত সংকট। কারণ, আর্থিক নিরাপত্তা না থাকলে কয়জন আর শুধু প্যাশন থেকে সাংবাদিকতায় আসবেন বা থেকে যাবেন?

সমস্যার কথা যেহেতু উঠলই, একটু বিশদে যাওয়া যাক। মোবাইল জার্নালিস্টরা আসলে মাঠে থাকা সাংবাদিক। সংবাদ আহরণ তাদের কাজ। এই আহরণের কাজটি তাদের করতে বলে আসলে নিউজ ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা তুলনামূলক বড় পদের সাংবাদিকেরা। মূল সমস্যা আসলে ওখানে। ওই টিউমারই পরে ছড়িয়েছে অন্যত্র। নিউজের প্ল্যানিং, এক্সিকিউশন ও ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে আসলে থাকেন বড় পদের সাংবাদিকেরা। তারাই মূল গেটকিপার। তো গেট না ছাড়লে, কনটেন্ট প্রকাশ হয় কী করে?

অর্থাৎ, গেটকিপাররাই এসব ‘ছাপড়ি’ কনটেন্ট ছাড়েন প্রকাশের জন্য। মাথাতেই যখন সমস্যা, তখন আর হাত-পা কী করবে? সেসবও মাথার কথাতেই চলে, নষ্ট হয়। তাহলে মাথা নষ্ট হলো কীভাবে?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো–টাকা ও ভোক্তা। সাংবাদিকতার মাধ্যমে দিনশেষে ব্যবসা করারই চেষ্টা হয়। কারণ, সাংবাদিকদেরও বেতন দিতে হয়। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন শুধু ব্যবসাই হয়ে ওঠে সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য। তখন সাংবাদিকতার নীতি, নৈতিকতা ভেসে যায়। এর মধ্যে ডিজিটাল বা ইন্টারনেটভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে ফায়দা লুটতে গিয়ে ঘটনা ঘটছে সেই সোনার ডিম পাড়া হাঁসের পেট কেটে ফেলার মতো। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটক বা ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব–এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোকে আয়ের কিছু বিকল্প উপায়ের সন্ধান দিয়েছে। আচমকা অনেক চকলেট পেয়ে গেলে একটি শিশুও যেমন খুশিতে বিভ্রান্ত হয়ে যায় কোনটা আগে খাবে ভেবে, তেমনি আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমেরও মাথা খারাপ অবস্থা। সাংবাদিকতার মূলনীতির বদলে তাই ভিউ বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়া হচ্ছে প্রবলভাবে। ভিউ যত বেশি, আয় তত বেশি। তার জন্য যদি নীতি, নৈতিকতা ভেসে যায় তো, যাক না!

দিনশেষে একটি দেশের জনতা যেমন, সে দেশের জাতীয় বৈশিষ্ট্যও তেমনি হয়! মনে রাখতে হবে, ভিউ হয় বলেই ভিউ বাণিজ্যে নামে সংবাদমাধ্যমগুলো। এখন ডিম আগে, নাকি মুরগি আগে–সেই বিতর্ক চালানোই যায়।

আর এই ভিউ বাণিজ্যের প্রতি অত্যধিক ঝুঁকে পড়ার ফলে সাংবাদিকতার মূলনীতি ধীরে ধীরে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। কনটেন্টের কোয়ালিটি বা নিউজভ্যালু নিয়ে এখন আর ভাবা হচ্ছে না অনেক সময়ই। যদি চটুল কোনো কনটেন্টেও ভিউ হয়, তাহলেও যেন সই। তাই অগভীর সাংবাদিকতা এ দেশে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে দৃঢ়ভাবে। তাৎক্ষণিকতার ফেরে পড়ে আমরা অগভীর বিষয়কে গভীরতার ওপরে স্থান দিয়েছি। এতে করে ভেসে থাকাটাই একমাত্র বাস্তবতা হয়ে গেছে এবং ডুবসাঁতার তার দাম হারিয়েছে। কারণ, আমরা সামগ্রিকভাবেই কোয়ালিটির তুলনায় কোয়ান্টিটিকে গুরুত্ব দিয়েছি বেশি। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই এ দেশের সংবাদমাধ্যম জগতের রুগ্ন আর্থিক অবকাঠামো এবং পেশাদারত্বের অভাব দায়ী। তবে সেই সঙ্গে জাতিগতভাবে হালকা বিষয়ের ওপর আমাদের অতিচর্চার অভ্যাসও প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। আর তাতে আমাদের সংবাদমাধ্যমের অবস্থা হয়ে গেছে সস্তার তিন অবস্থার মতো!

অন্যদিকে এ দেশে অনেক সংবাদমাধ্যমই যেনতেন প্রকারে চালু হয়। এর মূল কারণই হলো, এদের মালিক বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তারা যতটা না সাংবাদিকতা করতে সংবাদমাধ্যম চালু করে, তার চেয়ে বেশি নিজেদের নানামাত্রিক স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। এর মানে এই নয় যে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সংবাদমাধ্যম চালু করতে পারবে না। অবশ্যই পারবে। সারা বিশ্বেই তেমনটা হয়। তবে সেক্ষেত্রে মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রাখা হয় এবং সেটি রক্ষার বন্দোবস্তও থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। আর আমাদের দেশে এই কথিত ‘মহৎ উদ্দেশ্য’ কেবলই একটি মুখোশ মাত্র। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুখোশের আড়ালে অন্য খেলা চলে। ফলে ওইসব সংবাদমাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান খুলে একটা ‘আলোড়ন’ তো প্রত্যাশা করেই উদ্যোক্তারা। আর্থিক চাকচিক্য লাভের চাপও থাকে। তাই দায়িত্বপ্রাপ্ত কতিপয় সাংবাদিকেরা এই ডিজিটালের যুগে শুরু করে দেন ‘ভিউ বাণিজ্য’। এ করতে গিয়ে যা খুশি, তাই নিউজ কনটেন্ট হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। আবার এভাবে সংবাদ প্রকাশের আসল উদ্দেশ্যই যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন আর সংবাদ হয়ে ওঠার নীতি‑নৈতিকতারও কেউ ধার ধারে না। সংবাদ তখন প্রস্তুত হয়, মানুষের ‘খাওয়ার’ ধরনের ভিত্তিতে। একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, এভাবে এ দেশে কিছু সংবাদমাধ্যম লাভের মুখও কিন্তু দেখেছে ও দেখছে। সেক্ষেত্রে গণরুচির ওপরও প্রবল সন্দেহ জাগে এবং প্রশ্ন উঠে যায়। দিনশেষে একটি দেশের জনতা যেমন, সে দেশের জাতীয় বৈশিষ্ট্যও তেমনি হয়! মনে রাখতে হবে, ভিউ হয় বলেই ভিউ বাণিজ্যে নামে সংবাদমাধ্যমগুলো। এখন ডিম আগে, নাকি মুরগি আগে–সেই বিতর্ক চালানোই যায়।

বাংলাদেশের নিউজ ইন্ডাস্ট্রিও প্রচণ্ড অপেশাদার। সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা এ দেশে কচু পাতার উপরে টলটল করা পানির মতো। বেতনের কথা তুললে তো বৈষম্য আরও দৃশ্যমান হয়। অর্থনৈতিক সংকটের ফাঁক দিয়ে আরো প্রবল হয়ে ওঠে যোগ্যতা‑সংক্রান্ত সংকট। কারণ, আর্থিক নিরাপত্তা না থাকলে কয়জন আর শুধু প্যাশন থেকে সাংবাদিকতায় আসবেন বা থেকে যাবেন? এই ফাঁকে এ দেশে অনেকই সাংবাদিক বনে যায়, যাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঠিক সাংবাদিকতা করার মতো প্রশিক্ষণই নেই, থাকে না করার ইচ্ছাও। সাংবাদিকতা বস্তুটি আদতে কী, তা না জেনেই অনেকে সাংবাদিক হয়ে যান। তারা ফেসবুকের প্রোফাইলে নিজের নামের আগে ‘সাংবাদিক’ শব্দটি বসিয়ে বেশ আমোদও লাভ করেন। এবং এভাবে শুরু হয় ধান্দার খেলা। সেই ধান্দা আর্থিকভাবে হয়, রাজনৈতিকভাবে হয়। নির্লজ্জভাবে কারো পক্ষ নিতে বা দালাল হতে তখন আর এই কথিত ‘সাংবাদিক’দের বাধে না। আর মোবাইল হাতে নিয়ে উল্টোপাল্টা ভিডিও বানানো তো কোন ছার!

তাই বাংলাদেশের সাংবাদিকতা যে ‘কাম নাই করতে’ অবস্থায় পৌঁছাল, সেটি আসলে শুধুই মোবাইল জার্নালিস্টদের অবদান নয়। বরং নিউজ মিডিয়ার পুরো ইকোসিস্টেমই এর জন্য দায়ী। ভোক্তারাও দায়ী। সবাই মিলেই একে নেওয়া হয়েছে খাদের কিনারায়। এখন কেবল পেছন থেকে একটা জোরে ধাক্কা দেওয়া বাকি। সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা সেই খাদে পড়তে চান কিনা, সেটিই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়।

শেষটায় আবার শুরুতেই ফেরা যাক। তথাকথিত ‘ভাইরাল’ ভিডিওর ওই নারীকে ধন্যবাদ জানানোই উচিত। উনি হুট করেই এ দেশের সাংবাদিকতার বর্তমান করুণ অবস্থাকে তুলে ধরেছেন কেবল দুটি প্রশ্ন করে। এই দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই সাংবাদিকতার নীতি, নৈতিকতা কী, সাংবাদিকতার সীমা কতটুকু, সেটিও জানা হয়ে যায়। বোঝা হয়ে যায় যে, সাংবাদিক হতে হলে আগে মানুষ হওয়াটা জরুরি, মানবিক গুণাবলী অর্জন জরুরি। না হলে, সাধারণ মানুষ সাংবাদিককে কখনো ‘সাংঘাতিক’, আবার কখনো ‘সাম্বাদিক’, বা কখনো ‘সঙবাদিক’ বলেই ডাকবে। আস্থা, ভরসা বা সম্মান সেখানে থাকবে না বিন্দুমাত্র।

এখন সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের মাথায় ওই নারীর তোলা প্রশ্ন দুটি ঢুকলেই হয়!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত