বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ ‘কম’, যুদ্ধ দেখিয়ে দাম বাড়ানোর ‘পাঁয়তারা’

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ ‘কম’, যুদ্ধ দেখিয়ে দাম বাড়ানোর ‘পাঁয়তারা’
দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করা হয়, পরিমাণে তা প্রায় ৩০ লাখ টন। ছবি: চরচা

রমজান মাস শুরু হলে দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। এবার সেই ‘নিয়মে’ নতুন করে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অজুহাত। রোজার শুরুতে ভোজ্যতেলের দাম খুব একটা না বাড়লেও গত এক সপ্তাহ ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমেছে। সরবরাহ কমাকে দাম বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। তবে আমদানিকারকরা বলছেন, বাজারে কোনো সংকট নেই। সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।

বর্তমানে পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের দাম আগের চেয়ে ১০ টাকা বেশিতে বোতল প্রতি ৯৩০ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। খোলা বাজারে যা ৯৪০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বোতলজাত তেলের সরবাহ কম। কোনো সমস্যা উল্লেখ না করেই পাইকারি বিক্রেতারা চাহিদা মতো তেলের বোতল দিতে পারছেন না। তাদের দাবি, দেশে যে পরিমান সয়াবিন তেল মজুত রয়েছে তা দিয়ে কয়েক মাস গ্রাহকের চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু ঈদ সামনে রেখে যুদ্ধের অজুহাতে দাম বাড়ানোর ছক করছেন পাইকারি বিক্রেতারা।

ভোক্তারা জানান, এবার রোজায় সেভাবে তেলের দামে বাড়েনি। কিন্তু দোকানিরা বলছেন, দ্রুতই তেলের দাম বাড়তে পারে। তবে তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন অনেকে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর ইরানও তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি এবং জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে। তাতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভোজ্যতেলের বাজারে এই শঙ্কা নেই।

দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করা হয়, পরিমাণে তা প্রায় ৩০ লাখ টন। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন পাম তেল ও ১০ লাখ টন সয়াবিন তেল। স্বাভাবিক সময়ে সয়াবিন তেলের মাসিক চাহিদা দেড় লাখ থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টন।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, কারওয়ান বাজার ও মিরপুর–১১ বড় বাজারে পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের বোতলের সরবরাহ তুলনামূলক কমেছে। গত এক সপ্তাহে বোতলজাত তেলের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা এবং খোলা তেল লিটারে পাঁচ টাকা বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগে অর্থাৎ রমজানের শুরুতে বিভিন্ন কোম্পানির পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৯১৫ থেকে ৯২০ টাকা, যা বর্তমান বাজারে পাইকারি হিসেবে ৯৩০ থেকে ৯৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খুচরা হিসেব এসব বোতল ৯৪০ থেকে ৯৪৫ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।

রোজায় তেলের দাম সেভাবে বাড়েনি তাই অতিরিক্ত লাভের জন্য বড় ডিলাররা সরবরাহ কমিয়েছে বলে অভিযোগ করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ কম হলে গ্রাহক পর্যায়ে সঙ্কট দেখা দেয়, এটিকে পুঁজি করে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে বলেও অভিযোগ।

আজমল ইসলাম নামের একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, “এবার রোজায় বিগত বছরের তুলনায় সেভাবে পণ্যের দাম বাড়েনি। তেল কিনতে আসার পর শুনতেছি কিছুদিনের মধ্যে দাম বাড়বে। কিন্তু দেশের অবস্থা স্বাভাবিক। কোনো সমস্যা নাই তাহলে সয়াবিনের দাম বাড়বে কেন?”

তিনি আরও বলেন, “যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে কিন্তু সয়াবিনের দাম বৃদ্ধি হলে সেটা অনায্য হবে। তাই সরকারের এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”

মিরপুর–১১ বড় বাজারের সুমন স্টোরের মালিক সুমন মিয়া বলেন, “বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা হলো অমানুষ। কারণ দেশে যে পরিমাণ সয়াবিন মজুত থাকে তা দিয়ে কয়েক মাস চলা সম্ভব। কিন্তু যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে তেলের দাম বাড়াতে সরবরাহ কমানো হয়েছে।”

কারওয়ান বাজার আরিফা স্টোরের সত্ত্বাধিকারী মুনসর ইসলাম বলেন, “বিদেশ থেকে আনার জন্য এলসি করলে অন্তত দুই মাস সময় লাগে। তাহলে যুদ্ধের কারণে এখন কীভাবে তেলের সরবরাহ কমে? এটি স্রেফ বড় বড় ব্যবসায়ীদের একটা ছক। যেকোনো ভাবে তেলের দাম বাড়াতে হবে। কারণ দেশে কয়েক মাস চলার মতো তেল সব সময় মজুত থাকেই।”

নাম প্রকাশ না করে একজন ডিলার বলেন, “রোজায় দাম সেভাবে বাড়েনি। কিন্তু ঈদ সামনে রেখে কিছুটা দাম বাড়াতে নতুন কৌশল করেছে বড় ব্যবসায়ীরা। তাই বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমেছে।”

কারওয়ান বাজারে সোনালী ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী আবুল কাসেম বলেন, “পাইকারি পর্যায়ে বোতলজাত তেলের সঙ্কট চলছে। তীর ও রূপচাঁদা সেভাবে পাওয়াই যাচ্ছে না। তীর ক্যানোলা যেটা পাওয়া যাচ্ছে, সেটার পাঁচ লিটার বোতলের দাম এক হাজারের বেশি। সামনের যেকোনো সময় তেলের দাম বাড়তে পারে।”

ভোজ্যতেল আমদানিকার মেঘনা গ্রুপের এজিএম তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, “আমরা আগের মতোই তেল সরবারহ করছি। এমনকি গত মাসের চেয়ে বেশি হারেও প্রতিদিন সরবরাহ করা হচ্ছে। বাজারে কেনো সঙ্কট আছে কিংবা এটি আসলেই সত্য কি না জানা তা নেই।”

সম্পর্কিত