প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী

১২ মে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস। সারা দেশে যথাযথ মর্যাদা, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও পেশাগত সম্মানের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস পালিত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের নানা আয়োজনে দিবসটি স্মরণ করা হলেও এর আড়ালে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে-নার্সদের প্রকৃত পেশাগত অবস্থান কি যথাযথভাবে স্বীকৃত হচ্ছে?
একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল চিকিৎসক বা হাসপাতাল ভবনের উপর নির্ভর করে না; বরং এর প্রাণশক্তি হলো নার্সিং সেবা। রোগীর জীবন-মৃত্যুর সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়ে যে পেশাজীবী সবচেয়ে বেশি সময় রোগীর পাশে থাকেন, তিনি একজন নার্স।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাণশক্তি নার্সিং
নার্সিং পেশা কোনো সহায়ক কাজ নয়; এটি একটি স্বাধীন, ক্লিনিক্যাল এবং জীবনরক্ষাকারী পেশা। রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নার্সের ভূমিকা অপরিহার্য।
একজন নার্স রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। ওষুধ প্রয়োগ নিশ্চিত করেন। ইনজেকশন ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করেন। রোগীর মানসিক সাপোর্ট দেন। জরুরি অবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নার্সকে এখন ‘ক্লিনিক্যাল ডিসিশন মেকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কারণ অনেক সময় রোগীর অবস্থার প্রথম পরিবর্তন চিকিৎসকের আগে নার্সই শনাক্ত করেন।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও রোগী নিরাপত্তা
আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার ও জরুরি বিভাগে নার্সদের ভূমিকা সরাসরি জীবন রক্ষার সঙ্গে জড়িত।
একজন দক্ষ নার্স বুঝতে পারেন-রোগীর অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমছে, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে
সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে, এই দ্রুত শনাক্তকরণই অনেক সময় রোগীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে।
রোগী নিরাপত্তা গবেষণায় দেখা গেছে—যে হাসপাতালে নার্স-রোগী অনুপাত ভালো, সেখানে মৃত্যুহার ও জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কেয়ার গিভার বনাম নার্সিং-একটি নীতিগত সীমারেখা
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ‘কেয়ার গিভার’ তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীর সেবায় এটি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন এটিকে পেশাদার নার্সিংয়ের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
একজন নার্সের কাজের পরিধি:
অন্যদিকে কেয়ার গিভার মূলত সহায়ক সেবা প্রদান করেন। এই দুই পেশার মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট করলে তা রোগীর নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সংকট
বাংলাদেশে হাজার হাজার শিক্ষিত নার্স তৈরি হচ্ছেন-ডিপ্লোমা, বিএসসি এবং উচ্চতর ডিগ্রিধারী। কিন্তু বাস্তবতা হলো—
পর্যাপ্ত সরকারি নিয়োগ নেই।
বেসরকারি খাতে স্বল্প বেতন, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি-এই পরিস্থিতি দেশের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা।
অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে নার্সদের উচ্চ চাহিদা রয়েছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে নার্সদের সম্মানজনক বেতন ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।
নীতিগত সংকট ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা
যদি একটি দেশে দক্ষ নার্স তৈরি হয় কিন্তু তাদের কর্মক্ষেত্র সংকুচিত হয়, তবে তা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়-এটি একটি জাতীয় নীতিগত ব্যর্থতা। কেয়ার গিভার ব্যবস্থাকে যদি ভুলভাবে সম্প্রসারণ করা হয়, তাহলে- নার্সদের চাকরি সংকুচিত হবে। রোগী নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। স্বাস্থ্যসেবার মান কমে যাবে। দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে যাবে
আন্তর্জাতিক তুলনা
উন্নত দেশগুলোতে নার্সিংকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাজ্যে নার্সরা স্বাধীন ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কানাডায় নার্স প্র্যাকটিশনাররা চিকিৎসার অনেক দায়িত্ব পালন করেন। অস্ট্রেলিয়ায় নার্সিংকে উচ্চ মর্যাদার পেশা হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশ এখনো সেই কাঠামোর তুলনায় পিছিয়ে।
একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনোই নার্সিং ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। কেয়ার গিভার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু কখনোই পেশাদার নার্সের বিকল্প নয়। আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ কি নার্সিংকে শক্তিশালী করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে উন্নত করবে, নাকি স্বল্পমেয়াদি বিকল্প কাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করবে? নার্সিংকে অবমূল্যায়ন করা মানে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নীতি নির্ধারণীর ক্ষেত্রে নার্সদের অংশগ্রহণ এখন একান্তই প্রয়োজন।
লেখক: নার্সিং শিক্ষাবিদ ও সাবেক অধ্যক্ষ রুফাইদা কলেজ অব নার্সিং, মোহাম্মদপুর ঢাকা।

১২ মে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস। সারা দেশে যথাযথ মর্যাদা, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও পেশাগত সম্মানের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস পালিত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের নানা আয়োজনে দিবসটি স্মরণ করা হলেও এর আড়ালে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে-নার্সদের প্রকৃত পেশাগত অবস্থান কি যথাযথভাবে স্বীকৃত হচ্ছে?
একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল চিকিৎসক বা হাসপাতাল ভবনের উপর নির্ভর করে না; বরং এর প্রাণশক্তি হলো নার্সিং সেবা। রোগীর জীবন-মৃত্যুর সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়ে যে পেশাজীবী সবচেয়ে বেশি সময় রোগীর পাশে থাকেন, তিনি একজন নার্স।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাণশক্তি নার্সিং
নার্সিং পেশা কোনো সহায়ক কাজ নয়; এটি একটি স্বাধীন, ক্লিনিক্যাল এবং জীবনরক্ষাকারী পেশা। রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নার্সের ভূমিকা অপরিহার্য।
একজন নার্স রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। ওষুধ প্রয়োগ নিশ্চিত করেন। ইনজেকশন ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করেন। রোগীর মানসিক সাপোর্ট দেন। জরুরি অবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নার্সকে এখন ‘ক্লিনিক্যাল ডিসিশন মেকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কারণ অনেক সময় রোগীর অবস্থার প্রথম পরিবর্তন চিকিৎসকের আগে নার্সই শনাক্ত করেন।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও রোগী নিরাপত্তা
আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার ও জরুরি বিভাগে নার্সদের ভূমিকা সরাসরি জীবন রক্ষার সঙ্গে জড়িত।
একজন দক্ষ নার্স বুঝতে পারেন-রোগীর অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমছে, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে
সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে, এই দ্রুত শনাক্তকরণই অনেক সময় রোগীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে।
রোগী নিরাপত্তা গবেষণায় দেখা গেছে—যে হাসপাতালে নার্স-রোগী অনুপাত ভালো, সেখানে মৃত্যুহার ও জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কেয়ার গিভার বনাম নার্সিং-একটি নীতিগত সীমারেখা
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ‘কেয়ার গিভার’ তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীর সেবায় এটি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন এটিকে পেশাদার নার্সিংয়ের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
একজন নার্সের কাজের পরিধি:
অন্যদিকে কেয়ার গিভার মূলত সহায়ক সেবা প্রদান করেন। এই দুই পেশার মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট করলে তা রোগীর নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সংকট
বাংলাদেশে হাজার হাজার শিক্ষিত নার্স তৈরি হচ্ছেন-ডিপ্লোমা, বিএসসি এবং উচ্চতর ডিগ্রিধারী। কিন্তু বাস্তবতা হলো—
পর্যাপ্ত সরকারি নিয়োগ নেই।
বেসরকারি খাতে স্বল্প বেতন, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি-এই পরিস্থিতি দেশের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা।
অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে নার্সদের উচ্চ চাহিদা রয়েছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে নার্সদের সম্মানজনক বেতন ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।
নীতিগত সংকট ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা
যদি একটি দেশে দক্ষ নার্স তৈরি হয় কিন্তু তাদের কর্মক্ষেত্র সংকুচিত হয়, তবে তা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়-এটি একটি জাতীয় নীতিগত ব্যর্থতা। কেয়ার গিভার ব্যবস্থাকে যদি ভুলভাবে সম্প্রসারণ করা হয়, তাহলে- নার্সদের চাকরি সংকুচিত হবে। রোগী নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। স্বাস্থ্যসেবার মান কমে যাবে। দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে যাবে
আন্তর্জাতিক তুলনা
উন্নত দেশগুলোতে নার্সিংকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাজ্যে নার্সরা স্বাধীন ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কানাডায় নার্স প্র্যাকটিশনাররা চিকিৎসার অনেক দায়িত্ব পালন করেন। অস্ট্রেলিয়ায় নার্সিংকে উচ্চ মর্যাদার পেশা হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশ এখনো সেই কাঠামোর তুলনায় পিছিয়ে।
একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনোই নার্সিং ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। কেয়ার গিভার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু কখনোই পেশাদার নার্সের বিকল্প নয়। আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ কি নার্সিংকে শক্তিশালী করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে উন্নত করবে, নাকি স্বল্পমেয়াদি বিকল্প কাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করবে? নার্সিংকে অবমূল্যায়ন করা মানে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নীতি নির্ধারণীর ক্ষেত্রে নার্সদের অংশগ্রহণ এখন একান্তই প্রয়োজন।
লেখক: নার্সিং শিক্ষাবিদ ও সাবেক অধ্যক্ষ রুফাইদা কলেজ অব নার্সিং, মোহাম্মদপুর ঢাকা।

আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, অনিয়মিত খাবার আর ঘুমের ঘাটতি–নিত্যদিনের এসব অভ্যাসই নীরবে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে হৃদস্বাস্থ্যকে। তবে বড় কোনো পরিবর্তন নয়, দিনের ছোট ছোট কিছু নিয়মই এই ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।