২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নিরঙ্কুশ জয় পূর্ব ভারতের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ২০০-র বেশি আসন জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজেপি। এই ফলাফল শুধু তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসানই ঘটায়নি, বরং সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে এমন এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে, যা প্রতিবেশী বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা ভারতের কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত।
এই রায় ভারতের বাংলাদেশ নীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো অবৈধ অনুপ্রবেশ, গবাদিপশু পাচার এবং মৌলবাদী নেটওয়ার্কের কেন্দ্র হিসেবে আলোচিত। তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রায়ই সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। পাশাপাশি অনুপ্রবেশ ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন নিয়ে নমনীয়তার অভিযোগও ছিল।
এখন এই সীমান্ত রাজ্যে বিজেপির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে একই আদর্শিক কাঠামোর অধীনে এনেছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের বাস্তবায়নকে আরও সহজ করবে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান এবং আন্তঃসীমান্ত চরমপন্থা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ঐতিহাসিকভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বাণিজ্য, পানি বণ্টন (যেমন গঙ্গা চুক্তি) ও নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্ত উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনী ফলাফল ‘প্রতিক্রিয়াশীল কূটনীতি’ থেকে ‘সক্রিয় কৌশলগত সম্পৃক্ততা’র দিকে এগোনোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এতে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ফাইল ছবিএই রায় একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়, ভারত পারস্পরিক উন্নয়ন বজায় রেখেই সীমান্ত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। এর ফলে সংখ্যালঘু সুরক্ষা, অনুপ্রবেশ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে ঢাকার দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শাসন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়িয়েছে। অতীতে তৃণমূল ও বিজেপির ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাণিজ্য, সংযোগ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনেক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতো। এখন একই দলের শাসনে বর্ডার হাট বা জ্বালানি সহযোগিতার মতো প্রকল্পগুলো দ্রুত এগোতে পারে।
এই সমন্বয় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়ক। কলকাতাকে প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। টেক্সটাইল, ওষুধ ও কৃষিখাতে যৌথ উদ্যোগ গড়ে উঠতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি ভারতের সক্ষমতাকে পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অভিন্ন ভাষা, সাহিত্য ও ঐতিহ্য ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়ে ভারত নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে পারে। এতে তিস্তা পানি বণ্টনের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুতেও অগ্রগতি সম্ভব।
বাংলাদেশের খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভারতের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে এই অঞ্চলে তাদের সাফল্য আন্তঃসীমান্ত চরমপন্থা ও অনুপ্রবেশের আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তৃণমূল শাসনামলে সীমান্ত এলাকায় এমন কিছু নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল, যা পাচার ও উগ্রবাদী কার্যক্রমকে সহায়তা করেছে। বিজেপির বিজয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে এসব নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ দেবে।
রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়লে তথ্য আদান-প্রদান ও সুনির্দিষ্ট অভিযান জোরদার হবে। এর ফলে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বাড়বে এবং আন্তঃসীমান্ত চরমপন্থা মোকাবিলা সহজ হবে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ৭৮-৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে বেষ্টনী দ্বারা সুরক্ষিত। তবে ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা ও জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশ এখনও অরক্ষিত রয়ে গেছে, বিশেষ করে নদীমাতৃক অঞ্চলগুলো।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। ছবি: রয়টার্সপশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শাসন অবশিষ্ট বেষ্টনী নির্মাণ ত্বরান্বিত করতে পারে। এতে অবৈধ অভিবাসন রোধ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের (সিএএ) প্রয়োগ নথিবিহীন প্রবেশ রোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
এই পদক্ষেপগুলো গবাদিপশু পাচার ও মানবপাচারের মতো সমস্যাও কমাতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি বৈধ বাণিজ্য ও চলাচল সহজ হবে এবং সীমান্তে উত্তেজনা কমতে পারে।
২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়া দীনেশ ত্রিবেদিকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলার রাজনীতি ও সমাজ সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা তাকে এই সংবেদনশীল দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে।
তিনি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে দুই দেশের মধ্যে আস্থা গড়ে তুলতে পারেন। শিক্ষার্থী বিনিময়, ভিসা সুবিধা বৃদ্ধি ও সংখ্যালঘু সংলাপের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই জয় শুধু একটি রাজ্য নির্বাচনের ফল নয়; এটি ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের সূচনা। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও পারস্পরিকভাবে উপকারী সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আগামী বছরগুলোতে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করবে, এই পরিবর্তন কতটা সফল হয়। তবে ২০২৬ সালের এই নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
লেখক: অধ্যাপক এবং ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড বেঙ্গল’ ও ‘দ্য আম আদমি পার্টি’ বইয়ের লেখক
নিবন্ধটি ভারতীয় গণমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট থেকে অনূদিত