২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। এই নির্বাচনে ভোটগ্রহণের আগেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত হয়। বিএনপিসহ বেশির ভাগ বিরোধী দলের বর্জনের কারণে ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ।
সহিংসতার দিক থেকেও ২০১৪ সালের ভোট ছিল আলোচিত। ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত প্রাণ গিয়েছিল ১২৩ জনের। ভোটের দিনই সহিংসতায় প্রাণ হারায় ২১ জন।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভোটের ইতিহাসে আরেকটি বহুল সমালোচিত নির্বাচন। ‘রাতের ভোট’ আখ্যা পাওয়া এই নির্বাচনে বিএনপি জোট অংশ নিলেও তারা পায় মাত্র সাতটি আসন। বিরোধী জোটের অভিযোগ ছিল, ভোটের আগের রাতেই আওয়ামী লীগ ভোটকেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল দিয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অংশ না নেওয়া এবং ভোটার উপস্থিতির হারের কারণে বিতর্কিত হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপিবিহীন ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই শয়ের বেশি আসন পেলেও সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি পায় মাত্র ১১টি আসন। ওই ভোটে ৬২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন। যাদের বেশির ভাগই ছিলেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে আওয়ামী লীগ তৃণমূলে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধা দেয়নি।
পর পর এই তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর অনুষ্ঠেয় এই ভোট নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আগ্রহ আছে।
সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এবার গণভোটও হচ্ছে। এই দুই ভোটে আগামী পাঁচ বছর কারা দেশ পরিচালনা করবে এবং দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত ব্যবস্থাগুলোর সংস্কারের বিষয়ে জনসমর্থন চাওয়া হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় বসে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। ক্ষমতায় বসার কিছু দিনের মধ্যে সরকার রাষ্ট্রসংস্কারের কাজে হাত দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় গঠন করা হয় বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন। সেসব কমিশনের সুপারিশ বিশেষ করে সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক জায়গায় আনতে পরে গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ওই কমিশনের গৃহীত বিষয়গুলো নিয়েই জনগণের মতামত জানতে সরকার গণভোটের আয়োজন করেছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে জোরেশোরে প্রচারে নামে সরকার। যা নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে এবং হচ্ছে।
নির্বাচন উপলক্ষে বুধবার এক বাণীতে গণভোট নিয়ে জনগণের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “আমি আশা করি, গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করবেন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য, দায়বদ্ধ ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এভাবে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে অংশীদার হবেন।”
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কিছু দিন পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, ‘কিছু সংস্কার’ বাস্তবায়নের পর তারা নির্বচনের ঘোষণা দেবে। প্রথমে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আগে সংস্কার পরে নির্বাচনের কথা বললেও একপর্যায়ে তারা ভোট মেনে নেয়।
গত ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর তিন হাজার ৪১৭ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে। মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময় ছিল ২৯ ডিসেম্বর। বাছাই, আপিল ও নিষ্পত্তি শেষে প্রত্যাহারের শেষ সময় ছিল ২০ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে ভোটের প্রচার শেষ হয় ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায়। অবশ্য এক প্রার্থীর মৃত্যুর পর শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে দেশের ২৯৯ আসনে ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং আরও ১০ লাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকবেন।
সারা দেশে দুই হাজার ২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ভোটাররা ২৯৯ জন জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এতে ৫০টি রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
কতজন ভোটার
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে (২৯৯ আসনে) মোট ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৫২২ জন ভোটার ভোট দেওয়ার যোগ্য। এর মধ্যে ছয় কোটি ৪৬ লাখ ২০ হাজার ৭৭ জন পুরুষ, ৬ কোটি ২৬ লাখ ৭৭ হাজার ২৩২ জন নারী এবং এক হাজার ২১৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার। ৩০০ আসনে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯।
কারা লড়াইয়ে
কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নিবন্ধন স্থগিত থাকায় ভোটে অংশ নিতে পারছে না আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জনের ৩০ বছর পর দলটি এবার নির্বাচনী লড়াইয়ে নেই। এবার মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে।
নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে এক হাজার ৭৫৫ জন রাজনৈতিক দলের মনোনীত এবং ২৭৩ জন স্বতন্ত্র। প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে নারী আছে ৪ শতাংশেরও কম; জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের কোনো নারী প্রার্থীই নেই।
বিএনপি সবচেয়ে বেশি ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে এবং আটটি আসনে জোটের প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীরা ২২৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং বাকি আসনগুলোতে দলটি তার নির্বাচনী মিত্রদের প্রার্থী করেছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে ২৫৩ জন, জাতীয় পার্টি থেকে ১৯২ জন, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ৯০ জন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে ৩২ জন প্রার্থী রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের অঙ্গীকার
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বুধবার শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
রাজধানীতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিদেশি সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে সিইসি বলেন, ‘‘আইনি সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি, অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ এবং পরিচালনাগত পরিকল্পনাসহ সমন্বিত ও বহুমাত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।” তিনি বলেন, ভোটগ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
সিইসি জানান, সঠিক পরিচয় যাচাইয়ের পরই ব্যালট ইস্যু করা হয় এবং নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী গোপনে ভোটগ্রহণ পরিচালিত হবে। নির্বাচনী বিরোধ প্রতিষ্ঠিত আইন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে। ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ১৬০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক সাংবাদিক স্বাধীনভাবে নির্বাচন কাভার করছেন।
পোস্টাল ভোট ও নতুন ব্যবস্থা
প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির উদ্দিন বলেন, প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে দেশের বাইরে ভোটের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে দেশে ও প্রবাসে মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধন করেছেন। আবার দেশেও পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে যোগ্য ভোটারদের জন্য ভোটগ্রহণ কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
২৯৯টি আসনে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনী দায়িত্বে রয়েছেন। আচরণবিধি বজায় রাখতে দুই হাজার ১০০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত রয়েছেন।
নিরাপত্তা সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন: এক লাখ সেনা সদস্য, পাঁচ হাজার নৌবাহিনীর সদস্য, তিন হাজার ৭৩০ জন বিমানবাহিনীর সদস্য দায়িত্বে থাকবেন। বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের তিন হাজার ৫৮৫, এক লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ, ৯ হাজার ৩৪৯ জন র্যাব এবং পাঁচ লাখ ৭০ হাজার আনসার-ভিডিপি সদস্য মাঠে থাকবেন।
মহানগরের বাইরে প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬–১৭ জন পুলিশ ও আনসার, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭–১৮ জন সদস্য মোতায়েন থাকবে। মহানগর এলাকায় সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন মোতায়েন থাকবে। ২৫ জেলার দুর্গম এলাকায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১৬–১৮ জন পুলিশ ও আনসার মোতায়েন থাকবে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, ১৩ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে প্রায় ৮৫০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী এগুলো নির্বাচনের সময় অপব্যবহারের জন্য আনা হয়েছিল।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণ
নির্বাচনের দিন পাঁচ ধরনের যানবাহনের চলাচল সীমিত থাকবে। এগুলো হলো: মোটরসাইকেল, ট্রাক, মাইক্রোবাস, ট্যাক্সিক্যাব। মোটরসাইকেলের চলাচল ১০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত সীমিত থাকবে।
পোস্টাল ভোট, পর্যবেক্ষক ও ফল ঘোষণা
বুধবার বিকেল পর্যন্ত ১১ লাখ ৩৮ হাজার ১৯২ জন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন, যার মধ্যে পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৩৭৬ জন প্রবাসী। ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৩১৮টি পোস্টাল ব্যালট এরই মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট ব্যালট বর্তমানে পথে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৪:৩০ মিনিটের মধ্যে না পৌঁছালে গণনা হবে না।
পোস্টাল ভোটদাতাদের মধ্যে রয়েছে ছয় লাখ ১১ হাজার ৮১৬ জন সরকারি কর্মচারী, পোলিং কর্মকর্তা ও কারাবন্দীরা।
মোট ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার, ৯৫৮ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার, ৪৩ হাজার ৭৮ জন প্রিজাইডিং অফিসার, দুই লাখ ৪৭ হাজার ৮৬২ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং পাঁচ লাখের বেশি পোলিং অফিসার ভোটের দায়িত্বে থাকবেন।
সরাসরি ভোটগ্রহণ হবে ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্রে এবং পোস্টাল ব্যালট গণনা হবে আরও ২৯৯টি কেন্দ্রে। সব মিলিয়ে ২৯৯টি আসনে মোট ৪২,৯৫৮টি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ সাধারণ এবং বাকি ৫০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—দুটোরই গণনা এক সাথে শুরু হবে।
নির্বাচন কমিশন আশা করছে, কয়েকটি দূরবর্তী কেন্দ্র ছাড়া অধিকাংশ ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যে পাওয়া যাবে।