Advertisement Banner

ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ক্ষমতা কতটুকু

ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ক্ষমতা কতটুকু
ছবি: রয়টার্স

নানা দিক থেকে প্রতিবেশী ভারত বৈচিত্র্যময় এক দেশ। বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশটির জন্য কার্যকর শাসনব্যবস্থা নিশ্চিতে দেশটির সংবিধানে ক্ষমতার সুনিপুণ বণ্টন করা হয়েছে। এখানে কারো হাতে একক কোনো ক্ষমতা নেই। ভারতের সংবিধান অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের হাতে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।

ভারতীয় সংবিধানের ২৪৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধান দুই স্তরের সরকারের ভূমিকা, ক্ষমতা ও দায়িত্ব স্পষ্ট ভাগ করে দিলেও কেন্দ্র বনাম রাজ্য, এখনো ভারতের রাজনীতিতে উপস্থিত।

মূলত শাসনব্যবস্থাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত এবং নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত—উভয় স্তরেই শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে এই ক্ষমতার বিভাজন করা হয়েছে। এখানে রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট রাজ্য বা অঞ্চলের প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করে, আর কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করে জাতীয় পর্যায়ের শাসনব্যবস্থা। বর্তমানে ভারতে ২৮টি রাজ্য ও আটটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে।

ভারতের সংবিধানের ২৪৫ থেকে ২৫৫ অনুচ্ছেদে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এরমধ্যে কেন্দ্র ও রাজ্যের আইনের ভৌগোলিক প্রযোজ্যতা, আইন প্রণয়নের বিষয়বস্তুর বণ্টন, রাজ্যের ক্ষেত্রেও সংসদের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা এবং রাজ্যের আইন প্রণয়নের ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো রয়েছে।

এখতিয়ার ও ক্ষমতা

রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটি মূলত তাদের এখতিয়ার বা ভৌগোলিক সীমানার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। রাজ্য সরকারগুলো দেশের একটি নির্দিষ্ট রাজ্য বা অঞ্চলের শাসনকাজ পরিচালনার ক্ষমতা রাখে। আর কেন্দ্রীয় বা ইউনিয়ন সরকার পুরো দেশ বা জাতীয় স্তরে কাজ করে এবং দেশের ওপর তাদের কর্তৃত্ব বজায় থাকে।

আইন প্রণয়নের ক্ষমতা

ভারতের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আইনসভা লোকসভা ও রাজ্যসভা নিয়ে গঠিত। ভারতের পার্লামেন্ট বা আইন পরিষদ দুই কক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষের নাম ‘রাজ্যসভা’ ও নিম্নকক্ষের নাম ‘লোকসভা’। রাজ্যসভার সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা ২৫০। লোকসভার বর্তমান সদস্য ৫৪৩ জন।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ছবি: রয়টার্স
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ছবি: রয়টার্স

ভারতের জাতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নাম যেমন ‘লোকসভা’; তেমনি, একটি রাজ্যের আইন পরিষদের নিম্নকক্ষের নাম ‘বিধানসভা’। বিধানসভায় নির্বাচিত রাজনৈতিক দল আনুপাতিক হারে রাজ্যসভায় সদস্য পদ পায়। একেকটি রাজ্যের বিধানসভার সদস্য কত হবে, তা নির্ভর করে সেই রাজ্যের জনসংখ্যার ওপর।

ভারতের আইন সভার উচ্চকক্ষ ‘রাজ্যসভা’কে স্থায়ী কক্ষ বলা হয়। যেহেতু রাজ্যসভার সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না, তাই তাদের নিয়ে আলোচনা কম। তবে যেকোনো আইন প্রণয়নে রাজ্যসভার গুরুত্ব লোকসভার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

সংবিধান অনুযায়ী, অর্থ বিল কেবল লোকসভাতেই পাস করা যায়। রাজ্যসভা রাজ্যগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও, সেখানে প্রতিনিধিত্বের তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাবই বেশি কার্যকর হয়।

অন্যদিকে, অধিকাংশ রাজ্যের বিধানসভা এককক্ষবিশিষ্ট। তবে কিছু রাজ্যে বিধান পরিষদ নামে একটি উচ্চকক্ষ রয়েছে। তবুও বিধান পরিষদ সাধারণত তুলনামূলকভাবে কম ক্ষমতাসম্পন্ন এবং বিধানসভা-নির্ভর ভূমিকা পালন করে।

সংবিধানের সপ্তম তফসিলে বর্ণিত তালিকা অনুযায়ী, রাজ্য সরকারগুলো কেবল ‘রাজ্য তালিকা’ভুক্ত বিষয়। যেমন-পুলিশ প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার এবং কৃষির ওপর আইন তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় যেমন- নাগরিকত্ব, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি, বৈদেশিক ঋণ, ব্যাংকিং, ট্যাক্স, এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে আইন প্রণয়ন করে।

তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ‘যুগ্ম ক্ষমতা’ নামে আরও একটি বিশেষ ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারই ক্ষমতা চর্চা করতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বর্তমানে ৪৭ টি বিষয় এই যুগ্ম তালিকায় আছে।

কিন্তু কোনো বিষয়ে যদি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আইনের মধ্যে বৈপরীত্য বা বিরোধ তৈরি হয়, তবে সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।

প্রশাসন

ভারতের সংবিধানের ২৫৬ থেকে ২৬৩ অনুচ্ছেদে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে প্রশাসনিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। রাজ্য সরকারের নির্বাহী প্রধান হলেন মুখ্যমন্ত্রী, যিনি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শাসন ও রাজস্ব ব্যয়ের তদারকি করেন। প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব আইনসভা থাকে যারা নিজ অঞ্চলের জন্য বিশেষ আইন প্রণয়ন করে।

বিপরীতে, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি পুরো দেশের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের রয়েছে লোকসভা ও রাজ্যসভা নিয়ে গঠিত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা। কেন্দ্রীয় সরকার যেমন জাতীয় বাজেট ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে রাজ্য সরকারগুলোর ওপর নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণও বজায় রাখে।

শাসন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব রাজ্যের, কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দেশ দিতে পারেন। গুরুতর অপরাধে কেন্দ্রীয় সংবাদ সিবিআই রাজ্যের অনুমতি ছাড়াই তদন্ত শুরু করতে পারে না। এখানে জটিলতা আছে। আর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে রাজ্য কার্যত কেন্দ্রের অধীনস্থ হয়ে পড়ে।

আয়ের উৎস

ভারতের সংবিধানের ২৬৮, ২৬৯ ও ২৭০ অনুচ্ছেদে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে কর রাজস্ব বণ্টনের নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান আয়ের উৎসগুলো হলো আয়কর, করপোরেট ট্যাক্স, কাস্টমস ডিউটি ও জিএসটির কেন্দ্রীয় অংশ। অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের আয়ের প্রধান খাতগুলো হলো জিএসটির রাজ্য অংশ, স্ট্যাম্প ডিউটি, বাণিজ্যিক কর এবং ভূমি রাজস্ব।

তবে রাজ্যগুলোর আয়ের সিংহভাগই নির্ভর করে কেন্দ্রীয় অনুদান ও অর্থ কমিশনের সুপারিশের ওপর। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গঠিত অর্থ কমিশন কেন্দ্রীয় করের একটি নির্দিষ্ট অংশ রাজ্যগুলোর মধ্যে বণ্টন করে দেয়।

অনুচ্ছেদ ২৬৮ অনুযায়ী, কিছু কর কেন্দ্র আরোপ করলেও তা আদায় ও ব্যবহার করে রাজ্য সরকার। উদাহরণ হিসেবে স্ট্যাম্প ডিউটি উল্লেখযোগ্য। তবে অনুচ্ছেদ ২৬৯ অনুযায়ী, কর কেন্দ্র আরোপ ও আদায় করে, তবে তা রাজ্যগুলোর মধ্যে বরাদ্দ করা হয়। যেমন–পণ্য বিক্রয় বা ক্রয়ের ওপর কর।

অন্যদিকে, কেন্দ্রের প্রধান অ-কর রাজস্বের উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে–ডাক ও টেলিগ্রাফ, রেলওয়ে, ব্যাংকিং, সম্প্রচার, মুদ্রা ও কয়েন, কেন্দ্রীয় সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান, এসচিয়েট ও ল্যাপ্স ইত্যাদি।

আর রাজ্যগুলোর প্রধান অ-কর রাজস্ব আসে–সেচ, বনজ সম্পদ, মৎস্য, রাজ্য সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান এবং এসচিয়েট ও ল্যাপ্স থেকে।

সংবিধানে কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে রাজ্যগুলোকে অনুদান দেওয়ার বিধান রয়েছে, যা দুই ধরনের–বিধিবদ্ধ অনুদান ও ঐচ্ছিক অনুদান।

অনুচ্ছেদ ২৭৫ অনুযায়ী, আর্থিকভাবে দুর্বল রাজ্যগুলোর জন্য পার্লামেন্ট অনুদান দিতে পারে। এটি সব রাজ্যের জন্য বাধ্যতামূলক নয় এবং অর্থ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এই অর্থ কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে বার্ষিকভাবে দেওয়া হয়।

অনুচ্ছেদ ২৮২ অনুযায়ী, কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ই যে কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে অনুদান দিতে পারে, এমনকি তা তাদের আইনগত ক্ষমতার বাইরে হলেও। তবে কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এ ধরনের অনুদান দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়, এটি সম্পূর্ণভাবে সরকারের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে।

পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রাজ্যগুলো পায় প্রায় ৪১ ভাগ কেন্দ্রীয় কর। তবু এই নির্ভরতাই কেন্দ্র-রাজ্য টানাপড়েনের মূলে থাকে, কারণ রাজ্যগুলোকে তাদের খরচের অধিকাংশের জন্যই কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।

স্বায়ত্তশাসন বনাম জাতীয় ঐক্য

ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সম্পর্ক মূলত ক্ষমতার ভারসাম্য ও সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সংবিধান স্পষ্টভাবে দায়িত্ব ও ক্ষমতার বিভাজন করলেও বাস্তবে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে নির্ভরতা ও সমন্বয় অবিচ্ছেদ্য। একদিকে রাজ্যগুলো স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ পায়, অন্যদিকে জাতীয় ঐক্য, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দ্বিকক্ষীয় শাসনব্যবস্থা একদিকে যেমন বৈচিত্র্যময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে, তেমনি পুরো দেশকে একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখে।

সম্পর্কিত