ফাহমিদা শিকদার

একজন প্রবাসী ব্যবসায়ী ভোট দিতে দেশে ফিরে দেখেন, তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে ফেলেছে। এই ঘটনা সেই ব্যবসায়ীর মনে গভীর দাগ ফেলে। এরই সূত্র ধরে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে নিজেই রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যে সরকারও গঠন করেন।
গল্পটি দক্ষিণ ভারতের ব্যাপক জনপ্রিয় সিনেমা ‘সরকার’–এর। আর সিনেমাটির নায়ক ছিলেন থালাপতি বিজয়, এই গল্পকেই যেন সত্যি করে যিনি এখন তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের পথে।
সিনেমা ছেড়ে রাজনীতিতে নেমেই সিনেমার মতোই চমকে দিয়েছিলেন সবাইকে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তার নবগঠিত দল ‘তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে)’ অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া খবরে ২৩৪ আসনের মধ্যে তার দল এগিয়ে আছে ১০৫টিতে।
তার আসল নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। ভক্তরা ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘থালাপতি’, অর্থ সেনাপতি। জন্ম ১৯৭২ সালের ২২ জুন। বাবা তামিল সিনেমার প্রখ্যাত পরিচালক এস এ চন্দ্রশেখর। মা সঙ্গীতশিল্পী শোভা চন্দ্রশেখর, সিনেমার প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে বেশি পরিচিত। ছোটবেলা থেকে সাংস্কৃতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা বিজয়ের সিনেমায় অভিষেক মাত্র দশ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে। আর নায়ক হিসেবে তিনি সিনেমা জগতে প্রবেশ করেন ১৯৯২ সালে।
শুরুতে বক্স অফিসে খুব একটা সাফল্য পায়নি বিজয়ের সিনেমাগুলো। তবে এই দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসে ২০০৩ সালে। সে সময় মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো ‘থিরুমালাই’ ছিল তার ‘ব্রেকথ্রু’ সিনেমা। এরপর তিনি উপহার দিয়েছেন আরও অনেক ব্লকবাস্টার। পেয়েছেন ‘সুপারহিরো’ তকমা।
সিনেমার পাশাপাশি বিজয় নানা ধরনের সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন। তামিলনাড়ুতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে তার অবদান বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এই বিজয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিনেমা থেকে বেরিয়ে ‘ফুল টাইম’ রাজনীতিতে যোগ দেন।
দক্ষিণে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। তামিল রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য–সিনেমার তারকারা এখানে একপর্যায়ে রাজনীতিতে নামেন এবং ভোটের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে মাত করেন। অনেক সময় ‘প্রতিপক্ষরাও’ হয়ে থাকেন সিনেমাজগতের মানুষ।
তার মতে, রাজনীতি কেবল পার্টটাইম চাকরি বা শখের বিষয় নয়। জনগণের সেবা করতে গেলে অভিনয়ের গ্ল্যামার ছেড়ে পুরোপুরি মাঠে নামতে হবে। এজন্যই তিনি এক সমাবেশে বলেছিলেন, “রাজনীতি সিনেমা নয়, যুদ্ধক্ষেত্র।”
৫১ বছর বয়সী এই সুপারস্টার ছিলেন দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম। তার ৩৪ বছরের ক্যারিয়ারে সম্পদ গড়েছেনও অঢেল। যখন বিজয়ের ক্যারিয়ার হীরার মতো জ্বলজ্বল করছে, তখন তা বিসর্জন দিয়ে তিনি নেমে পড়েন রাজনীতির মাঠে। চাইলে একইসাথে সিনেমা ও রাজনীতি করার যে ‘হাইব্রিড’ পদ্ধতি কমল হাসান বা বিজয়কান্ত অনুসরণ করেছিলেন, সে পথেও হাঁটতে পারতেন।

কিন্তু বিজয় তা করেননি। তার মতে, রাজনীতি কেবল পার্টটাইম চাকরি বা শখের বিষয় নয়। জনগণের সেবা করতে গেলে অভিনয়ের গ্ল্যামার ছেড়ে পুরোপুরি মাঠে নামতে হবে। এজন্যই তিনি এক সমাবেশে বলেছিলেন, “রাজনীতি সিনেমা নয়, যুদ্ধক্ষেত্র।”
রাজনীতিতে নেমেই গঠন করলেন তার দল ‘তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম’। বাংলায় ‘তামিলনাড়ু বিজয়ী মোর্চা’। প্রধান প্রতিপক্ষ বামপন্থী ডিএমকে এবং বিজেপি সমর্থিত এআইএডিএমকে। এক সমাবেশে বিজয় বলেছিলেন, বিজেপি তার ভাবাদর্শিক শত্রু এবং ডিএমকে হলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। আর বিজয়ের আদর্শ হলেন জাতিভেদ বিরোধী দ্রাবিড় আন্দোলনের নেতা রামস্বামী পেরিয়ার।
তাই তো বিজয় নিজের দলের লক্ষ্য হিসেবে সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং তামিল জাতীয়তাবাদকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি এমন একটি রাজনীতির কথা বলছেন, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি রাজ্যে বিদ্যমান দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা দূর করার বিষয়টি তো আছেই।
জনসভায় তিনি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারকে সমালোচনা করে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতেন। সেখানে তিনি কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না। এমনকি এক জনসভায় তিনি বলে বসেছিলেন, নরেন্দ্র মোদি তার শত্রু।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে তামিলনাড়ুর রাজনীতি এই ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে’র মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম দীর্ঘদিন ধরে এর বাইরে ‘বিকল্প’ খুঁজছিল। ঠিক সেই সময়ে আবির্ভাব হয় বিজয়ের। স্বাভাবিকভাবেই নতুন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জেন-জিদের মনে স্থান করে নিতে খুব একটা সময় লাগেনি তার।
বিজয়ের জনসভাগুলো সবসময় মানুষে মানুষে পরিপূর্ণ থাকতো। সবাই তাকে একনজর দেখতে আসতো। আর সেই সব জনসভায় তিনি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারকে সমালোচনা করে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতেন। সেখানে তিনি কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না। এমনকি এক জনসভায় তিনি বলে বসেছিলেন, নরেন্দ্র মোদি তার শত্রু।
বিজয়ের জনসভায় এতটাই বেশি মানুষের আগমন গঠতো যে, সেখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। গত বছর সেপ্টেম্বরে তামিলনাড়ুর কারুরে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় পদদলিত হয়ে ৪০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। এই ঘটনার পর বিজয়ের নেতৃত্ব এবং তার দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ভিড়ের সেই বিশৃঙ্খলার কারণে তিনি তার ভাষণ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও পরে তিনি এই ঘটনাকে ‘হৃদয়বিদারক’ বলে অভিহিত করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেন।
বিজয়ের অবস্থান আগে থেকে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য ইতিবাচক ছিল। এখানে শুধু তার ‘স্টারডম’ নয়, কাজ করেছে ‘উচ্চাভিলাষী’ নির্বাচনী ইশতেহারও।
নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নারীদের জন্য ২ হাজার ৫০০ রুপি সহায়তা এবং বিয়ের উপহার হিসেবে সোনা ও শাড়ি প্রদান এবং সর্বোচ্চ ৫ লাখ রুপি অর্থ সহায়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বিজয়ের ইশতেহারে ক্ষুদ্র ভূমিমালিক কৃষকদের জন্য সমবায় কৃষি ঋণ মওকুফ এবং বড় কৃষকদের জন্য আংশিক ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দলটি ধানের জন্য প্রতি কুইন্টাল ৩ হাজার ৫০০ রুপি এবং আখ চাষিদের জন্য ৪ হাজার ৫০ রুপি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য প্রদানের প্রস্তাব করেছে।
সিনেমা জগতের ‘সরকার’ থেকে বাস্তবের জনসেবায় বিজয়ের এই রূপান্তর কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং তামিল রাজনীতির এক নতুন যুগের সূচনা।
জেন-জিদের কথা চিন্তা করে বিজয় তার ইশতেহারের সবচেয়ে উচ্চভিলাষী অংশটি রেখেছেন যুব উন্নয়নের জন্য। দলটি বেকার স্নাতকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া স্নাতকদের জন্য মাসিক ১০ হাজার রুপি সহায়তা, সাধারণ বেকার স্নাতকদের জন্য মাসিক ৪ হাজার টাকা বেকার ভাতা এবং ডিপ্লোমাধারীদের জন্য ২ হাজার ৫০০ রুপি ভাতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আইটিআই স্নাতকরা দক্ষতা বৃদ্ধি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় মাসিক ৮ হাজার টাকা করে পাবেন। এ ছাড়া তিনি সরকারি পরীক্ষাগুলো সময়মতো নেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
সিনেমা জগতের ‘সরকার’ থেকে বাস্তবের জনসেবায় বিজয়ের এই রূপান্তর কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং তামিল রাজনীতির এক নতুন যুগের সূচনা। রূপালি পর্দার গ্ল্যামার পেছনে ফেলে কাঁধে তুলে নিয়েছেন কোটি মানুষের প্রত্যাশার ভার। এখন দেখার বিষয়, সিনেমার স্ক্রিপ্টের মতো বাস্তবের এই ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ তিনি কতটা সফলভাবে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আনতে পারেন।
রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী প্রথা ভেঙে বিজয়ের এই ‘জয়যাত্রা’ সময়ের পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ হয়, তা-ই এখন দেখার অপেক্ষায় তামিলনাড়ু তথা ভারতবাসী।

একজন প্রবাসী ব্যবসায়ী ভোট দিতে দেশে ফিরে দেখেন, তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে ফেলেছে। এই ঘটনা সেই ব্যবসায়ীর মনে গভীর দাগ ফেলে। এরই সূত্র ধরে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে নিজেই রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যে সরকারও গঠন করেন।
গল্পটি দক্ষিণ ভারতের ব্যাপক জনপ্রিয় সিনেমা ‘সরকার’–এর। আর সিনেমাটির নায়ক ছিলেন থালাপতি বিজয়, এই গল্পকেই যেন সত্যি করে যিনি এখন তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের পথে।
সিনেমা ছেড়ে রাজনীতিতে নেমেই সিনেমার মতোই চমকে দিয়েছিলেন সবাইকে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তার নবগঠিত দল ‘তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে)’ অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া খবরে ২৩৪ আসনের মধ্যে তার দল এগিয়ে আছে ১০৫টিতে।
তার আসল নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। ভক্তরা ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘থালাপতি’, অর্থ সেনাপতি। জন্ম ১৯৭২ সালের ২২ জুন। বাবা তামিল সিনেমার প্রখ্যাত পরিচালক এস এ চন্দ্রশেখর। মা সঙ্গীতশিল্পী শোভা চন্দ্রশেখর, সিনেমার প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে বেশি পরিচিত। ছোটবেলা থেকে সাংস্কৃতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা বিজয়ের সিনেমায় অভিষেক মাত্র দশ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে। আর নায়ক হিসেবে তিনি সিনেমা জগতে প্রবেশ করেন ১৯৯২ সালে।
শুরুতে বক্স অফিসে খুব একটা সাফল্য পায়নি বিজয়ের সিনেমাগুলো। তবে এই দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসে ২০০৩ সালে। সে সময় মুক্তি পাওয়া সাড়া জাগানো ‘থিরুমালাই’ ছিল তার ‘ব্রেকথ্রু’ সিনেমা। এরপর তিনি উপহার দিয়েছেন আরও অনেক ব্লকবাস্টার। পেয়েছেন ‘সুপারহিরো’ তকমা।
সিনেমার পাশাপাশি বিজয় নানা ধরনের সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন। তামিলনাড়ুতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে তার অবদান বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এই বিজয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিনেমা থেকে বেরিয়ে ‘ফুল টাইম’ রাজনীতিতে যোগ দেন।
দক্ষিণে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। তামিল রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য–সিনেমার তারকারা এখানে একপর্যায়ে রাজনীতিতে নামেন এবং ভোটের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে মাত করেন। অনেক সময় ‘প্রতিপক্ষরাও’ হয়ে থাকেন সিনেমাজগতের মানুষ।
তার মতে, রাজনীতি কেবল পার্টটাইম চাকরি বা শখের বিষয় নয়। জনগণের সেবা করতে গেলে অভিনয়ের গ্ল্যামার ছেড়ে পুরোপুরি মাঠে নামতে হবে। এজন্যই তিনি এক সমাবেশে বলেছিলেন, “রাজনীতি সিনেমা নয়, যুদ্ধক্ষেত্র।”
৫১ বছর বয়সী এই সুপারস্টার ছিলেন দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম। তার ৩৪ বছরের ক্যারিয়ারে সম্পদ গড়েছেনও অঢেল। যখন বিজয়ের ক্যারিয়ার হীরার মতো জ্বলজ্বল করছে, তখন তা বিসর্জন দিয়ে তিনি নেমে পড়েন রাজনীতির মাঠে। চাইলে একইসাথে সিনেমা ও রাজনীতি করার যে ‘হাইব্রিড’ পদ্ধতি কমল হাসান বা বিজয়কান্ত অনুসরণ করেছিলেন, সে পথেও হাঁটতে পারতেন।

কিন্তু বিজয় তা করেননি। তার মতে, রাজনীতি কেবল পার্টটাইম চাকরি বা শখের বিষয় নয়। জনগণের সেবা করতে গেলে অভিনয়ের গ্ল্যামার ছেড়ে পুরোপুরি মাঠে নামতে হবে। এজন্যই তিনি এক সমাবেশে বলেছিলেন, “রাজনীতি সিনেমা নয়, যুদ্ধক্ষেত্র।”
রাজনীতিতে নেমেই গঠন করলেন তার দল ‘তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম’। বাংলায় ‘তামিলনাড়ু বিজয়ী মোর্চা’। প্রধান প্রতিপক্ষ বামপন্থী ডিএমকে এবং বিজেপি সমর্থিত এআইএডিএমকে। এক সমাবেশে বিজয় বলেছিলেন, বিজেপি তার ভাবাদর্শিক শত্রু এবং ডিএমকে হলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। আর বিজয়ের আদর্শ হলেন জাতিভেদ বিরোধী দ্রাবিড় আন্দোলনের নেতা রামস্বামী পেরিয়ার।
তাই তো বিজয় নিজের দলের লক্ষ্য হিসেবে সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং তামিল জাতীয়তাবাদকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি এমন একটি রাজনীতির কথা বলছেন, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি রাজ্যে বিদ্যমান দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা দূর করার বিষয়টি তো আছেই।
জনসভায় তিনি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারকে সমালোচনা করে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতেন। সেখানে তিনি কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না। এমনকি এক জনসভায় তিনি বলে বসেছিলেন, নরেন্দ্র মোদি তার শত্রু।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে তামিলনাড়ুর রাজনীতি এই ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে’র মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম দীর্ঘদিন ধরে এর বাইরে ‘বিকল্প’ খুঁজছিল। ঠিক সেই সময়ে আবির্ভাব হয় বিজয়ের। স্বাভাবিকভাবেই নতুন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জেন-জিদের মনে স্থান করে নিতে খুব একটা সময় লাগেনি তার।
বিজয়ের জনসভাগুলো সবসময় মানুষে মানুষে পরিপূর্ণ থাকতো। সবাই তাকে একনজর দেখতে আসতো। আর সেই সব জনসভায় তিনি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারকে সমালোচনা করে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতেন। সেখানে তিনি কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না। এমনকি এক জনসভায় তিনি বলে বসেছিলেন, নরেন্দ্র মোদি তার শত্রু।
বিজয়ের জনসভায় এতটাই বেশি মানুষের আগমন গঠতো যে, সেখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। গত বছর সেপ্টেম্বরে তামিলনাড়ুর কারুরে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় পদদলিত হয়ে ৪০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। এই ঘটনার পর বিজয়ের নেতৃত্ব এবং তার দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ভিড়ের সেই বিশৃঙ্খলার কারণে তিনি তার ভাষণ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও পরে তিনি এই ঘটনাকে ‘হৃদয়বিদারক’ বলে অভিহিত করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেন।
বিজয়ের অবস্থান আগে থেকে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য ইতিবাচক ছিল। এখানে শুধু তার ‘স্টারডম’ নয়, কাজ করেছে ‘উচ্চাভিলাষী’ নির্বাচনী ইশতেহারও।
নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নারীদের জন্য ২ হাজার ৫০০ রুপি সহায়তা এবং বিয়ের উপহার হিসেবে সোনা ও শাড়ি প্রদান এবং সর্বোচ্চ ৫ লাখ রুপি অর্থ সহায়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বিজয়ের ইশতেহারে ক্ষুদ্র ভূমিমালিক কৃষকদের জন্য সমবায় কৃষি ঋণ মওকুফ এবং বড় কৃষকদের জন্য আংশিক ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দলটি ধানের জন্য প্রতি কুইন্টাল ৩ হাজার ৫০০ রুপি এবং আখ চাষিদের জন্য ৪ হাজার ৫০ রুপি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য প্রদানের প্রস্তাব করেছে।
সিনেমা জগতের ‘সরকার’ থেকে বাস্তবের জনসেবায় বিজয়ের এই রূপান্তর কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং তামিল রাজনীতির এক নতুন যুগের সূচনা।
জেন-জিদের কথা চিন্তা করে বিজয় তার ইশতেহারের সবচেয়ে উচ্চভিলাষী অংশটি রেখেছেন যুব উন্নয়নের জন্য। দলটি বেকার স্নাতকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া স্নাতকদের জন্য মাসিক ১০ হাজার রুপি সহায়তা, সাধারণ বেকার স্নাতকদের জন্য মাসিক ৪ হাজার টাকা বেকার ভাতা এবং ডিপ্লোমাধারীদের জন্য ২ হাজার ৫০০ রুপি ভাতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আইটিআই স্নাতকরা দক্ষতা বৃদ্ধি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় মাসিক ৮ হাজার টাকা করে পাবেন। এ ছাড়া তিনি সরকারি পরীক্ষাগুলো সময়মতো নেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
সিনেমা জগতের ‘সরকার’ থেকে বাস্তবের জনসেবায় বিজয়ের এই রূপান্তর কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং তামিল রাজনীতির এক নতুন যুগের সূচনা। রূপালি পর্দার গ্ল্যামার পেছনে ফেলে কাঁধে তুলে নিয়েছেন কোটি মানুষের প্রত্যাশার ভার। এখন দেখার বিষয়, সিনেমার স্ক্রিপ্টের মতো বাস্তবের এই ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ তিনি কতটা সফলভাবে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আনতে পারেন।
রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী প্রথা ভেঙে বিজয়ের এই ‘জয়যাত্রা’ সময়ের পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ হয়, তা-ই এখন দেখার অপেক্ষায় তামিলনাড়ু তথা ভারতবাসী।