প্রতিনাভ অনিল

দূর থেকে দেখলে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে একটি পুরনো নীতিগল্পের নাটকের মতো মনে হয়। ‘বিচক্ষণ মধ্যপন্থা’র বিপক্ষে ‘উন্মাদ ইসলামপন্থা’কে দাঁড় করানো হয়েছে। মরক্কো থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত মুসলিম বিশ্বে এই চিরচেনা দ্বান্দ্বিক চিত্রটি বারবার ফিরে আসে। আগামীকাল প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার কথা রয়েছে, যাদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের দুজনই আগে কখনো মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বাদ পাননি। প্রায় ১৫০টি দল নিবন্ধিত হয়েছে, যার অনুমিত ফলাফল হিসেবে ব্যালট পেপারগুলো এতটাই লম্বা যে, তা অনায়াসেই ‘পিকনিকের মাদুর’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়।
তবে খোদ বাংলাদেশে বিরাজমান অবস্থাটা উদ্দীপনার নয়, বরং একঘেয়েমির। কারণ ভোটাররা এখানে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে সাজানো এক ‘নিরুপায়’ পছন্দের সম্মুখীন। এটি আদতে এক ‘প্রহসনের গণতন্ত্র’। বিশাল, কোলাহলপূর্ণ, কিছুটা জাঁকজমকপূর্ণ, কিন্তু দিনশেষে একেবারেই অর্থহীন। সত্য বলতে, এই নির্বাচনে আদতে পাওয়ার বা হারানোর কিছুই নেই।
নির্বাচনের সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে এগিয়ে আছে মধ্য-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যাদের জনসমর্থন বর্তমানে ৫০ শতাংশের বেশি। দলটির নেতৃত্বে এখন তারেক রহমান। সুদর্শন এই উত্তরাধিকারী ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে নিজের স্বদেশের কাছে এখন একপ্রকার আগন্তুক। দেশি-বিদেশি অনুসারীরা তাকে একজন সংশোধিত উদারপন্থী হিসেবে তুলে ধরেন: যিনি ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় পরিপক্ক এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে আরও উজ্জ্বল। তবে তার ভোটাররা, যারা ‘অন্য কোনো ভালো বিকল্প নেই’ বলেই তাকে সমর্থন দিচ্ছে, তাদের স্মৃতিতে অনেক কিছুই জমা আছে।
’৯০ ও ২০০০-এর দশকে যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, তখন মূল ক্ষমতা ছিল তার মা খালেদা জিয়ার হাতে। তিনি ১৯৮১ সালের এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে নিহত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যেমন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ‘গ্লাস সিলিং’ ভেঙেছিলেন, তেমনি পরপর চার বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তালিকায় দেশকে বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র বানিয়ে রেকর্ডও গড়েছিলেন। তারেক রহমান নিজেও পরবর্তীকালে ফাঁস হওয়া কূটনৈতিক তারবার্তায় ‘লুণ্ঠনতন্ত্রের প্রতীক’ হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্মৃতিচারণ করাটা এক বিলাসিতা মাত্র।
মূল বিকল্প হিসেবে আছে জামায়াতে ইসলামী। একসময়ের নিষিদ্ধ এই ইসলামপন্থী দলটি শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে এখন বেশ চনমনে। টুপি আর দাড়িতে সুশোভিত শফিকুর রহমান একজন গম্ভীর ও কঠোর স্বভাবের নেতা। সুশৃঙ্খল তৃণমূল কাঠামো এবং ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরাচারী শাসকদের ওপর বীতশ্রদ্ধ ভোটারদের ওপর ভর করে দলটি বর্তমানে ৩০ শতাংশ জনসমর্থন পাচ্ছে। শেখ হাসিনা যিনি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘকালীন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেত্রী ছিলেন; তার ১৫ বছরের শাসনামলে নির্বাচনী প্রহসন, আকাশচুম্বী দুর্নীতি আর পদ্ধতিগত নিপীড়নের পর মানুষের মধ্যে ধর্মপরায়ণতার প্রতি স্বাভাবিক এক আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। জামায়াত দাবি করছে তারা সংস্কারপন্থী। তারা কোনো ধর্মতন্ত্র বা তালেবানি নাটকীয়তা চায় না। কিন্তু শহরের উদারপন্থীরা সংগত কারণেই এতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। এটি নিশ্চয়ই কাকতালীয় নয় যে, মোল্লাদের এই দলটি একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি, উল্টো নারীর কর্মঘণ্টা সীমিত করার ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। এছাড়া আছে তাদের অপেশাদারিত্ব। একটি দল যারা ছাত্র সংগঠনের চেয়ে বড় কিছু কখনোই চালায়নি, তাদের কাছ থেকে এটি বিস্ময়কর নয়। তা সত্ত্বেও, গ্রামীণ বাংলাদেশে যেখানে রাষ্ট্র কেবল একটি পাদটীকায় পরিণত হয়েছে, সেখানে জামায়াতের আবেদন আদর্শিক হওয়ার চেয়ে বেশি ব্যবহারিক। তারা স্থানীয় কৃষক এবং মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী–উভয় শ্রেণির কাছেই ইসলামপন্থাভিত্তিক জনকল্যাণমূলক রাজনীতির এক উষ্ণ আভা নিয়ে হাজির হয়েছে।
প্রান্তিক পর্যায়ে অস্বস্তির সাথে টিকে আছে জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি), যা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাসিনাকে উৎখাত করা ‘মনসুন রেভ্যুলিউশন’ বা জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক উত্তরসূরি। এনসিপি নিজেকে বিপ্লবী চেতনার রক্ষক হিসেবে দাবি করে, যারা কট্টর দুর্নীতিবিরোধী এবং বাকস্বাধীনতার সোচ্চার সমর্থক। দলটির প্রাণবন্ত নেতা নাহিদ ইসলামের বয়স মাত্র ২৭, যা কারও কাছে সতেজ নতুনত্ব, আবার কারও কাছে কিছুটা আতঙ্কজনকও মনে হতে পারে। তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ফরাসিদের মতো তারুণ্যপ্রীতির তেমন কোনো বিশেষ ঝোঁক নেই। দলটির জনপ্রিয়তাও রোলার-কোস্টারের মতো উঠানামা করেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছাত্র আন্দোলনের তুঙ্গে থাকাকালীন তাদের পূর্বসূরি সংগঠনের প্রতি অভাবনীয় ৩৫ শতাংশ সমর্থন দেখা গিয়েছিল, যা এক বছর পর মাত্র ২ শতাংশে এসে ঠেকেছে।
অভ্যুত্থান কখনোই সরাসরি ভোটে রূপান্তরিত হয় না। চরম অর্থসংকট এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার মাঝে জামায়াতের সাথে নির্বাচনী জোট করে এনসিপি নিজেদের বিপদ আরও বাড়িয়েছে। দলটি ইতিমধ্যে তাদের অনেক সমর্থককে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে যাদের কাছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিরোধিতা আজও ক্ষমার অযোগ্য। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা প্রতিবাদে দল ছেড়েছেন। তাদের দাবি, একটি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এখন এমন এক ইসলামপন্থী দলের সাথে নিজেকে যুক্ত করেছে, যাকে তারা নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না, আবার পুরোপুরি বিশ্বাসও করে না। এই জোট এনসিপি-কে মাত্র ৩০টি আসন দিয়েছে, যা রাজপথের বীরত্ব থেকে উঠে আসা একটি দলের জন্য এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিফলন।
এই ভঙ্গুর অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতির সভাপতিত্ব করছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস। তিনি একইসাথে নোবেলজয়ী ও নব্য-উদারবাদী। শেখ হাসিনার সহিংস পতনের পর উত্তেজিত ছাত্র এবং সতর্ক জেনারেলদের সমঝোতায় তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই অশীতিপর ক্ষুদ্রঋণদাতা এই রাজনৈতিক হট্টগোলের মাঝে এমন এক টেকনোক্র্যাট চরিত্র, যার কোনো জনপ্রিয়তা নেই। অথচ ১৮ মাস ধরে ক্ষমতায় টিকে আছেন এবং এমন এক রাজনৈতিক শ্রেণিকে সংস্কারের বাণী শুনিয়েছেন যারা ‘ছলচাতুরি’ ও ‘ফাঁকিবাজি’কে একটি নাগরিক শিল্পে উন্নীত করেছে। তার প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো যেমন, মেয়াদের সীমাবদ্ধতা, উচ্চকক্ষ গঠন এবং নতুন দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো–যথেষ্ট যৌক্তিক এবং আসন্ন গণভোটে সম্ভবত অনুমোদিতও হবে। তবে যাপিত জীবনের বাস্তবতায় সেগুলো আদৌ টিকে থাকবে কি না, তা ভিন্ন প্রশ্ন। বাংলাদেশে সুন্দর সংবিধানের অভাব কখনোই ছিল না; অভাব ছিল কেবল তা মেনে চলার।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত শোচনীয়। ইউনুস সরকারের অধীনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। উপর্যুপরি বন্যা ধান উৎপাদনে ধস নামিয়েছে। অন্যদিকে আদানি গ্রুপ, যারা বাংলাদেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় দশভাগের একভাগ সরবরাহ করে, তাদের বকেয়া বিল পরিশোধ না হওয়ায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও তীব্রতর হয়েছে। সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলা হয়েছে। এই সম্প্রদায়ের বড় অংশকেই হাসিনার বিতর্কিত আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত বলে মনে করা হয়। এই ঘটনাগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের ‘শান্তিপূর্ণ পরিচালনার’ দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ইউনুসের পছন্দের কৌশলটি হলো নিজের নাগরিকদের ওপর কর আরোপের কঠিন পথে না গিয়ে বিদেশের কাছে সাহায্যের ঝুলি প্রসারিত করা। ঢাকা ইতিমধ্যেই ১.২ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তা প্যাকেজ এবং ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ বেইলআউটের ওপর ভর করে টিকে আছে। এর পাশাপাশি হাসিনা সরকারের লুটেরা শাসনামলে বিদেশে পাচার হওয়া আনুমানিক ১৭ বিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধারে ওয়াশিংটন সহায়তা করছে। নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের আরও অর্থের প্রয়োজন হবে। যদি পশ্চিমা ঋণদাতা বা ভারত ধৈর্য হারায়, তবে চীন ৫ বিলিয়ন ডলারের টোপ নিয়ে তৈরিই আছে।

ইউনুস নিজেও এক অদ্ভুতভাবে ‘বিভেদ সৃষ্টিকারী’ ব্যক্তিত্ব। তাকে নিয়ে আলোচনা উঠলে মানুষ দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। তিনি পশ্চিমা কূটনীতিকদের প্রিয়ভাজন এবং দীর্ঘকাল ধরে হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার ছিলেন। হাসিনা বিশ্বাস করতেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের গণহত্যা বন্ধ করার কৃতিত্ব হিসেবে নোবেল পুরস্কারটি আসলে তারই প্রাপ্য ছিল। বাংলাদেশে ইউনুসকে স্বাগত জানানো হয়েছিল ঠিক এই কারণেই যে তিনি বিবাদমান কোনো রাজনৈতিক পরিবারের অংশ ছিলেন না। তার মন্ত্রিসভার দিকে তাকালে তার চিন্তাভাবনা নিয়ে খুব একটা সন্দেহ থাকে না। এটি মূলত সামরিক কর্মকর্তা এবং বেসরকারীকরণপন্থী টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত। যদিও তাতে ভারসাম্য রক্ষার্থে কিছু মানবাধিকার আইনজীবী এবং পরিবেশবাদীকেও রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ দল আওয়ামী লীগকে এখন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাসিনার পতন যখন ঘটল, তখন যারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিলেন না কেবল তাদের কাছেই তা আকস্মিক মনে হয়েছে। ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল বহু বছর ধরেই। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পুনরুজ্জীবিত ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ কেবল তাতে স্ফুলিঙ্গ যোগ করেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য তৈরি করা সিভিল সার্ভিস সংরক্ষণ ব্যবস্থা দীর্ঘকাল আগেই বংশগত অধিকারের ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। দশকের পর দশক ধরে এটি সরকারি চাকরির সিংহভাগ গ্রাস করেছে (এক পর্যায়ে মাত্র ২০ শতাংশ চাকরি ‘মেধাভিত্তিক’ ছিল), যখন শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা ছিল আকাশচুম্বী। এই সুযোগ-সুবিধা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের পর্যন্ত বিস্তৃত করার হাসিনার হঠকারী সিদ্ধান্তটি ছিল সহ্যের সীমার বাইরে। প্রতিবাদ দমাতে বরাবরের মতোই পুলিশি লাঠি আর আওয়ামী লীগের পেশিশক্তি ব্যবহার করা হয়, যা বারবার ফিরে আসছিল।
২০১৮ সালে হাসিনা কৌশলগতভাবে পিছু হটেছিলেন এবং কোটা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করেছিলেন এই আশায় যে আন্দোলনকারীরা ঘরে ফিরে যাবে। কিছু সময়ের জন্য তারা তা করেছিলও। এরপর, প্রাতিষ্ঠানিক আত্মহননের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট সুবিধাভোগী আমলাদের পক্ষে রায় দিয়ে কোটা পুনরায় বহাল করে। হাসিনা তার চিরচেনা ঢঙে প্রতিক্রিয়া জানান। বিক্ষোভকারীদের তিনি ‘রাজাকার’ হিসেবে অভিহিত করেন, যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের গণহত্যাকারীদের সহযোগীদের জন্য সংরক্ষিত একটি ঘৃণ্য নাম। এই গালিটি পেট্রোল পাম্পে জ্বলন্ত দেশলাই ফেলার মতো কাজ করে। বিক্ষোভ ফুলে-ফেঁপে ওঠে; কারফিউ জারি করা হয়; ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। আওয়ামী ক্যাডার এবং নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে।
ততক্ষণে নিপীড়ন আর কেবল কৌশল নয়, বরং অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। হাসিনার সরকার ‘আয়নাঘর’-এর মতো কুখ্যাত গোপন কারাগারের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো, পোকামাকড় দিয়ে কামড়ানো হতো এবং প্রতিদিন রাতে তাদের ফাঁসির জন্য প্রস্তুত করে ভোরের আলো ফোটার আগে আবার মাঠে ফেলে রাখা হতো। শেষ দফার দমন-পীড়নে অন্তত ১,৪০০ মানুষ নিহত হন; আরও ডজন ডজন মানুষ রাষ্ট্রের অন্ধকূপে হারিয়ে যান। যখন সুপ্রিম কোর্ট তড়িঘড়ি করে আবারও কোটা সংশোধন করে মেধাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ফিরিয়ে আনল, তখন সেই ছাড় দেওয়ার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। পুরো বাংলাদেশ তখন জ্বলছে। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও হাসিনা জনতাকে লক্ষ্য করে পুনরায় গুলি চালানোর জন্য সেনাবাহিনীকে চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার জেনারেলরা তাতে অস্বীকৃতি জানান। বারুদের স্তূপ শেষ পর্যন্ত জ্বলে ওঠে। আর সেই সাথে ছাই হয়ে যায় একটি দীর্ঘস্থায়ী শাসনব্যবস্থা।
গত বছর, এক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায়ে হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ঢাকা তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও দিল্লি অত্যন্ত সুকৌশলে তা প্রত্যাখ্যান করে। দিনশেষে, তিনি তো ভারতেরই আশীর্বাদপুষ্ট। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণেই বাংলাদেশকে সর্বদা তার হিমালয়সম-প্রতিবেশী ভারতের কথা মাথায় রাখতে হয়। তবে হাসিনার আমলে সেই ‘মাথায় রাখা’ নিরঙ্কুশ আনুগত্যে রূপ নিয়েছিল। তার সরকার ভারতীয় সংস্থাগুলোর সাথে অত্যন্ত একপাক্ষিক জ্বালানি চুক্তি সই করেছিল, যার মধ্যে আদানি পাওয়ারের চুক্তিটি অন্যতম, যা বাংলাদেশকে এমন বিদ্যুতের জন্য অর্থ দিতে বাধ্য করে যা হয়তো তারা ব্যবহারই করবে না। এছাড়া সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর ম্যানগ্রোভ বনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকেও তিনি হাসিমুখে সমর্থন দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের জুনে তিনি ভারতকে বাংলাদেশের রেলপথে শুল্কমুক্ত ট্রানজিট সুবিধা প্রদান করেন, যা ছিল ‘ভারত বয়কট’ আন্দোলন উস্কে দেওয়ার সর্বশেষ কারণ এবং অনেকের কাছেই এটি ছিল সার্বভৌমত্বকে নীরবে বিলিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ।
হাসিনা সরকারের দুর্নীতির দুর্গন্ধ লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড পর্যন্ত পৌঁছেছিল। গত বছর বাংলাদেশের একটি আদালত তার ভাগ্নি এবং ব্রিটিশ লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে একটি ভূমি বরাদ্দ প্রকল্পে দুর্নীতির দায়ে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। তার অনুপস্থিতিতে দেওয়া এই রায়টি তার স্বাধীনতায় কোনো ব্যাঘাত ঘটাবে না বলেই মনে করা হয় এবং লেবার পার্টি একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। চাপের মুখে সিদ্দিক তার মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করলেও তিনি ছিলেন অনড়। তিনি ‘বিশিষ্ট আইনজীবীদের’ যাদের মধ্যে আইনি বিশেষজ্ঞ চেরি ব্লেয়ারও রয়েছেন; তাদের ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো তুলে ধরার জন্য। অন্যদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সম্ভবত কূটনৈতিক জটিলতা আঁচ করতে পেরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন নেতার লন্ডন সফরের সময় তার সাথে দেখা করতে রাজি হননি, যদিও সেই সফরের উদ্দেশ্য ছিল হাসিনার দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনামলে পাচার হওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধার করা।
একজন কলঙ্কিত উত্তরাধিকারী এবং একজন অপেশাদার ইসলামপন্থী; একটি তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন যারা দেরিতে হলেও আপসের মাশুল বুঝতে পারছে এবং একটি নিষিদ্ধ বর্তমান দল- এসবের মাঝে বাংলাদেশের ভোটারদের সামনে আসলে কোনো ‘পছন্দ’ নেই, বরং এটি কেবল একটি বাছাই প্রক্রিয়া মাত্র। লুটপাটের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে যে মূল লড়াই, তা আবারও স্থগিত হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে এনজিও মহলে বাংলাদেশকে একটি ‘নব্য-উদারবাদী অলৌকিকতা’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। প্রচারণার বিষয়বস্তু ছিল- ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, সচল পোশাক শিল্প, আর ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন।
তবে বর্তমানের হিসাবপত্র ভিন্ন কথা বলছে। জিডিপির তুলনায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয় মাত্র ৭ শতাংশের আশেপাশে (যুক্তরাজ্যে এটি ৩৯ শতাংশ), যা এশীয় মানদণ্ডেও অত্যন্ত নগণ্য। এর ফলে সরকারকে পরোক্ষ কর এবং বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি দলিলে প্রমাণিত হয়েছে যে, হাসিনার অর্থনীতিবিদরা প্রবৃদ্ধির হারকে একটু বেশিই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছিলেন এবং ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অবৈধ পথে দেশ থেকে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে, যা প্রতি বছর জিডিপির প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশের সমান।
এটি ছিল এক চূড়ান্ত পর্যায়ের 'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম' বা সুবিধাভোগী পুঁজিবাদ। ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তিগত ভাণ্ডার হিসেবে; বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো মন্ত্রী ও তাদের ঘনিষ্ঠদের টোল আদায়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। রপ্তানির মেরুদণ্ড পোশাক খাত টিকে ছিল অত্যন্ত কম মজুরির ওপর। এই মজুরি এতই কম যে চা বাগানের শ্রমিকরা দিনে মাত্র দুই ডলার আয় করেও নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করতে পারত। ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে।
২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে ১,০০০-এর বেশি শ্রমিকের মৃত্যুর পর কোনো সংস্কার হয়নি, বরং মিলেছে রাবার বুলেট, গ্রেপ্তার এবং শ্রমিক নেতাদের গুম হওয়া। বাংলাদেশ এখন নিয়মিতভাবে শ্রমিকদের জন্য বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্ট দেশের তালিকায় স্থান পায়। এই উদাসীনতা বিদেশের মাটিতেও দৃশ্যমান।
অভিবাসী শ্রমিক বাংলাদেশের অন্যতম লাভজনক রপ্তানি পণ্য; তাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে বন্দনা করা হলেও সৌদি আরবে দাসত্বের সমতুল্য অবস্থায় তাদের কার্যত নিঃসঙ্গ ফেলে রাখা হয়েছে। যখন উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে নির্যাতিত গৃহকর্মীদের লাশ ফিরে আসে, ঢাকার নীতিনির্ধারকরা তখন স্রেফ কাঁধ ঝাঁকান; তাদের কাছে এই মৃত্যুগুলো ব্যবসা পরিচালনার একটি ‘গ্রহণযোগ্য বাড়তি খরচ’ মাত্র। কেবল ২০২২ সালেই প্রায় ৪,০০০ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক কফিনে বন্দি হয়ে দেশে ফিরেছেন।
এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবর্তন আনবে না। বিএনপি হয়তো জিতবে, জামায়াতের উত্থান ঘটবে, আর কিছু ছাত্র হয়তো সংসদে জায়গা করে নেবে। ক্ষমতার বদল হবে, হয়তো অত্যন্ত মার্জিতভাবেই। কিন্তু সেই পুরনো ব্যবস্থা- সস্তা শ্রম, ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান, অর্থ পাচার এবং ভিন্নমতের দমন-সবই টিকে থাকবে। তবে এর কোনোটিই বাংলাদেশি ভোটারদের সাহসকে ছোট করে না, যারা আগে গুলির সামনে বুক পেতেছেন এবং আবারও হয়তো তা করতে পারেন। নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আর ঠিক সেই কারণেই বাংলাদেশে তা এত নিপুণভাবে সাজানো হয়। প্রচারণার ব্যানার নামিয়ে ফেলা হবে; নতুন করে শুরুর ভাষণ দেওয়া হবে। তবে তোমাজি দি লাম্পেদুসার সেই বিখ্যাত উক্তির মতোই- “সবকিছু বদলে যেতে হবে যাতে সবকিছু আগের মতোই থেকে যেতে পারে।”
লেখক: ইতিহাস বিশ্লেষক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত কলেজ সেন্ট এডমান্ড হলের শিক্ষক
(লেখাটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনহারভ থেকে নেওয়া।)

দূর থেকে দেখলে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে একটি পুরনো নীতিগল্পের নাটকের মতো মনে হয়। ‘বিচক্ষণ মধ্যপন্থা’র বিপক্ষে ‘উন্মাদ ইসলামপন্থা’কে দাঁড় করানো হয়েছে। মরক্কো থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত মুসলিম বিশ্বে এই চিরচেনা দ্বান্দ্বিক চিত্রটি বারবার ফিরে আসে। আগামীকাল প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার কথা রয়েছে, যাদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের দুজনই আগে কখনো মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বাদ পাননি। প্রায় ১৫০টি দল নিবন্ধিত হয়েছে, যার অনুমিত ফলাফল হিসেবে ব্যালট পেপারগুলো এতটাই লম্বা যে, তা অনায়াসেই ‘পিকনিকের মাদুর’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়।
তবে খোদ বাংলাদেশে বিরাজমান অবস্থাটা উদ্দীপনার নয়, বরং একঘেয়েমির। কারণ ভোটাররা এখানে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে সাজানো এক ‘নিরুপায়’ পছন্দের সম্মুখীন। এটি আদতে এক ‘প্রহসনের গণতন্ত্র’। বিশাল, কোলাহলপূর্ণ, কিছুটা জাঁকজমকপূর্ণ, কিন্তু দিনশেষে একেবারেই অর্থহীন। সত্য বলতে, এই নির্বাচনে আদতে পাওয়ার বা হারানোর কিছুই নেই।
নির্বাচনের সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে এগিয়ে আছে মধ্য-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যাদের জনসমর্থন বর্তমানে ৫০ শতাংশের বেশি। দলটির নেতৃত্বে এখন তারেক রহমান। সুদর্শন এই উত্তরাধিকারী ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে নিজের স্বদেশের কাছে এখন একপ্রকার আগন্তুক। দেশি-বিদেশি অনুসারীরা তাকে একজন সংশোধিত উদারপন্থী হিসেবে তুলে ধরেন: যিনি ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় পরিপক্ক এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে আরও উজ্জ্বল। তবে তার ভোটাররা, যারা ‘অন্য কোনো ভালো বিকল্প নেই’ বলেই তাকে সমর্থন দিচ্ছে, তাদের স্মৃতিতে অনেক কিছুই জমা আছে।
’৯০ ও ২০০০-এর দশকে যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, তখন মূল ক্ষমতা ছিল তার মা খালেদা জিয়ার হাতে। তিনি ১৯৮১ সালের এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে নিহত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যেমন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ‘গ্লাস সিলিং’ ভেঙেছিলেন, তেমনি পরপর চার বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তালিকায় দেশকে বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র বানিয়ে রেকর্ডও গড়েছিলেন। তারেক রহমান নিজেও পরবর্তীকালে ফাঁস হওয়া কূটনৈতিক তারবার্তায় ‘লুণ্ঠনতন্ত্রের প্রতীক’ হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্মৃতিচারণ করাটা এক বিলাসিতা মাত্র।
মূল বিকল্প হিসেবে আছে জামায়াতে ইসলামী। একসময়ের নিষিদ্ধ এই ইসলামপন্থী দলটি শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে এখন বেশ চনমনে। টুপি আর দাড়িতে সুশোভিত শফিকুর রহমান একজন গম্ভীর ও কঠোর স্বভাবের নেতা। সুশৃঙ্খল তৃণমূল কাঠামো এবং ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরাচারী শাসকদের ওপর বীতশ্রদ্ধ ভোটারদের ওপর ভর করে দলটি বর্তমানে ৩০ শতাংশ জনসমর্থন পাচ্ছে। শেখ হাসিনা যিনি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘকালীন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেত্রী ছিলেন; তার ১৫ বছরের শাসনামলে নির্বাচনী প্রহসন, আকাশচুম্বী দুর্নীতি আর পদ্ধতিগত নিপীড়নের পর মানুষের মধ্যে ধর্মপরায়ণতার প্রতি স্বাভাবিক এক আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। জামায়াত দাবি করছে তারা সংস্কারপন্থী। তারা কোনো ধর্মতন্ত্র বা তালেবানি নাটকীয়তা চায় না। কিন্তু শহরের উদারপন্থীরা সংগত কারণেই এতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। এটি নিশ্চয়ই কাকতালীয় নয় যে, মোল্লাদের এই দলটি একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি, উল্টো নারীর কর্মঘণ্টা সীমিত করার ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। এছাড়া আছে তাদের অপেশাদারিত্ব। একটি দল যারা ছাত্র সংগঠনের চেয়ে বড় কিছু কখনোই চালায়নি, তাদের কাছ থেকে এটি বিস্ময়কর নয়। তা সত্ত্বেও, গ্রামীণ বাংলাদেশে যেখানে রাষ্ট্র কেবল একটি পাদটীকায় পরিণত হয়েছে, সেখানে জামায়াতের আবেদন আদর্শিক হওয়ার চেয়ে বেশি ব্যবহারিক। তারা স্থানীয় কৃষক এবং মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী–উভয় শ্রেণির কাছেই ইসলামপন্থাভিত্তিক জনকল্যাণমূলক রাজনীতির এক উষ্ণ আভা নিয়ে হাজির হয়েছে।
প্রান্তিক পর্যায়ে অস্বস্তির সাথে টিকে আছে জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি), যা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাসিনাকে উৎখাত করা ‘মনসুন রেভ্যুলিউশন’ বা জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক উত্তরসূরি। এনসিপি নিজেকে বিপ্লবী চেতনার রক্ষক হিসেবে দাবি করে, যারা কট্টর দুর্নীতিবিরোধী এবং বাকস্বাধীনতার সোচ্চার সমর্থক। দলটির প্রাণবন্ত নেতা নাহিদ ইসলামের বয়স মাত্র ২৭, যা কারও কাছে সতেজ নতুনত্ব, আবার কারও কাছে কিছুটা আতঙ্কজনকও মনে হতে পারে। তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ফরাসিদের মতো তারুণ্যপ্রীতির তেমন কোনো বিশেষ ঝোঁক নেই। দলটির জনপ্রিয়তাও রোলার-কোস্টারের মতো উঠানামা করেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছাত্র আন্দোলনের তুঙ্গে থাকাকালীন তাদের পূর্বসূরি সংগঠনের প্রতি অভাবনীয় ৩৫ শতাংশ সমর্থন দেখা গিয়েছিল, যা এক বছর পর মাত্র ২ শতাংশে এসে ঠেকেছে।
অভ্যুত্থান কখনোই সরাসরি ভোটে রূপান্তরিত হয় না। চরম অর্থসংকট এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার মাঝে জামায়াতের সাথে নির্বাচনী জোট করে এনসিপি নিজেদের বিপদ আরও বাড়িয়েছে। দলটি ইতিমধ্যে তাদের অনেক সমর্থককে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে যাদের কাছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিরোধিতা আজও ক্ষমার অযোগ্য। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা প্রতিবাদে দল ছেড়েছেন। তাদের দাবি, একটি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এখন এমন এক ইসলামপন্থী দলের সাথে নিজেকে যুক্ত করেছে, যাকে তারা নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না, আবার পুরোপুরি বিশ্বাসও করে না। এই জোট এনসিপি-কে মাত্র ৩০টি আসন দিয়েছে, যা রাজপথের বীরত্ব থেকে উঠে আসা একটি দলের জন্য এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিফলন।
এই ভঙ্গুর অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতির সভাপতিত্ব করছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস। তিনি একইসাথে নোবেলজয়ী ও নব্য-উদারবাদী। শেখ হাসিনার সহিংস পতনের পর উত্তেজিত ছাত্র এবং সতর্ক জেনারেলদের সমঝোতায় তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই অশীতিপর ক্ষুদ্রঋণদাতা এই রাজনৈতিক হট্টগোলের মাঝে এমন এক টেকনোক্র্যাট চরিত্র, যার কোনো জনপ্রিয়তা নেই। অথচ ১৮ মাস ধরে ক্ষমতায় টিকে আছেন এবং এমন এক রাজনৈতিক শ্রেণিকে সংস্কারের বাণী শুনিয়েছেন যারা ‘ছলচাতুরি’ ও ‘ফাঁকিবাজি’কে একটি নাগরিক শিল্পে উন্নীত করেছে। তার প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো যেমন, মেয়াদের সীমাবদ্ধতা, উচ্চকক্ষ গঠন এবং নতুন দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো–যথেষ্ট যৌক্তিক এবং আসন্ন গণভোটে সম্ভবত অনুমোদিতও হবে। তবে যাপিত জীবনের বাস্তবতায় সেগুলো আদৌ টিকে থাকবে কি না, তা ভিন্ন প্রশ্ন। বাংলাদেশে সুন্দর সংবিধানের অভাব কখনোই ছিল না; অভাব ছিল কেবল তা মেনে চলার।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত শোচনীয়। ইউনুস সরকারের অধীনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। উপর্যুপরি বন্যা ধান উৎপাদনে ধস নামিয়েছে। অন্যদিকে আদানি গ্রুপ, যারা বাংলাদেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় দশভাগের একভাগ সরবরাহ করে, তাদের বকেয়া বিল পরিশোধ না হওয়ায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও তীব্রতর হয়েছে। সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলা হয়েছে। এই সম্প্রদায়ের বড় অংশকেই হাসিনার বিতর্কিত আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত বলে মনে করা হয়। এই ঘটনাগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের ‘শান্তিপূর্ণ পরিচালনার’ দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ইউনুসের পছন্দের কৌশলটি হলো নিজের নাগরিকদের ওপর কর আরোপের কঠিন পথে না গিয়ে বিদেশের কাছে সাহায্যের ঝুলি প্রসারিত করা। ঢাকা ইতিমধ্যেই ১.২ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তা প্যাকেজ এবং ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ বেইলআউটের ওপর ভর করে টিকে আছে। এর পাশাপাশি হাসিনা সরকারের লুটেরা শাসনামলে বিদেশে পাচার হওয়া আনুমানিক ১৭ বিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধারে ওয়াশিংটন সহায়তা করছে। নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের আরও অর্থের প্রয়োজন হবে। যদি পশ্চিমা ঋণদাতা বা ভারত ধৈর্য হারায়, তবে চীন ৫ বিলিয়ন ডলারের টোপ নিয়ে তৈরিই আছে।

ইউনুস নিজেও এক অদ্ভুতভাবে ‘বিভেদ সৃষ্টিকারী’ ব্যক্তিত্ব। তাকে নিয়ে আলোচনা উঠলে মানুষ দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। তিনি পশ্চিমা কূটনীতিকদের প্রিয়ভাজন এবং দীর্ঘকাল ধরে হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার ছিলেন। হাসিনা বিশ্বাস করতেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের গণহত্যা বন্ধ করার কৃতিত্ব হিসেবে নোবেল পুরস্কারটি আসলে তারই প্রাপ্য ছিল। বাংলাদেশে ইউনুসকে স্বাগত জানানো হয়েছিল ঠিক এই কারণেই যে তিনি বিবাদমান কোনো রাজনৈতিক পরিবারের অংশ ছিলেন না। তার মন্ত্রিসভার দিকে তাকালে তার চিন্তাভাবনা নিয়ে খুব একটা সন্দেহ থাকে না। এটি মূলত সামরিক কর্মকর্তা এবং বেসরকারীকরণপন্থী টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত। যদিও তাতে ভারসাম্য রক্ষার্থে কিছু মানবাধিকার আইনজীবী এবং পরিবেশবাদীকেও রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ দল আওয়ামী লীগকে এখন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাসিনার পতন যখন ঘটল, তখন যারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিলেন না কেবল তাদের কাছেই তা আকস্মিক মনে হয়েছে। ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল বহু বছর ধরেই। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পুনরুজ্জীবিত ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ কেবল তাতে স্ফুলিঙ্গ যোগ করেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য তৈরি করা সিভিল সার্ভিস সংরক্ষণ ব্যবস্থা দীর্ঘকাল আগেই বংশগত অধিকারের ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। দশকের পর দশক ধরে এটি সরকারি চাকরির সিংহভাগ গ্রাস করেছে (এক পর্যায়ে মাত্র ২০ শতাংশ চাকরি ‘মেধাভিত্তিক’ ছিল), যখন শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা ছিল আকাশচুম্বী। এই সুযোগ-সুবিধা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের পর্যন্ত বিস্তৃত করার হাসিনার হঠকারী সিদ্ধান্তটি ছিল সহ্যের সীমার বাইরে। প্রতিবাদ দমাতে বরাবরের মতোই পুলিশি লাঠি আর আওয়ামী লীগের পেশিশক্তি ব্যবহার করা হয়, যা বারবার ফিরে আসছিল।
২০১৮ সালে হাসিনা কৌশলগতভাবে পিছু হটেছিলেন এবং কোটা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করেছিলেন এই আশায় যে আন্দোলনকারীরা ঘরে ফিরে যাবে। কিছু সময়ের জন্য তারা তা করেছিলও। এরপর, প্রাতিষ্ঠানিক আত্মহননের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট সুবিধাভোগী আমলাদের পক্ষে রায় দিয়ে কোটা পুনরায় বহাল করে। হাসিনা তার চিরচেনা ঢঙে প্রতিক্রিয়া জানান। বিক্ষোভকারীদের তিনি ‘রাজাকার’ হিসেবে অভিহিত করেন, যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের গণহত্যাকারীদের সহযোগীদের জন্য সংরক্ষিত একটি ঘৃণ্য নাম। এই গালিটি পেট্রোল পাম্পে জ্বলন্ত দেশলাই ফেলার মতো কাজ করে। বিক্ষোভ ফুলে-ফেঁপে ওঠে; কারফিউ জারি করা হয়; ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। আওয়ামী ক্যাডার এবং নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে।
ততক্ষণে নিপীড়ন আর কেবল কৌশল নয়, বরং অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। হাসিনার সরকার ‘আয়নাঘর’-এর মতো কুখ্যাত গোপন কারাগারের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো, পোকামাকড় দিয়ে কামড়ানো হতো এবং প্রতিদিন রাতে তাদের ফাঁসির জন্য প্রস্তুত করে ভোরের আলো ফোটার আগে আবার মাঠে ফেলে রাখা হতো। শেষ দফার দমন-পীড়নে অন্তত ১,৪০০ মানুষ নিহত হন; আরও ডজন ডজন মানুষ রাষ্ট্রের অন্ধকূপে হারিয়ে যান। যখন সুপ্রিম কোর্ট তড়িঘড়ি করে আবারও কোটা সংশোধন করে মেধাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ফিরিয়ে আনল, তখন সেই ছাড় দেওয়ার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। পুরো বাংলাদেশ তখন জ্বলছে। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও হাসিনা জনতাকে লক্ষ্য করে পুনরায় গুলি চালানোর জন্য সেনাবাহিনীকে চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার জেনারেলরা তাতে অস্বীকৃতি জানান। বারুদের স্তূপ শেষ পর্যন্ত জ্বলে ওঠে। আর সেই সাথে ছাই হয়ে যায় একটি দীর্ঘস্থায়ী শাসনব্যবস্থা।
গত বছর, এক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায়ে হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ঢাকা তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও দিল্লি অত্যন্ত সুকৌশলে তা প্রত্যাখ্যান করে। দিনশেষে, তিনি তো ভারতেরই আশীর্বাদপুষ্ট। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণেই বাংলাদেশকে সর্বদা তার হিমালয়সম-প্রতিবেশী ভারতের কথা মাথায় রাখতে হয়। তবে হাসিনার আমলে সেই ‘মাথায় রাখা’ নিরঙ্কুশ আনুগত্যে রূপ নিয়েছিল। তার সরকার ভারতীয় সংস্থাগুলোর সাথে অত্যন্ত একপাক্ষিক জ্বালানি চুক্তি সই করেছিল, যার মধ্যে আদানি পাওয়ারের চুক্তিটি অন্যতম, যা বাংলাদেশকে এমন বিদ্যুতের জন্য অর্থ দিতে বাধ্য করে যা হয়তো তারা ব্যবহারই করবে না। এছাড়া সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর ম্যানগ্রোভ বনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকেও তিনি হাসিমুখে সমর্থন দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের জুনে তিনি ভারতকে বাংলাদেশের রেলপথে শুল্কমুক্ত ট্রানজিট সুবিধা প্রদান করেন, যা ছিল ‘ভারত বয়কট’ আন্দোলন উস্কে দেওয়ার সর্বশেষ কারণ এবং অনেকের কাছেই এটি ছিল সার্বভৌমত্বকে নীরবে বিলিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ।
হাসিনা সরকারের দুর্নীতির দুর্গন্ধ লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড পর্যন্ত পৌঁছেছিল। গত বছর বাংলাদেশের একটি আদালত তার ভাগ্নি এবং ব্রিটিশ লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে একটি ভূমি বরাদ্দ প্রকল্পে দুর্নীতির দায়ে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। তার অনুপস্থিতিতে দেওয়া এই রায়টি তার স্বাধীনতায় কোনো ব্যাঘাত ঘটাবে না বলেই মনে করা হয় এবং লেবার পার্টি একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। চাপের মুখে সিদ্দিক তার মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করলেও তিনি ছিলেন অনড়। তিনি ‘বিশিষ্ট আইনজীবীদের’ যাদের মধ্যে আইনি বিশেষজ্ঞ চেরি ব্লেয়ারও রয়েছেন; তাদের ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো তুলে ধরার জন্য। অন্যদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সম্ভবত কূটনৈতিক জটিলতা আঁচ করতে পেরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন নেতার লন্ডন সফরের সময় তার সাথে দেখা করতে রাজি হননি, যদিও সেই সফরের উদ্দেশ্য ছিল হাসিনার দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনামলে পাচার হওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধার করা।
একজন কলঙ্কিত উত্তরাধিকারী এবং একজন অপেশাদার ইসলামপন্থী; একটি তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন যারা দেরিতে হলেও আপসের মাশুল বুঝতে পারছে এবং একটি নিষিদ্ধ বর্তমান দল- এসবের মাঝে বাংলাদেশের ভোটারদের সামনে আসলে কোনো ‘পছন্দ’ নেই, বরং এটি কেবল একটি বাছাই প্রক্রিয়া মাত্র। লুটপাটের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে যে মূল লড়াই, তা আবারও স্থগিত হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে এনজিও মহলে বাংলাদেশকে একটি ‘নব্য-উদারবাদী অলৌকিকতা’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। প্রচারণার বিষয়বস্তু ছিল- ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, সচল পোশাক শিল্প, আর ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন।
তবে বর্তমানের হিসাবপত্র ভিন্ন কথা বলছে। জিডিপির তুলনায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয় মাত্র ৭ শতাংশের আশেপাশে (যুক্তরাজ্যে এটি ৩৯ শতাংশ), যা এশীয় মানদণ্ডেও অত্যন্ত নগণ্য। এর ফলে সরকারকে পরোক্ষ কর এবং বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি দলিলে প্রমাণিত হয়েছে যে, হাসিনার অর্থনীতিবিদরা প্রবৃদ্ধির হারকে একটু বেশিই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছিলেন এবং ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অবৈধ পথে দেশ থেকে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে, যা প্রতি বছর জিডিপির প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশের সমান।
এটি ছিল এক চূড়ান্ত পর্যায়ের 'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম' বা সুবিধাভোগী পুঁজিবাদ। ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তিগত ভাণ্ডার হিসেবে; বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো মন্ত্রী ও তাদের ঘনিষ্ঠদের টোল আদায়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। রপ্তানির মেরুদণ্ড পোশাক খাত টিকে ছিল অত্যন্ত কম মজুরির ওপর। এই মজুরি এতই কম যে চা বাগানের শ্রমিকরা দিনে মাত্র দুই ডলার আয় করেও নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করতে পারত। ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে।
২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে ১,০০০-এর বেশি শ্রমিকের মৃত্যুর পর কোনো সংস্কার হয়নি, বরং মিলেছে রাবার বুলেট, গ্রেপ্তার এবং শ্রমিক নেতাদের গুম হওয়া। বাংলাদেশ এখন নিয়মিতভাবে শ্রমিকদের জন্য বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্ট দেশের তালিকায় স্থান পায়। এই উদাসীনতা বিদেশের মাটিতেও দৃশ্যমান।
অভিবাসী শ্রমিক বাংলাদেশের অন্যতম লাভজনক রপ্তানি পণ্য; তাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে বন্দনা করা হলেও সৌদি আরবে দাসত্বের সমতুল্য অবস্থায় তাদের কার্যত নিঃসঙ্গ ফেলে রাখা হয়েছে। যখন উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে নির্যাতিত গৃহকর্মীদের লাশ ফিরে আসে, ঢাকার নীতিনির্ধারকরা তখন স্রেফ কাঁধ ঝাঁকান; তাদের কাছে এই মৃত্যুগুলো ব্যবসা পরিচালনার একটি ‘গ্রহণযোগ্য বাড়তি খরচ’ মাত্র। কেবল ২০২২ সালেই প্রায় ৪,০০০ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক কফিনে বন্দি হয়ে দেশে ফিরেছেন।
এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবর্তন আনবে না। বিএনপি হয়তো জিতবে, জামায়াতের উত্থান ঘটবে, আর কিছু ছাত্র হয়তো সংসদে জায়গা করে নেবে। ক্ষমতার বদল হবে, হয়তো অত্যন্ত মার্জিতভাবেই। কিন্তু সেই পুরনো ব্যবস্থা- সস্তা শ্রম, ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান, অর্থ পাচার এবং ভিন্নমতের দমন-সবই টিকে থাকবে। তবে এর কোনোটিই বাংলাদেশি ভোটারদের সাহসকে ছোট করে না, যারা আগে গুলির সামনে বুক পেতেছেন এবং আবারও হয়তো তা করতে পারেন। নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আর ঠিক সেই কারণেই বাংলাদেশে তা এত নিপুণভাবে সাজানো হয়। প্রচারণার ব্যানার নামিয়ে ফেলা হবে; নতুন করে শুরুর ভাষণ দেওয়া হবে। তবে তোমাজি দি লাম্পেদুসার সেই বিখ্যাত উক্তির মতোই- “সবকিছু বদলে যেতে হবে যাতে সবকিছু আগের মতোই থেকে যেতে পারে।”
লেখক: ইতিহাস বিশ্লেষক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত কলেজ সেন্ট এডমান্ড হলের শিক্ষক
(লেখাটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনহারভ থেকে নেওয়া।)

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট