শনিবার বিকেলের সকাল হবে কবে?

শনিবার বিকেলের সকাল হবে কবে?
শনিবার বিকেলের পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের যে সিনেমাটি নিয়ে কথা বলব, তা আমার দেখা তো দূরের কথা, বাংলাদেশে মুক্তিই পায়নি। ভাবছেন, যে সিনেমা মুক্তিই পায়নি, তা নিয়ে আবার কথা কিসের! বিশ্বাস করুন, সিনেমাটি নিয়ে অনেক কথা ঠিকই আছে। হ্যাঁ—না দেখেও।

সিনেমাটি হলো মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ‘শনিবার বিকেল’। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মাতার অভিযোগ ছিল সিনেমাটি নাকি মুক্তি দিতে দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে ফেসবুকে তিনি প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ এবং নীতি নির্ধারকদের হালকা চালে সমালোচনাও করতেন। কিন্তু দেড় বছর তো হয়ে গেল আওয়ামী লীগ সরকার নেই, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিজেই এখন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, তারপরও কেন আলোচিত সেই সিনেমা মুক্তি পেল না?

ওই যে ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা হলো না? পত্র-পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ভয়াবহ ও নজিরবিহীন ঘটনার প্রেক্ষাপটে ফারুকী ‘শনিবার বিকেল’ সিনেমাটি তৈরি করেছিলেন। যদিও পরিচালক বলেছেন, সিনেমাটি ঠিক সেই ঘটনা অবলম্বনে নয়, ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। সিনেমার শুটিং শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের ৫ জানুয়ারি। মাত্র সাত দিনেই শুটিংয়ের কাজ শেষ হয়ে যায়। ‘শনিবার বিকেল’ প্রযোজনায় যৌথভাবে আছে বাংলাদেশ, ভারত ও জার্মানি।

যা হোক। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড বিলুপ্ত করা হয় এবং ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড’ গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। তার পরের মাসের ১০ তারিখে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ৩৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য এবং ১২টি স্বল্পদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্রসহ মোট ৯৪টি চলচ্চিত্রকে সনদ দিয়েছে এই সার্টিফিকশন বোর্ড। সনদ পাওয়া তালিকায় নেই ‘শনিবার বিকেল’।

কারণ কি জানেন? সনদের জন্য কেউ যোগাযোগই নাকি করেননি!

শনিবার বিকেল সিনেমার বিষয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পোস্ট। ছবি: সংগৃহীত
শনিবার বিকেল সিনেমার বিষয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পোস্ট। ছবি: সংগৃহীত

সিনেমাটি মুক্তি পেলে নাকি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে, তাই শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘ ৪ বছরের বেশি সময় সিনেমাটিকে আটকে রাখা হয়েছিল। ওই সময়ে ফারুকী বহুবার নিজের ক্ষোভ ও কষ্টের কথা ফেসবুকে তুলে ধরেছেন। ২০২১ সালের ২৬ মে তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, ‘শনিবার বিকেল ছবিটা ব্যান হয়ে থাকার দুই বছর হয়ে গেল! যারা এই ব্যানের পেছনে আছেন, আল্লাহ তাদের সবার আত্মায় প্রশান্তি দিক!’

তার পরের বছরের ৯ জুন ফেসবুকে নিজের ওয়ালে ফারুকী লিখেছিলেন, ‘প্রিয় বাংলাদেশ। প্রিয় তথ্য মন্ত্রণালয়। গুলশানের হোলি আর্টিজান নিয়ে নির্মিত ভারতীয় সিনেমা “ফারাজ” মুক্তি পাচ্ছে ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ (২০২২)। আর এই বঙ্গদেশের এক অধম ফিল্মমেকার ঐ ঘটনার অনুপ্রেরণা নিয়ে “শনিবার বিকেল” বানিয়ে আজকে চার বছর সেন্সরে আটকা। আমাদের ছবি আর্টিজানের ঘটনা পুনঃনির্মাণ করে নাই, এমন কি ঐ ক্যাফের ভেতরের কোনো চরিত্র পুনঃনির্মাণও করে নাই! তারপরও এই সাজা পাওয়ার একমাত্র কারণ কি এই দেশের নাগরিক হওয়া? ধন্যবাদ সব কিছুর জন্য। ইতিহাস নিষ্ঠুর। সে সব কিছু মনে রাখে।’

২০২২ সালের ১০ আগস্ট ফেসবুকে ফারুকী লিখেছিলেন, ‘শনিবার বিকেল নিয়ে সেন্সর বোর্ডের অন্যায্য আচরণের প্রতিবাদে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির শিল্পী-কলাকুশলী এবং সাধারণ দর্শকরা যেভাবে সোচ্চার হয়েছেন সেটা আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য আশা জোগায়।...আমাদের সবার একটাই লক্ষ্য, “শনিবার বিকেল”কে সেন্সরের জেলখানা থেকে মুক্ত করে মানুষের কাছে আনা।’

মজার ব্যাপার হলো ২০২৩ সালের ২১ জানুয়ারি ‘শনিবার বিকেল’ সিনেমা মুক্তির অনুমতি দিয়েছিল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের আপিল কমিটি। তারপরও সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। ‘সেন্সরের জেলখানা’ থেকে মুক্ত হয়েও কেন সিনেমাটিকে মানুষের কাছে আনা গেল না, সেই প্রশ্নের উত্তর তখনো পাওয়া যায়নি, এখনো মিলছে না। আমরা দেখলাম একই বছরের ২৪ নভেম্বর ভারতীয় ওটিটি প্লাটফর্ম ‘সনি লিভ’-এ সিনেমাটি মুক্তি পায়।

যদিও অনুমতি পাওয়ার দিন ফারুকী বোর্ডের আপিল বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেসবুকে ঘোষণা করেছিলেন, ‘ফারাজের সাথে বা আগেই ছবিটা মুক্তির ব্যবস্থা করব ইনশাল্লাহ।’ তা হয়নি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার গঠনের পরও হয়নি—এমনকি ফারুকী নিজে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা হওয়ার পরও কথা রাখেননি বা রাখতে পারেননি।

২৪ নভেম্বর ভারতীয় ওটিটি প্লাটফর্ম ‘সনি লিভ’-এ সিনেমাটি মুক্তি পায়। ছবি: সংগৃহীত
২৪ নভেম্বর ভারতীয় ওটিটি প্লাটফর্ম ‘সনি লিভ’-এ সিনেমাটি মুক্তি পায়। ছবি: সংগৃহীত

সাংবাদিক নুরুজ্জামান লাবু, যার বইয়ের তথ্য অবলম্বনে ভারতের হংসাল মেহতা হোলি আর্টিজান হামলা নিয়ে তৈরি করেছেন ‘ফারাজ’ সিনেমা। সেই নুরুজ্জামান লাবুর মতো অনেকের অনুমান ও দাবি, শনিবার বিকেলে ধর্মীয় উগ্রতাকে প্রকটভাবে দেখানো হয়েছে। এখন যদি এই সিনেমা মুক্তি পায়, তাহলে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী অসন্তুষ্ট হতে পারে। তাদের সন্তুষ্ট রাখতেই সিনেমাটি দেশে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না।

আসলেই কি তাই?

আগে মুক্তি না দেওয়ায় প্রায়ই এ নিয়ে কথা বলতেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, কিন্তু এখন আর তিনি এ নিয়ে মুখ খুলছেন না। তিনি না বললে আমরা কীভাবে জানব আসল ঘটনা? কীভাবে উদঘাটন হবে সিনেমাটিকে দেশান্তরি করে রাখার রহস্য?

লেখক: প্রধান, ভিডিও বিভাগ, চরচা

সম্পর্কিত