উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার রাজশাহীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন রাজশাহী-২ (সদর)। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসনে এখন সাজ সাজ রব। প্রার্থীরা তাদের সমর্থকদের নিয়ে চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী এলাকা। তবে এলাকার দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও নাগরিক ভোগান্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রার্থীরা বলছেন, তারা নির্বাচিত হলে এসব সমস্যার সমাধান করবেন।
রাজশাহী সদর আসনে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অর্থ লোপাট এবং কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ অনেক দিনের। বর্ষাকালে ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের বড় ভোগান্তি। স্বাস্থ্যসেবায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দালাল সিন্ডিকেট এবং সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের অনুপ্রবেশ এলাকার বড় একটি সমস্যা।
স্থানীয়রা বলছেন, এই সংকটগুলোর সমাধানে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। মাদকের মূল উৎপাটন, টেন্ডারবাজি বন্ধ এবং স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি দমনে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। আগামী-১২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর সাধারণ মানুষ তাদের ব্যালটের মাধ্যমেই এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান খুঁজে পাবেন বলে আশা করছেন।
এই আসনের মোট ভোটার তিন লাখ ৬৯ গাজার ৫৬৪। যার মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৭৮ হাজার ২৪৯ এবং নারী এক লাখ ৯১ হাজার ৩০৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছে আটজন।
সাহেব বাজার এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল কুদ্দুস বলেন, “ভোটের সময় সবাই বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু পরে আমাদের খবর রাখে না। বাজারে অদৃশ্য চাঁদাবাজির কারণে আমরা অতিষ্ঠ। আমরা এমন নেতা চাই যিনি এই মাফিয়াদের শাসন বন্ধ করবেন।”
শিক্ষার্থী রাইসা ইসলাম বলেন, “রাজশাহীতে পড়াশোনা শেষ করে কাজের তেমন কোনো জায়গা নেই। আমরা চাই প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিগুলো যেন নির্বাচনের পর কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ না থাকে।
প্রবীণ ভোটার রফিকুল আলম বলেন, “শহরের বড় সমস্যা এখন মাদক আর কিশোর গ্যাং যিনি এই শহরকে প্রকৃত অর্থে মাদকমুক্ত করবেন তাকেই আমরা ভোট দেব।”
রাজশাহী মহানগরীর বুক চিরে বয়ে চলা পদ্মা নদীর কোলঘেঁষে টি-বাঁধ থেকে শুরু করে বুলনপুর ও মিজানের মোড় পর্যন্ত এলাকা নির্বাচনী প্রচারে মুখর। টি-বাঁধ এলাকার মাঝি কাসেম আলী বলেন, “নির্বাচন আসলে বড় বড় নেতারা লম্বা লম্বা কথা বলে। পদ্মা পাড় এখন সাজানো হয়েছে ঠিকই, পর্যটকরা এসে ছবি তুলে আনন্দ করে, কিন্তু আমাদের মাঝিদের থাকার বা নৌকা বাঁধার কোনো ভালো ঘাট আজও হলো না।”
রাস্তার পাশে ক্ষুদ্র ব্যবসা করা জহুরা বেগম বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে নদী ভাঙনের সাথে যুদ্ধ করছি। এখন বাঁধ হইছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের বস্তির মানুষের ঘরের কোনো উন্নতি হয় নাই। ভোটের সময় সবাই বলে ঘর দেবে, বিদ্যুৎ দেবে। ভোট শেষ হলে কেউ আর এই কাদা-পানির খবর নিতে আসে না। এবার ভোট তাকেই দেব, যে আমাদের উচ্ছেদ না করে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেবে।”
বুলনপুর এলাকার গৃহিণী সালমা খাতুন বলেন, “পদ্মার পাড় এখন অনেক সুন্দর হয়েছে, কিন্তু সন্ধ্যার পর এই মিজানের মোড় থেকে টি-বাঁধ পর্যন্ত এলাকায় বখাটেদের আড্ডা বাড়ে। আমরা মায়েরা সবসময় আতঙ্কে থাকি আমাদের ছেলেদের নিয়ে। যে নেতা এই এলাকাকে মাদক মুক্ত করার সাহস দেখাবে, আমরা তার জন্যই দোয়া করব।”
মিজানের মোড় এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মজিদ সরকার বলেন, “শহর সাজানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ড্রেনেজ আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। আমরা চাই এমন একজন শিক্ষিত আর দূরদর্শী মানুষ সংসদে যাক, যে এই পদ্মাকে রক্ষা করবে এবং আমাদের এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য হাইটেক পার্কে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেবে।”
তরুণ ভোটার সাব্বির আহমেদ বলেন, “আমাদের এই এলাকাটা রাজশাহীর ড্রয়িংরুম। কিন্তু এখানে স্থানীয়দের জন্য কোনো ভালো হাসপাতাল বা জরুরি সেবার ব্যবস্থা নেই। আমরা চাই প্রার্থীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ইশতেহার। আমরা আর ফাঁকা বুলিতে বিশ্বাসী নই, কাজের মানুষকেই এবার বেছে নেব।”
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু নির্বাচনী প্রচারের সময় বলেন, “এই নির্বাচন একটি বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন। দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র থেকে বঞ্চিত। আমাদের প্রথম দায়িত্ব হবে হারিয়ে যাওয়া সেই সুন্দর ও নিরাপদ রাজশাহীকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা। আমরা রাজশাহীকে একটি আইটি শহর হিসেবে গড়ে তুলব, যাতে যুবকদের ব্যাপক কর্মসংস্থান হয় এবং বিদেশেও তাদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়।”
জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “এলাকার চিহ্নিত সমস্যাগুলো বিশেষ করে বেকারত্ব দূর করতে আমি কাজ করতে চাই। আমরা মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গড়তে চাই। আমরা অবশ্যই সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্যের পক্ষে এবং দেশে যেন ফ্যাসিবাদ আর মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে জন্য কাজ করব।”
আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) প্রার্থী মু. সাঈদ নোমান বলেন, “একাত্তরের পর আমিই রাজশাহীর সবচেয়ে তরুণ প্রার্থী। তরুণ সমাজ ও গণমানুষের কাছ থেকে আমি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি এবং আমার অবস্থান অনেক ওপরে উঠে আসছে। আমরা লুটেরা রাজনীতির পরিবর্তন চাই। রাজশাহীর মানুষ বারবার নেতাদের বিশ্বাস করে ধোঁকা খেয়েছে।”
নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী মোহাম্মদ সামছুল আলম বলেন, “রাজশাহীতে দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পায়ন না হওয়ায় শিক্ষিত যুবকরা আজ হতাশ ও কর্মহীন। আমি নির্বাচিত হলে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যুবকদের বিদেশের বাজারের উপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করব। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা আমার অগ্রাধিকার। আমরা জনগণের প্রকৃত সরকার গঠন করতে চাই।”
বাংলাদেশ লেবার পার্টির মেজবাউল ইসলাম বলেন, “লেবার পার্টির ধর্ম-কর্ম ও সাম্যবাদের আদর্শ ধারণ করে এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। আমরা মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করছি। সমাজে যে নৈতিক অবক্ষয় ও বৈষম্য দেখা দিয়েছে, তা দূর করতে হলে আমাদের আদর্শের বিকল্প নেই। আমরা নির্বাচিত হলে দুর্নীতিমুক্ত এক জনপদ উপহার দেব, যেখানে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে।”
স্বতন্ত্র প্রার্থী সালেহ আহমেদ বলেন, “আমি কোনো দলের ইশতেহার নয়, বরং সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও নতুন নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মাঠে নেমেছি। রাজনৈতিক দলের গ্যাঁড়াকলে আটকে থাকা উন্নয়নকে আমি মুক্ত করতে চাই।”