Advertisement Banner

বাজেট কী, কোথা থেকে এল?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাজেট কী, কোথা থেকে এল?
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

বাজেট কথাটি মাথায় এলেই প্রথমে আয় ও ব্যয়ের একটি নকশা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নতি ও মঙ্গল সাধনই হলো বাজেট প্রণয়নের আসল লক্ষ্য। তবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বাজেট এবং রাষ্ট্রীয় বাজেটের কৌশলের মধ্যে এক মৌলিক তফাত রয়েছে। একজন সাধারণ মানুষ সাধারণত তার আয়ের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে খরচের পরিকল্পনা সাজান। বিপরীতে, সরকার প্রথমে ব্যয়ের খাতগুলো ঠিক করে এবং পরবর্তীতে সেই অর্থ সংস্থানের জন্য আয়ের উৎসগুলো খুঁজে বের করে।

কিন্তু বাজেট শব্দটি এল কোথা থেকে?

বাজেট শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ bougette (বুজেত) থেকে, যার অর্থ চামড়ার থলি। ধীরে ধীরে শব্দটি দিয়ে ব্যাগ এবং ব্যাগের ভেতরের জিনিস- উভয়কেই বোঝানো শুরু হয়।

বাজেটের ধারণাটি ১৭৬০ সালে ইংল্যান্ডে শুরু হয়। তখন অর্থমন্ত্রী প্রতি বছর সংসদে জাতীয় বাজেট পেশ করতেন। এর মূল লক্ষ্য ছিল রাজার অতিরিক্ত কর আদায়ের ক্ষমতা কমানো এবং সরকারি খরচ নিয়ন্ত্রণ করা। ১৮৩৭ সালে একটি সংস্কার আইনের মাধ্যমে এই বাজেট ব্যবস্থা আরও উন্নত হয়।

বাজেট কেন দেওয়া হয়?

একটি বাজেটের মূল উদ্দেশ্য হলো উৎপাদন বৃদ্ধি, দেশের উন্নয়ন এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। বাজেটের বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়, অন্যদিকে উন্নয়নের গতিকে আরও বেগবান করার লক্ষ্য থাকে। জাতীয় বাজেট মূলত সরকারের আগামী এক বছরের একটি বিস্তারিত আর্থিক পরিকল্পনা, যা রাষ্ট্রের নীতির সাথে জনগণের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। এই সুনির্দিষ্ট আয়-ব্যয়ের রূপরেখা দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের ধারাকে সচল রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড, নতুন কর প্রস্তাব, প্রশাসনিক ব্যয় এবং বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র এই বাজেটে ফুটে ওঠে।

বাজেট কত প্রকার?

বাজেট সাধারাণত ৩ প্রকার। সুষম বাজেট, উদ্বৃত্ত বাজেট ও ঘাটতি বাজেট।

সুষম বাজেট

যখন একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় এবং প্রত্যাশিত আয় সমান হয়, তখন তাকে সুষম বাজেট বলা হয়। ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদদের মতে, আয়ের অতিরিক্ত ব্যয় করা সরকারের উচিত নয়—এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই এ ধরনের বাজেট প্রণীত হয়। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কাগজে-কলমে আয়-ব্যয়ের এই সমতা রক্ষা করা সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা বেশ কঠিন। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, অব্যাহতভাবে সুষম বাজেট তৈরি করা ভালো কিছু নয়। বরং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বাজেট কেমন হবে ঠিক করা উচিত। কেননা, সুষম বাজেট সুদের হার কমায়, বাড়ায় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ। এ ছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি এগিয়ে যায়।

উদ্বৃত্ত বাজেট

যদি সরকারের পরিকল্পিত ব্যয়ের তুলনায় আয়ের পরিমাণ বেশি হয়, তবে তাকে উদ্বৃত্ত বাজেট বলে। এর অর্থ হলো, রাষ্ট্র জনকল্যাণে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করছে, কর ও অন্যান্য খাত থেকে তার চেয়ে বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করছে। বাজার থেকে অতিরিক্ত চাহিদা কমিয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এই বাজেট কার্যকর হতে পারে। তবে মন্দা বা অর্থনৈতিক স্থবিরতার সময় এটি উপযোগী নয়। এই বাড়তি অর্থ দিয়ে সরকার পুরনো ঋণ পরিশোধ করতে পারে, যা ভবিষ্যতে সুদের বোঝা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করে।

আগামী ৭ জুন বাজেট অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
আগামী ৭ জুন বাজেট অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

ঘাটতি বাজেট

একটি অর্থবছরে সরকারের উপার্জনের চেয়ে যখন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বড় হয়ে যায়, তখন তাকে ঘাটতি বাজেট বলা হয়। এই বাজেটের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর জন্য সরকারের হাতে পর্যাপ্ত নিজস্ব তহবিল থাকে না। ফলে এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি বাজেট করে আসছে এবং তা পূরণে সরকার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে কিছুটা ঘাটতি থাকা ভালো। এতে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে, ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে। তাতে অর্থনীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। ঘাটতি বেশি থাকাটা আবার ভালো নয়।

সরকারের আয়-ব্যয়

রাষ্ট্রীয় ব্যয়কে মূলত দু'টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়- রাজস্ব ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়। রাজস্ব ব্যয়ের লক্ষ্য হলো প্রশাসনের দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বজায় রাখা। অন্যদিকে, দেশের অবকাঠামোগত অগ্রগতি যেমন- রাস্তাঘাট, সেতু নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসারে যে অর্থ খরচ হয়, তা উন্নয়ন ব্যয় হিসেবে পরিচিত।

সরকার তার পরিকল্পিত ব্যয় মেটাতে প্রধানত তিনটি খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করে-

প্রত্যক্ষ কর (ব্যক্তিপর্যায়ের আয়কর বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর), পরোক্ষ কর (ভ্যাট), আমদানি-রপ্তানি শুল্ক ও আবগারি কর ও কর-বহির্ভূত আয় (সরকারি সংস্থার অর্জিত লভ্যাংশ, প্রশাসনিক ফি, জরিমানা এবং ইজারা থেকে প্রাপ্ত অর্থ)।

বাজেট কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আগামী এক বছরে কোন পণ্যের দাম কমবে বা বাড়বে এবং বাজার কোন দিকে যাবে, তার অনেক তথ্য বাজেটে থাকে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে। দেশের অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে বাজেট একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তাই সচেতন নাগরিক হিসেবে বাজেটের খুঁটিনাটি খবর রাখা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন।

সম্পর্কিত