Advertisement Banner

রিডার্স ব্লক কাটানোর ৮ কৌশল

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
রিডার্স ব্লক কাটানোর ৮ কৌশল
যারা গোগ্রাসে বই পড়েন, তারাও মাঝেমধ্যে রিডার্স ব্লকে আক্রান্ত হন। ছবি: ফ্রিপিক

বইপ্রেমীদের জীবনে এমন সময় আসা খুব স্বাভাবিক, যখন প্রিয় বইয়ের তাকটির দিকে তাকালেও ক্লান্তি লাগে। আমরা সবাই কমবেশি এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি—চোখের সামনে লেখাগুলো যেন ঝাপসা হয়ে আসে, কয়েক লাইন পড়াও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কিংবা হয়ত কোনো একটা বই হাতে তুলে নেওয়ার মতো মানসিক শক্তিই থাকে না। এই অবস্থাকেই বলা হয় ‘রিডার্স ব্লক’। এমনকি যারা গোগ্রাসে বই পড়েন, তারাও মাঝেমধ্যে এতে আক্রান্ত হন। তবে আশার কথা হলো, এটি কোনো চিরস্থায়ী রোগ নয়; বরং একটু সৃজনশীলতা আর কৌশলী প্রচেষ্টায় আবারও বইয়ের জগতে ফেরা সম্ভব।

শুরুটা যেন সহজ হয়

আপনার পড়ার অভ্যাস যদি কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে, তবে শুরুতেই লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ কিংবা জেমস জয়েসের মতো কোনো সাহিত্যিকের গুরুগম্ভীর ক্ল্যাসিক সাহিত্য দিয়ে শুরু করা ঠিক হবে না। অনেক সময় আমরা অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়ার ফাঁদে পা দেই। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এ সাংবাদিক ও সাহিত্যিক স্টুয়ার্ট জেফরিস লিখেছেন, “পাঠকদের প্রধান সমস্যা হলো আমরা লক্ষ্যটা অনেক উঁচুতে নির্ধারণ করি।”

রিডার্স ব্লক মূলত তৈরি হয় ‘কী করা উচিত’ আর ‘কী করা সম্ভব’—এই দুইয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব থেকে। আপনি হয়তো মনে করছেন বড় কোনো কালজয়ী সাহিত্য পড়া আপনার উচিত, কিন্তু আপনার মন তা গ্রহণ করার মতো অবস্থায় নেই। তাই নিজেকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে না দিয়ে ছোট এবং সহজে হজম করা যায় এমন কিছু দিয়ে শুরু করুন। একবার পড়ার ছন্দ ফিরে আসলে কঠিন বইগুলো পরে হাতে নেওয়া যাবে।

ছোটগল্পে সমাধান

একটি ৩০০ বা ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাসের বিশালতা অনেক সময় পাঠককে মানসিকভাবে পিছিয়ে দেয়। এই সমস্যার মোক্ষম সমাধান হলো ছোটগল্প। ২০১৫ সালে ‘লিটারারি লেডি’ নামে পরিচিত গিনি চেন ‘বার্নস অ্যান্ড নোবেল’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, রিডার্স ব্লকের সময় বিভিন্ন লেখকের ছোটগল্পের একটি সংকলন দিয়ে পড়া শুরু করা উচিত। এতে দুটি সুবিধা হয়। অল্প সময়ে একটি গল্প শেষ করার তৃপ্তি পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন লেখকের লেখনশৈলির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলে নিজের পছন্দের ধারাটি খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।

পরিচিত গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসুন

মাঝেমধ্যে নিয়মিত ধরাবাঁধা অভ্যাসে বদল আনা বেশ কাজে দেয়। আপনি হয়ত সব সময় থ্রিলার পড়েন, কিন্তু এখন আর তা টানছে না। সেক্ষেত্রে বিষয় পরিবর্তন করুন। এই নিয়ে মার্কিন ম্যাগাজিন বাসল-এ একবার লেখক শার্লট আলিন লিখেছিলেন যে, “মস্তিষ্ককে সচল রাখতে বইয়ের তালিকায় বৈচিত্র্য থাকা জরুরি।”

আয়ারডেল কাউন্টি পাবলিক লাইব্রেরির একটি ব্লগ পোস্টে বইপ্রেমী মিশেল কোলম্যান তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানান যে, তার রিডার্স ব্লকের সময় নন-ফিকশন বা তথ্যমূলক বই পড়া বেশ কাজে দিয়েছিল। তাই আপনি যদি রহস্য উপন্যাসে ক্লান্ত বোধ করেন, তবে কোনো হাস্যরসের বই ধরুন। কিংবা রোমান্টিক গল্পের বদলে ঐতিহাসিক কোনো সত্য ঘটনা পড়ে দেখতে পারেন। এই নতুনত্বই আপনার মনের জানলা খুলে দিতে পারে।

‘৬৯ নম্বর পৃষ্ঠা’র নিয়ম

রিডার্স ব্লক কাটাতে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক জন সাদারল্যান্ডের একটি অদ্ভুত কিন্তু কার্যকর পরামর্শ হলো—বইটির ৬৯ নম্বর পৃষ্ঠাটি পড়া। সাদারল্যান্ডের মতে, এই নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাটি পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন বইটির লেখনশৈলি বা বিষয়বস্তু আপনার রুচিসম্মত কি না। যদি ওই অংশটুকু ভালো না লাগে, তবে জোর করে পড়ার দরকার নেই। ভুল বই নির্বাচন অনেক সময় রিডার্স ব্লককে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে।

বই শেষ করতে না পারা কোনো ব্যর্থতা নয়। ছবি: ফ্রিপিক
বই শেষ করতে না পারা কোনো ব্যর্থতা নয়। ছবি: ফ্রিপিক

সব বই শেষ না করলেও চলে

অনেক পাঠক একটি বই শুরু করলে তা শেষ না করা পর্যন্ত অপরাধবোধে ভোগেন। এ নিয়ে দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন বলেছিলেন, “কিছু বই কেবল উপভোগ করার জন্য, কিছু গিলে ফেলার জন্য এবং হাতেগোনা কিছু বই চিবিয়ে হজম করার জন্য।”

অর্থাৎ, কিছু বই কেবল আংশিক পড়ার জন্যই তৈরি। বর্তমান বইটি হাতে নিলেই যদি আপনি অনীহা বোধ করেন, তবে নির্দ্বিধায় তা সরিয়ে রাখুন। বই শেষ করতে না পারা কোনো ব্যর্থতা নয়।

অডিওবুক

অনেকেই মনে করেন অডিওবুক শোনা আর বই পড়া এক বিষয় নয়। তবে ২০১৬ সালের এক গবেষণা বলছে, বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষেত্রে পড়ার চেয়ে অডিওবুক শোনার প্রভাব কোনো অংশে কম নয়। যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল লিটারেসি ট্রাস্ট’-এর পরিচালক জোনাথন ডগলাসের মতে, যখন পড়ার ক্ষমতা বা আগ্রহ কমে যায়, তখন কান দিয়ে গল্প শোনা আপনার কল্পনাশক্তিকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে পারে। গাড়ি চালানো বা শরীরচর্চার সময় অডিওবুক শুনলে সময়ও বাঁচে এবং পড়ার আগ্রহ ফিরে আসে।

ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্তি

আমাদের একাগ্রতা নষ্ট হওয়ার বড় কারণ ডিজিটাল ডোপামিন আসক্তি। নেটফ্লিক্স বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের সামনে সবকিছু প্রস্তুত করে পরিবেশন করে, ফলে মস্তিষ্কের কষ্ট করে কল্পনা করার প্রয়োজন হয় না। লেখক হিউ ম্যাকগুয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, বেডরুম থেকে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ সরিয়ে রাখতে। রাতের খাবারের পর টিভি না দেখে বা মোবাইল না ঘেঁটে একটি বই নিয়ে বসুন। ধীরে ধীরে এই ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতাই আপনাকে বইয়ের পাতায় গভীর মনোযোগ ফিরিয়ে দেবে।

পুরোনো প্রিয় বইয়ে ফিরে যাওয়া

যে বইটি আপনার খুব প্রিয়, তা তৃতীয় বা চতুর্থবার পড়ে ফেলতে পারেন। প্রিয় চরিত্রের জগতে পুনরায় ফিরে যাওয়া অনেক সময় মনের ক্লান্তি দূর করে। এছাড়া আপনার প্রিয় লেখকের অন্য বই খুঁজে পেতে বুক ব্রাউজ বা লিটারেচার ম্যাপ এর মতো অনলাইন টুলগুলো ব্যবহার করতে পারেন।

রিডার্স ব্লক কেবল একটি সাময়িক বিরতি, বই পড়ার শেষ নয়। জোর করে পড়ার চেয়ে পড়ার পরিবেশ এবং কৌশলে পরিবর্তন আনাই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখবেন, পৃথিবীতে বইয়ের অভাব নেই, শুধু আপনার মনের মতো বইটি খুঁজে নেওয়ার জন্য একটু ধৈর্য আর এই সহজ কৌশলগুলোর প্রয়োগ প্রয়োজন।

সম্পর্কিত