Advertisement Banner

ন্যাটো ছাড়তে গণভোটে যাচ্ছে স্লোভেনিয়া

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ন্যাটো ছাড়তে গণভোটে যাচ্ছে স্লোভেনিয়া
ব্রাসেলসে ন্যাটো সদর দপ্তর। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটো এখন তার ইতিহাসের অন্যতম গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি। আরটি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে স্লোভেনিয়ার নবনির্বাচিত পার্লামেন্ট স্পিকার ঘোষণা করেছেন যে, তার দেশ ন্যাটো থেকে বেরিয়ে আসার প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করতে যাচ্ছে।

ওয়াশিংটন নিজেই জোট থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আর এরই মধ্যে একটি সদস্য রাষ্ট্রের সংসদের শীর্ষ পদাধিকারী ব্যক্তির এই ঘোষণা ৩২ সদস্যের এই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ট্রুথ পার্টির নেতা জোরান স্টেভানোভিচ গত সপ্তাহে স্লোভেনিয়ার নিম্নকক্ষের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সরকারি সম্প্রচার সংস্থা আরটিভিএসএলও-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ন্যাটো ত্যাগের প্রশ্নে গণভোট আয়োজন ছিল তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং তিনি তা পালন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার ভাষায়, “আমরা জনগণের কাছে ন্যাটো ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে গণভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম এবং আমরা এই গণভোট আয়োজন করব।”

স্টেভানোভিচ এর পাশাপাশি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি অদূর ভবিষ্যতে মস্কো সফর করতে পারেন। তিনি বলেছেন, পশ্চিম ও পূর্বের মধ্যে যে দেওয়াল তোলা হয়েছে তা বাদ দিয়ে সব দেশের সাথে সেতু গড়তে ও সুসহযোগিতা করতে তিনি আগ্রহী।

স্লোভেনিয়ার এই গণভোটের ঘোষণা এমন একটি প্রেক্ষাপটে এসেছে যখন ন্যাটোর ভেতরে ফাটল ক্রমশ বড় হচ্ছে। ইউরোপের সদস্যরাষ্ট্রগুলো ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকার করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় অংশীদারদের বারবার আক্রমণ করেছেন। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে কাপুরুষ এবং জোটকে কাগুজে বাঘ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ন্যাটোতে মার্কিন সদস্যপদ পুনর্বিবেচনার অযোগ্য বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। এর পাশাপাশি সহযোগী সদস্যরাষ্ট্র ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড সংযুক্ত করার ট্রাম্পের প্রতিনিয়ত হুমকি জোটের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব ইয়েন্স স্টোলটেনবার্গ জোর দিয়ে বলেছেন, ট্রাম্পের জোট থেকে সরে যাওয়ার হুমকিগুলোকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। তিনি বলেছেন, ন্যাটো চিরকাল থাকবে এমন কোনো প্রকৃতির নিয়ম নেই বা জোটটি পরবর্তী দশ বছর টিকে থাকবে তার নিশ্চয়তাও নেই। একজন সাবেক মহাসচিবের মুখে এই স্বীকারোক্তি পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামো কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে তার ইঙ্গিত দেয়।

এই বিভাজন ইউরোপীয় দেশগুলিকে একটি ইউরোপীয় ন্যাটো-র বিকল্প পরিকল্পনায় চুপচাপ কাজকে ত্বরান্বিত করতে বাধ্য করেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তার ভূমিকা কমিয়ে দিলে বা সম্পূর্ণ বেরিয়ে গেলে জোটের বিদ্যমান সামরিক কাঠামো ব্যবহার করে মহাদেশে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে তৈরি করছেন।

মস্কো এই পরিস্থিতিতে নিজস্ব মূল্যায়ন জানিয়েছে। রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেই পূর্ণ সামরিক সত্তায় পরিণত হলে তা কোনো কোনো দিক থেকে ন্যাটোর চেয়েও খারাপ হবে। তার বক্তব্য, ব্রাসেলস মস্কোর বিরুদ্ধে একটি বড় মাপের সামরিক প্রস্তুতির জন্য রুশোফোবিক উন্মাদনা উসকে দিয়ে চলেছে।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এর পাশাপাশি অনুমান করেছেন যে, ন্যাটো থেকে সরে যাওয়ার মার্কিন হুমকি আসলে রাশিয়াকে ঠেকানোর মূল দায়িত্ব ইউরোপের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের নিজস্ব হাত মুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে নতুন পরিকল্পনা হতে পারে।

মস্কো বারবার ন্যাটো বা ইইউ দেশগুলিতে আক্রমণের কোনো ইচ্ছা নেই বলে দাবি করে আসছে। রাশিয়ার যুক্তি হলো, এই ধরনের দাবি দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে অস্ত্র শিল্পে বিশাল বিনিয়োগ ন্যায়সংগত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে, স্লোভেনিয়ার এই গণভোটের ঘোষণা শুধু একটি ছোট দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়। এটি একটি বৃহত্তর ও গভীরতর পরিবর্তনের লক্ষণ। ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ, ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রত্যাখ্যান এবং মার্কিন প্রত্যাহারের হুমকি একসাথে ন্যাটোকে এমন একটি মোড়ে নিয়ে এসেছে যেখানে জোটটির চরিত্র ও অস্তিত্ব–উভয়ই প্রশ্নের মুখে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ হিসেবে গড়ে ওঠা এই জোট আগামীতে কোন রূপ ধারণ করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন ঝুলে আছে অনিশ্চয়তার মধ্যে।

সম্পর্কিত