Advertisement Banner

বিষণ্নতা চিকিৎসায় নতুন আশা

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিষণ্নতা চিকিৎসায় নতুন আশা
প্রতীকী ছবি: ম্যাগনিফিক

বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। আর তার মধ্যে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো চিকিৎসা-প্রতিরোধী বিষণ্নতা বা ট্রিটমেন্ট-রেজিস্ট্যান্ট ডিপ্রেশন (টিআরডি)। প্রচলিত অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ও থেরাপি যেখানে কাজ করে না, সেখানে নতুন ধরনের চিকিৎসার খোঁজ বহুদিনের।

এই প্রেক্ষাপটে সাইকেডেলিক ওষুধ– বিশেষ করে সাইলোসাইবিন নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী সম্প্রতি এক নিবন্ধে লিখেছে, ব্রিটিশ বায়োটেক কোম্পানি কমপাস পাথওয়েস তাদের তৈরি সিনথেটিক সাইলোসাইবিন ওষুধ কম্প৩৬০-এর ওপর করা সর্বশেষ (লেট-স্টেজ) ট্রায়ালে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়ার দাবি করেছে।

এই গবেষণার মূল গুরুত্ব হলো, এটি সাইকেডেলিক ওষুধকে মূলধারার চিকিৎসা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বহু বছর ধরে এই ধরনের পদার্থগুলোকে বিতর্কিত, এমনকি অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ব্যবহার করলে এগুলো মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় কার্যকর হতে পারে, এমন ধারণা এখন শক্তিশালী হচ্ছে।

বিশ্বে প্রায় ১০ কোটির বেশি মানুষ এমন বিষণ্নতায় ভুগছেন যা প্রচলিত চিকিৎসায় সাড়া দেয় না। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত জরুরি। সাইলোসাইবিন, যা মূলত ‘ম্যাজিক মাশরুম’-এ পাওয়া যায়, মস্তিষ্কের সেরোটোনিন রিসেপ্টরের ওপর কাজ করে। এবং চিন্তাভাবনা ও অনুভূতির ধরণে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি রোগীদের মানসিক অবস্থায় দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

কমপাস পাথওয়েস-এর দুটি বড় ট্রায়ালে দেখা গেছে, ২৫ মিলিগ্রাম ডোজের সাইলোসাইবিন গ্রহণের পর অনেক রোগী মাত্র একদিনের মধ্যেই উন্নতির লক্ষণ দেখিয়েছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এক বা দুই ডোজের প্রভাব অন্তত ২৬ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে। এটি প্রচলিত অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ সাধারণ ওষুধগুলো নিয়মিত গ্রহণ করতে হয় এবং অনেক সময় কার্যকারিতা সীমিত থাকে।

তবে এই গবেষণার একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘ফাংশনাল আনব্লাইন্ডিং’ সমস্যা। অর্থাৎ, অংশগ্রহণকারীরা সহজেই বুঝতে পারেন তারা আসল ওষুধ পাচ্ছেন নাকি প্লাসিবো। এটি ফলাফলে পক্ষপাত তৈরি করতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে গবেষকরা একটি অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ১ মিলিগ্রাম ডোজকে ‘অ্যাকটিভ কন্ট্রোল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে অংশগ্রহণকারীরা পুরোপুরি নিশ্চিত না হন তারা কোন গ্রুপে আছেন। এই পদ্ধতি গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।

‘ম্যাজিক মাশরুম’-এ সাইলোসাইবিন পাওয়া যায়। ছবি: ব্রিটানিকা
‘ম্যাজিক মাশরুম’-এ সাইলোসাইবিন পাওয়া যায়। ছবি: ব্রিটানিকা

তবুও, এই সাফল্যের পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। এর আগে মার্কিন ফুড অ্যান্‌ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন(এফডিএ) ২০২৪ সালে এমডিএমএ-ভিত্তিক একটি থেরাপি অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ ছিল নিরাপত্তা ও গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ। ফলে সাইলোসাইবিনের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন একটি বড় অনিশ্চয়তা হিসেবে রয়ে গেছে।

বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের অধীনে এফডিএ কিছুটা অস্থির অবস্থায় রয়েছে বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এফডিএ প্রধান মার্টি মাকারি এই ওষুধকে দ্রুত পর্যালোচনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, পরে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে সেটি আটকে দেওয়া হয়। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই অনিশ্চয়তা পুরো সাইকেডেলিক চিকিৎসা ক্ষেত্রের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

নিরাপত্তার দিক থেকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। যদিও সাইলোসাইবিনের হৃদযন্ত্র বা যকৃতের ওপর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম, তবুও এটি একটি শক্তিশালী সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থ। ভুল ব্যবহার বা পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান ছাড়া গ্রহণ করলে ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি আসক্তি তৈরি করার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম, যা একটি ইতিবাচক দিক।

অন্যদিকে, এই চিকিৎসা পদ্ধতি সহজ বা সস্তা নয়। প্রতিটি সেশন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং পুরো সময় একজন প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি প্রয়োজন। শুধু ওষুধ গ্রহণই নয়, তার আগে ও পরে কাউন্সেলিং সেশনও বাধ্যতামূলক, যাতে রোগী তার অভিজ্ঞতা বুঝতে পারেন। ফলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ থেরাপিউটিক প্রক্রিয়া, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

ভবিষ্যতে খরচ কমানোর জন্য গ্রুপভিত্তিক থেরাপির ধারণা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তবে এটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে এই ধরনের চিকিৎসা চালু হলেও, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি কতটা বাস্তবসম্মত হবে তা একটি বড় প্রশ্ন।

এই পুরো উদ্যোগের পেছনে একটি ব্যক্তিগত গল্পও রয়েছে। কমপাস পাথওয়েস-এর প্রতিষ্ঠাতা জর্জ গোল্ডস্মিথ এবং তার স্ত্রী একাতেরিনা মালিয়েভস্কাইয়া তাদের সন্তানের মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় সাইলোসাইবিন ব্যবহার করে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পান। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তারা ২০১৬ সালে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই মানবিক দৃষ্টিকোণটি পুরো গবেষণাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

সামগ্রিকভাবে, সাইলোসাইবিন-ভিত্তিক চিকিৎসা মানসিক স্বাস্থ্য খাতে একটি সম্ভাবনাময় বিপ্লবের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, নিরাপত্তা যাচাই ও ব্যয় সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করা জরুরি। যদি এই বাধাগুলো কাটিয়ে ওঠা যায়, তাহলে এটি শুধু বিষণ্নতা নয়, উদ্বেগ, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারসহ অন্যান্য মানসিক সমস্যার চিকিৎসায়ও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, সাইকেডেলিক ওষুধের এই অগ্রগতি একদিকে যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি সতর্কতারও দাবি রাখে। বিজ্ঞান, নীতি ও মানবিক বিবেচনার সমন্বয়েই এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।

সম্পর্কিত