কেন ইরানে হামলা নাও করতে পারে আমেরিকা

কেন ইরানে হামলা নাও করতে পারে আমেরিকা
আমেরিকার একটি যুদ্ধবিমান। ছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলার সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় উৎসাহিত হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থার হুমকি দিচ্ছেন। এমন এক সময়ে এই হুমকি আসছে, যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ধর্মীয় শাসকরা গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভের মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের এই বারবার সতর্কবার্তা ওয়াশিংটনে একটি পরিচিত প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে ইরানে আমেরিকার হস্তক্ষেপ আসলে দেখতে কেমন হবে? বিশেষ করে যখন এই অঞ্চলে অতীতে আমেরিকার নেওয়া পদক্ষেপগুলো খুব একটা সফল হয়নি।

প্রেসিডেন্টের যুদ্ধংদেহী মনোভাব সত্ত্বেও পেন্টাগন এখন পর্যন্ত ওই অঞ্চলে কোনো বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেনি। আমেরিকার উপসাগরীয় মিত্ররাও ইরানের ওপর মার্কিন হামলার জন্য নিজেদের মাটি ছেড়ে দিতে খুব একটা আগ্রহী নয়। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানি বিমান হামলায় তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মার্কিন সামরিক হামলা উল্টো সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইরান সরকারকে অভ্যন্তরীণ সমর্থন পেতে সহায়তা করতে পারে। মার্কিন হামলা বিক্ষোভকে ‘বিদেশি চক্রান্ত’ হিসেবে প্রমাণ করতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকা হামলা করলে তা বাহ্যিক হুমকির বিরুদ্ধে ইরানের আঞ্চলিক জোটকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।

লজিস্টিক বা কৌশলগত সমস্যা
ট্রাম্প ইরানি শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের কথা বললেও ওই অঞ্চলে কোনো সামরিক পূর্ব-প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না। ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সেনা উপস্থিতি কমিয়েছে আমেরিকা, যা সামরিক বিকল্পগুলোকে আরও সীমিত করে দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

গত অক্টোবর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কোনো বিমানবাহী রণতরী নেই। গ্রীষ্মকালে ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’কে ক্যারিবীয় অঞ্চলে এবং শরতে ‘ইউএসএস নিমিৎস’কে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, ইরানের লক্ষ্যবস্তু বা খামেনির ওপর কোনো বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে হবে তাদের।

সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে কাতার, বাহরাইন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি নিতে হবে। একই সাথে এসব দেশ ও ঘাঁটিগুলোকে ইরানের পাল্টা হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

দ্বিতীয় বিকল্প হতে পারে গত জুনে ইরানের ফোরদো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্রে চালানো দূরপাল্লার বি-২ বোমারু বিমানের মতো হামলা। কিন্তু জনবহুল শহুরে এলাকায় এ ধরনের হামলা ভয়াবহ প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও আমেরিকা তার মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো ব্যবহার না-ও করে, তবুও ইরানি নেতারা হুমকি দিয়েছেন যে, আক্রান্ত হলে তারা মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজগুলোতে হামলা চালাবে।

ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেহরান সীমিত আকারে ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা ধরে রেখেছে বলে জানা গেছে। ইরানের প্রধান উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো পাহাড়ের নিচে সুরক্ষিত রয়েছে এবং তেহরান সেগুলো পুনর্নির্মাণ করছে। দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, একসাথে নিক্ষেপ করলে যা মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম।

লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের জটিলতা
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো হামলার লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা। ইরানি প্রশাসনের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করা কঠিন না হলেও বর্তমান বিক্ষোভ এবং আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থাপনা চিহ্নিত করা গেলেও জনবহুল এলাকায় হামলার নির্ভুলতা বজায় রাখা সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জ, যেখানে বেসামরিক নাগরিক হতাহতের স্পষ্ট ঝুঁকি থাকে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। ছবি: রয়টার্স
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। ছবি: রয়টার্স

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৫৩ সালে ইরানে অভ্যুত্থান ঘটায় আমেরিকা। এই ইতিহাসের কারণে ইরান সরকার যেকোনো মার্কিন হামলাকে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। বর্তমানে খামেনি সরকার সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় না হলেও তারা দুর্বল নয়; বিশেষ করে গত জুনে ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী হামলার মধ্যেও তারা টিকে গিয়েছিল।

থিংক ট্যাংক ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট’-এর সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট রোকসানে ফারমানফারমাইয়ান দ্য গার্ডিয়ান-কে বলেন, “ইরানে স্পষ্টতই একটি সুসংহত সরকার, সামরিক ও নিরাপত্তা পরিষেবা রয়েছে।”

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি খামেনির ওপর হামলার কথা বিবেচনা করতে পারে। তবে অন্য কোনো দেশের নেতাকে হত্যা করা অনেক আইনি প্রশ্ন তুলবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামরিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে। এ ছাড়া এতে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও কম। কারণ, ইরানি নেতা ইতোমধ্যে তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তিনজন জ্যেষ্ঠ আলেমের একটি তালিকা তৈরি করে রেখেছেন।

সম্পর্কিত