গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছিলেন, ‘অত্যন্ত ভালো’ নির্বাচন হয়েছে। তবে ভোট শেষ হওয়ার পর নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৯টি সংসদীয় আসনে আয়োজিত নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর সঙ্গেই অনুষ্ঠিত জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কার গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ২৯৭ আসনে ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে এরইমধ্যে সরকার গঠন করেছে বিএনপি ও মিত্ররা। ৭৭ আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে জামায়াতে ইসলামী জোট নির্বাচনের ফলাফল কারচুপির অভিযোগ তুলেছে।
৩২টি সংসদীয় আসনে ভোটে অনিয়ম এবং ফলাফল কারচুপির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য।
যদিও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলছেন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সফল হয়েছে ইসি। তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিছু অভিযোগ রয়েছে তবে তাতেও ভোট সামগ্রিকভাবে সুষ্ঠু হয়েছে বলা যায়।’’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের কয়েক মাস পর ২১ নভেম্বর এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৪তম নির্বাচন কমিশন। ওই বছরের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আগের দুটি বিতর্কিত নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় নতুন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের।
সফলতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাচন নিয়ে সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলেছে, “৯৯ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনো নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জালভোট প্রদানের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে এবং ৪০ শতাংশ আসনে একাধিক অনিয়মের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে কমিশন সফল কি না তা একবাক্যে বলা সম্ভব নয়। ভোট নিয়ে ওঠা কিছু প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার চরচাকে বলেন, “ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগিরকদের নির্বাচন নিয়ে বিতর্কটা এড়ানো যায়নি। আমরা যেসব সংস্কার প্রস্তাব রেখেছিলাম সেগুলো ঠিকমত গ্রহণ করলে হয়ত নির্বাচন আরও ক্রেডিবল হতো। টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে দেখেছেন, ভোট নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।”
তবে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের আরেক সদস্য ড. আব্দুল আলীম চরচাকে বলেছেন, “নির্বাচন সফল হয়েছে। এটা বলা যায়।”
আর জাতীয় আকাঙ্ক্ষা থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে মত ফেমার সাবেক সভাপতি মুনিরা খানের। চরচাকে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ভোটের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। রাজনৈতিক দল আর ভোটাররাও নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এমন কর্মকাণ্ড এড়িয়ে গেছে। ১৭ বছর ধরে যে সুষ্ঠু ভোট হচ্ছিল না, তার অবসান ঘটাতে যে জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটা বাস্তাবায়িত হয়েছে বলা যায়।”
যা বলছে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো
সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সংস্থা ইতিবাচক, আশাবাদী এবং আংশিক সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেছেন, ২০০৮ সালের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য নতুন বেঞ্চমার্ক।
ভোটের পর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক মূল্যায়ন তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচন সত্যিকার অর্থেই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল এবং নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতার সঙ্গে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। তবে অপতথ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টিও উঠে এসেছে তাদের পর্যবেক্ষণে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বার্তায় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানান। তিনি জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার, আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষাসহ মানবাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, জনগণের অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এ প্রতিক্রিয়াকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশীয় পর্যায়ে অধিকার, বি-স্ক্যান, রূপসা ও আরশি ট্রাস্ট যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, নির্বাচন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ হলেও পরবর্তী সময়ে সহিংসতা বেড়েছে। প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা ছিল, তবে সহিংসতা উদ্বেগজনক—যদিও অতীতের তুলনায় কম। তারা সার্বিকভাবে একে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে।
অন্যদিকে, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনের চেয়ারম্যান রোহানা হেতিয়ারাসসি নির্বাচনকে ‘মাইলফলক অর্জন’ হিসেবে আখ্যা দেন। তার মতে, ১৫ বছর পর অনুষ্ঠিত এ ভোট ছিল শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য। সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা ও পোস্টাল ভোটিং প্রবর্তনকে ইতিবাচক উল্লেখ করলেও নারীর মাত্র ৪ শতাংশ অংশগ্রহণে অসন্তোষ জানান তিনি। একইসঙ্গে ভোটের ফল দ্রুত প্রকাশ, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের সুবিধা এবং প্রচারণা ব্যয়ের স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুপারিশও তুলে ধরা হয়।
সুষ্ঠু নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দায়িত্ব নেওয়া ইসি কেমন ভোট আয়োজন করেছে জানতে চাইলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনের সফলতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে স্পষ্ট হয়েছে— প্রশংসা ও প্রশ্ন, দুটি বিষয়ই পাশাপাশি রয়েছে।