স্কুলের একটি পরিচিত দৃশ্য– শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন, আর অধিকাংশ শিক্ষার্থী মাথা নিচু করে স্মার্টফোনে ডুবে আছে। এই চিত্র এখন শুধু কোনো একটি দেশের নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক গভীর সংকটের সংকেত। সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে: যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা স্কুল চলাকালে এক দিনে গড়ে ৬৪ বার তাদের ফোন হাতে নেয়। এই সংখ্যা শুধু অভ্যাসের পরিমাণই নয়, বরং মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জ্ঞান বিকাশের ওপর এর গভীর প্রভাবেরও ইঙ্গিত দেয়।
এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে ইউনিভির্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা (চ্যাপেল হিল)-এর গবেষকদের মাধ্যমে এবং প্রকাশিত হয়েছে জামা নেটওয়ার্ক ওপেন (JAMA Network Open)-এ। ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৭৯ জন শিক্ষার্থীর ওপর দুই সপ্তাহ ধরে চালানো এই গবেষণায় দেখা যায়, স্কুল চলাকালে শিক্ষার্থীরা গড়ে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ফোন ব্যবহার করে। অর্থাৎ, একটি স্কুল দিনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় চলে যাচ্ছে স্ক্রিনে। কিন্তু আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো– এই ব্যবহারটি দীর্ঘ সময় ধরে নয়, বরং বারবার ফোন চেক করার প্রবণতা হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে।
একটি শিশু যেমন তার নিরাপত্তার জন্য পরিচিত কোনো বস্তুর দিকে হাত বাড়ায়, তেমনি শিক্ষার্থীরাও যেন এক ধরনের মানসিক নির্ভরতায় ফোনের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। এই ‘কম্পালসিভ’ বা বাধ্যতামূলক আচরণ তাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি বার ফোন ব্যবহার করেছে, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ হয়েছে। অর্থাৎ, এটি শুধু বিভ্রান্তি নয়, বরং মানসিক শৃঙ্খলার ওপর সরাসরি আঘাত।
কৈশোর এমন একটি সময়, যখন মানুষের মস্তিষ্ক–বিশেষ করে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স–এখনো বিকাশমান। এই অংশটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মনোযোগ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় অতিরিক্ত ডিজিটাল উদ্দীপনা, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুত ও আকর্ষণীয় কনটেন্ট, মস্তিষ্ককে স্বল্পমেয়াদি আনন্দের প্রতি আসক্ত করে তোলে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ ও ধৈর্যের প্রয়োজনীয় কাজ–যেমন পড়াশোনা–তাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হতে শুরু করে।
শুধু পড়াশোনার ক্ষতি নয়, সামাজিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষক লরেন হালে মন্তব্য করেছেন, শিক্ষার্থীরা শুধু ক্লাসরুমের শেখার সুযোগই হারাচ্ছে না, বরং সহপাঠীদের সঙ্গে বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এই যোগাযোগই তাদের মানসিক ও আবেগগত বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছবি: রয়টার্সবর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ৯৫ শতাংশের বেশি মার্কিন কিশোর-কিশোরীর কাছে স্মার্টফোন রয়েছে এবং প্রায় অর্ধেকই নিজেদের ‘প্রায় সবসময় অনলাইনে’ বলে বর্ণনা করে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, স্মার্টফোন এখন আর শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং একটি সর্বব্যাপী জীবনধারা। আর এই জীবনধারা যখন স্কুলের মতো মনোযোগ-নির্ভর পরিবেশে প্রবেশ করে, তখন তা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষকদের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন। তাদের এখন শুধু পাঠদানই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য স্মার্টফোনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। একটি ক্লাসরুমে যেখানে মনোযোগই সবচেয়ে বড় সম্পদ, সেখানে স্মার্টফোন সেই সম্পদকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে– শিক্ষকদের কি সত্যিই এই অসম লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করা উচিত?
বিশ্বের কিছু দেশ ইতিমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মালয়েশিয়াও একই পথে হেঁটেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টেও এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে। এই উদাহরণগুলো দেখায়, সমস্যা শুধু গবেষণার বিষয় নয়– বরং এটি একটি নীতিনির্ধারণী ইস্যু হয়ে উঠেছে।
তবে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করা কি একমাত্র সমাধান? এর উত্তর সহজ নয়। একদিকে, প্রযুক্তি আজকের বিশ্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার তাদের ভবিষ্যৎ দক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি– যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে, কিন্তু তা হবে নিয়ন্ত্রিত এবং শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ, স্কুলে নির্দিষ্ট সময় ও উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ক্লাস চলাকালীন ব্যক্তিগত ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানোও জরুরি। কারণ, শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, সচেতন ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান।
এই প্রসঙ্গে স্টিভ জবস-এর একটি বহুল উদ্ধৃত মন্তব্য প্রাসঙ্গিক। তিনি নাকি তার নিজের সন্তানদের স্মার্টফোন ও কম্পিউটার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, প্রযুক্তি শেখা সহজ, কিন্তু শৈশবের মূল্যবান সময় হারালে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। এই বক্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়– প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানবিক বিকাশের মূল উপাদানগুলো এখনো অপরিবর্তিত।
অতএব, প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের নয়, বরং আমরা কী ধরনের শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে চাই–তা নিয়ে। যদি আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা মনোযোগী, আত্মনিয়ন্ত্রিত এবং সামাজিকভাবে দক্ষ, তাহলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সেই অনুযায়ী সাজাতে হবে। আর সেই পথচলায় স্মার্টফোনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় হয়তো সত্যিই এসে গেছে।
লেখক: মার্কিন সাংবাদিক ও লেখক
(লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে)