Advertisement Banner

যেভাবে গুরু হয়ে ওঠেন রঘু রাই

যেভাবে গুরু হয়ে ওঠেন রঘু রাই
রঘু রাইয়ের ছবিটি তুলেছেন অলকানন্দ নাগ

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যারা ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করেন, তাদের অনেকেরই স্বপ্ন থাকে ‘ম্যাগনাম ফটোস’-এর সদস্য হওয়া। ম্যাগনামের সদস্যপদ এক ধরনের স্বীকৃতি, একটি মাইলফলক। তা না হওয়ার কারণও তো নেই। আধুনিক ফটোসাংবাদিকতার আঁতুরঘর এই সমিতি। হেনরি কার্তিয়ার-ব্রেসন, রবার্ট কাপা, আব্বাস আত্তার, ম্যারিলিন সিলভারস্টোন, ইউজিন স্মিথ, স্টিফ ম্যাককারি, জোসেফ কুদেলকা, এলিয়ট এরউইট, অ্যালেক্স ওয়েবের মতো আলোকচিত্রী ও ফটোসাংবাদিকরা এই সমিতির হাত ধরেই হয়েছেন বিশ্বখ্যাত। তাদের ভিড়ে প্রাচ্য থেকে যিনি সগৌরবে জায়গা করে নিলেন তিনি রঘু রাই।

‘ম্যাগনাম ফটোগ্রাফার’দের ভিড়েও রঘু রাই ভিন্ন, অতুলনীয়। অবশ্য ম্যাগনামের একজন আলোকচিত্রীর সঙ্গে আরেকজন আলোকচিত্রীর অমিলই মিল। কারো ছবির সঙ্গে কারো ছবির মিল নেই। সবার ছবি স্ব স্ব মহিমায় ভীষণ উজ্জ্বল। এর কারণ, প্রত্যেকে জোর দিয়েছিলেন নিজের দেশ, মানুষ ও সংস্কৃতির ওপর। মিল ও অমিল এই জায়গাটিতেই। তবে রঘু রাই যেভাবে ভারতীয়দের আবেগ-অনুভূতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে ছবির ভাষায় বুঝতে চেয়েছিলেন—তা বিস্ময়কর। ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির এতটাই বর্ণাঢ্য ও বিস্তৃত যে, পশ্চিমাদের বারবার এই অঞ্চলে ছুটে আসতে হয়েছে। রঘু রাই গোড়াতেই বুঝতে পেরেছিলেন, তার বাড়ির কাছেই আরশিনগর। সেই নগরে তিনি দিনের পর দিন ঘুরে বেড়িয়েছেন, ভারতকে অনুধাবন করেছেন, সবশেষে তার প্রাণটাকে ফিল্মে ধারণ করেছেন। তার ছবিগুলোতে চোখ রাখলেই আমরা সহজেই তা বুঝতে পারি।

মাদার তেরেসা ও ভোপাল ট্র্যাজেডির ছবি। ছবি: রঘু রাই
মাদার তেরেসা ও ভোপাল ট্র্যাজেডির ছবি। ছবি: রঘু রাই

আর এভাবে রঘু প্রাচ্যতত্ত্বের শৈল্পিক বিরোধিতাও করলেন। পাশ্চাত্য যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতকে দেখত বা দেখতে চাইত–সেভাবে ভারতকে দেখানোর প্রথাগত ধারা ও বয়ানকে অস্বীকার করলেন তিনি, বিশ্বকে দেখালেন অফুরন্ত প্রাণ ভারপুর ভারতকে। তিনি প্রায় এককভাবে ভারতের একটি ইতিবাচক বয়ান প্রতিষ্ঠা করলেন। তার ছবি সর্বমত ও পথের, সব ধর্মের, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির, আত্মমর্যাদার, স্বকীয়তার ও প্রতিশ্রুতিশীল ভারতের গল্প বলে।

যদিও ‘বঙ্গদর্শন ডটকম’-এ প্রকাশিত এক লেখায় মৌনী মণ্ডল বলেছিলেন, “রঘু রাইয়ের ছবিতে ধরা পড়ে অস্থির সময়ের প্রতিবিম্ব, দুঃখ, দুর্দশা, অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা। তারপরও সেসব ছবির এমন একটি ‘বোধ’ থাকে, যা অমূল্য, একবার দেখলে ভোলা দায়।” ঠিক, অস্থির সময় কম ক্যামেরাবন্দী করেননি তিনি। যেমন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, ইন্দিরা গান্ধীর শাসন ইত্যাদি। কিন্তু তার ৫০ বছরের ফটোগ্রাফিজীবনের তুলনায় অস্থির সময়কে ধারণ—নগণ্য। তিনি বরং সুখ্যাত চলমান জীবনের গান গাইতে। তার ছবিগুলো আসলে পথের পাঁচালী। সেই পাঁচালী কখনো সৌম্য (মাদার তেরেসা বা তাজমহলের ছবি), কখনোবা দ্রুতলয়ের (চার্চ গেট স্টেশনের ছবি)।

তার বিখ্যাত ছবিগুলোর বেশির ভাগই সাদাকালো, কিন্তু আজব বিষয় হলো, সেই ছবিগুলোতে এ অঞ্চলের বর্ণিল সংস্কৃতির নানা রং দেখা যায়! এখানেই রঘু রাইয়ের ম্যাজিক! ক্যামেরা তো আর ফটোকপির মেশিন না যে–যা দেখলাম কপি করে চললাম! ক্যামেরা তো জাদুর বাক্স! যে বাক্স থেকে বেরিয়ে আসবে অপ্রত্যাশিত সব দৃশ্য। রঘুর মতো ক্যামেরার জাদুকর খুব কমই ছিলেন। তাজমহল কতবার দেখলাম! কিন্তু যখন রঘুর তাজমহল দেখি, তখন ভাবি, তাহলে এতদিন কোন তাজমহল দেখলাম! মনে হয়, জাদু না জানলে চিরচেনা তাজমহলকে অচেনা কিন্তু অনবদ্য করে তোলা কি যায়? রঘু রাই ঘোষণা না দিয়ে আমাদের গুরু হয়ে ওঠেন। তিনি শেখান–কীভাবে দেখতে হয়, কীভাবে চোখ দিয়ে দৃশ্য উপভোগ করতে হয়।

রঘুর ক্যামেরায় চার্চ গেট স্টেশন।
রঘুর ক্যামেরায় চার্চ গেট স্টেশন।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে কীভাবে ছবি তোলার মুনশিয়ানা ধরে রাখতে পারলেন তিনি? তিনি বলেছেন, “আমরা যখনই কিছু করতে যাই–মন বলে, ‘এটা ঠিক, ওটা ভুল।’ মনটাই সৃজনশীলতায় সবচেয়ে বড় বাধা। মনকে কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা যায় না। সামনে যে পরিস্থিতি আছে, তাকে সরাসরি উপলব্ধি করতে চোখকে হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।”

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কিন্তু অনেকটা এমন কথাই বলেছিলেন, “ঠিক সুরে সুর মেলা চাই, না হলে যন্ত্র বল্লে ‘গা’, কণ্ঠ বলে উঠলো ‘ধা’।” (বাগেশ্বরী শিল্প-প্রবন্ধাবলি) মনের সঙ্গে যন্ত্রের এই সংযোগ রঘু করে নিয়েছিলেন। তাই তার ছবি বেসুরা পাঁচালী ধরে না।

সম্পর্কিত