ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য উইক-কে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

বিএনপি নেতৃত্বাধীন কোনো জাতীয় সরকারে জামায়াত থাকবে না

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিএনপি নেতৃত্বাধীন কোনো জাতীয় সরকারে জামায়াত থাকবে না
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: চরচা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, জুলাই আন্দোলনের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞদের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক। গুরুত্ব বিবেচনায় পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করছে চরচা।

দ্য উইক: নির্বাচন আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: বাংলাদেশের মানুষ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। প্রায় ১৫ বছর ধরে নাগরিকেরা কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী এমন একটি পুরো প্রজন্ম রয়েছে, যাদের কখনো প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়নি। ফলে ভোটারদের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমি মনে করি, ভোটার উপস্থিতি ভালোই হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন কোনো বড় ধরনের কোনো অস্থিরতা বা গুরুতর বাধা সৃষ্টি হবে বলে আমি মনে করি না। নির্বাচন কমিশন দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে এবং সরকারও নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে আন্তরিক বলেই মনে হচ্ছে। আমাদের উপমহাদেশে নির্বাচনী প্রচারের সময় কিছু সমস্যা থাকেই। কিন্তু সেগুলো এমন নয় যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যাহত হবে। রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছে এবং মানুষও ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।

দ্য উইক: নির্বাচনের আগে বা পরে জাতীয় সরকার গঠন নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: গত ১৫ বছরে আমরা যখন একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, তখন বাম ও ডান– উভয় ধারার মতাদর্শিকভাবে কাছাকাছি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জোট গড়ে তুলেছিলাম। সব মিলিয়ে প্রায় ২০-২৪টি রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে সেই সংগ্রামে ছিল। আমরা যখন আমাদের ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করি, তখনই স্পষ্ট করে বলেছিলাম– আমরা সরকার গঠন করলে তা হবে ঐকমত্যভিত্তিক সরকার, যেখানে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে থাকা দলগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সেই অঙ্গীকার এখনো বহাল আছে। তবে যারা সেই আন্দোলনের অংশ ছিল না, তারা এই সরকারে থাকবে না।

দ্য উইক: এর মধ্যে কি জামায়াতে ইসলামীর নামও আছে?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: না। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমাদের কোনো সমঝোতা নেই এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন কোনো জাতীয় সরকারে জামায়াত থাকবে– এমনটা আমি দেখি না।

দ্য উইক: ছাত্রদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সঙ্গে বিএনপি জোট গড়েননি কেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: আমরা চেষ্টা করেছি। কিন্তু এনসিপি অনেক বেশি সংখ্যক আসন দাবি করেছিল, যা বাস্তবসম্মত ছিল না। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমাদের প্রার্থীরা ওই আসনগুলোতে জিততে পারবে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন প্রতীক নিয়ে এনসিপির প্রার্থীরা জিততে পারবে কি না, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রতীকের গুরুত্ব অনেক।

দ্য উইক: এই নির্বাচন ভিন্ন আরেকটি কারণে– আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: আমি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারি না। তবে যতদূর জানি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আগে যুক্ত ছিলেন– এমন কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা তার দলকে নির্বাচনে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। আমি মনে করি না আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। আদর্শগতভাবে তাদের নতুন নেতৃত্ব ও নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসা উচিত ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। এখন আর সে সুযোগও নেই, কারণ শেখ হাসিনা দলে বিকল্প নেতৃত্বের সুযোগ দেন না।

দ্য উইক: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: এটি বিশাল উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তার ফিরে আসা সত্যিকারের উত্তেজনা ও আশা জাগিয়েছে। তার প্রথম ভাষণেই তিনি মানব উন্নয়নকেন্দ্রিক একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষকের কল্যাণ ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দেন। প্রস্তাবিত কৃষক কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি উপকরণের ন্যায্যমূল্য এবং উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম নিশ্চিত করার কথা বলেন। তিনি ১৮ মাসের মধ্যে অন্তত এক কোটি তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেন এবং তা বাস্তবায়নের উপায়ও ব্যাখ্যা করেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তার আরেকটি মূল অঙ্গীকার। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ রাখার এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। শিক্ষা সংস্কারে প্রয়োজনভিত্তিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা এবং মেধাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার কথা বলেন। স্বাস্থ্য খাত সংস্কারও তার কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে– একটি কার্যকর ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকারসহ।

দ্য উইক: রাজনৈতিক আলোচনায় ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। কোন বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান দরকার?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: প্রথমত, পানি বণ্টনের বিষয়গুলো আন্তরিকভাবে সমাধান করতে হবে। শুধু আলোচনা করলেই হবে না। দ্বিতীয়ত, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। কোনো সভ্য সমাজে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলো ন্যায্যভাবে সমাধান করা দরকার। সাম্প্রতিক ক্রিকেটসংক্রান্ত ঘটনাটি দুর্ভাগ্যজনক ও অপ্রয়োজনীয় ছিল। এতে দুই দেশেই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক আস্থার কথা মাথায় রেখে তাৎক্ষণিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। বেগম খালেদা জিয়ার শোকের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সফর ছিল একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

দ্য উইক: ভবিষ্যতে, বিশেষ করে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে শেখ হাসিনা কতটা বড় ‘ফ্যাক্টর’?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: তিনি একটি ফ্যাক্টর, তবে অতিক্রম অযোগ্য নন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিয়ে এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে শেখ হাসিনাই এই সংকট সৃষ্টি করেছেন। দীর্ঘমেয়াদে তিনি রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকবেন না। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক তার বাইরেও এগোতে পারে এবং এগোনো উচিত।

দ্য উইক: সবশেষে, ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের ব্যাপারে নরম অবস্থান নিচ্ছে?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: পাকিস্তানকে অবশ্যই ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। এটাই আমাদের অবস্থান। একই সঙ্গে, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের জন্য প্রতিবেশী সব দেশকেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য উইকের দিল্লি ব্যুরোর প্রধান নম্রতা বিজি আহুজা

সম্পর্কিত