পর্ব-২

কোনটা আসল পুতিন, কোনটা নকল?

কোনটা আসল পুতিন, কোনটা নকল?
ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের স্বাস্থ্য এবং তার সম্ভাব্য বডি ডাবল ব্যবহারের বিষয়টি বিশ্ব গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রুশ রাজনীতিতে ‘ডুপ্লিকেট’ ব্যবহারের ঐতিহ্য বেশ পুরনো। সোভিয়েত আমলে জোসেফ স্তালিন থেকে শুরু করে লিওনিদ ব্রেজনেভ পর্যন্ত অনেকেই নিরাপত্তার খাতিরে বডি ডাবল ব্যবহার করতেন।

পুতিনের ক্ষেত্রে এই দাবিটি এখন তাত্ত্বিক পর্যায় পেরিয়ে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের স্তরে পৌঁছেছে।

ভ্লাদিমির পুতিনের ‘বডি ডাবল’ বা রাজনৈতিক ডুপ্লিকেট ব্যবহারের বিষয়টি বর্তমান ভূ-রাজনীতির অন্যতম রহস্যময় অধ্যায়। এটি কেবল ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়, বরং আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুতিনের ডুপ্লিকেট ব্যবহারের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয় তার শারীরিক কাঠামোর পরিবর্তন। জাপানি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল এবং ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থা (জিইউআর) পুতিনের বিভিন্ন সময়ের ছবি বিশ্লেষণ করে কিছু অমিল খুঁজে পেয়েছে। কিয়েভ পোস্টের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

সন্দেহ আসলে কোথায়?

মানুষের কানের গঠন ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতোই অনন্য। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, ২০২৩ সালে পুতিনের মারিওপোল সফরের সময়কার কানের ট্র্যাগাস এবং লোবের গঠন মস্কোর বিজয় দিবসের প্যারেডে থাকা পুতিনের সঙ্গে হুবহু মেলেনি। জাপানি টিভি নেটওয়ার্ক আসাহির এআই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই দুই ব্যক্তির চেহারার মিলের হার মাত্র ১৮–৪০ শতাংশের মধ্যে, যা জৈবিকভাবে একই মানুষ হওয়া অসম্ভব বলে ইঙ্গিত দেয়।

পুতিন সাধারণত তার ডান হাত স্থির রেখে বাম হাত দুলিয়ে হাঁটেন (যাকে ‘গানস্লিঙ্গার গেইট’ বলা হয়, যা কেজিবি প্রশিক্ষণের অংশ)। তবে কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, তার হাঁটার ছন্দে পরিবর্তন এসেছে এবং কখনো কখনো তিনি অনেক বেশি সাবলীলভাবে নড়াচড়া করছেন, যা তার সম্ভাব্য অসুস্থতার খবরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

রুশ সামরিক পরিভাষায় ‘মাস্কিরোভকা’ মানে হলো ধোঁকা দেওয়া বা ছদ্মবেশ ধারণ করা। বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন অত্যন্ত অন্তর্মুখী এবং নিরাপত্তা সচেতন।

করোনাকাল থেকে পুতিন বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দেখা করার সময় ২০-৩০ ফুট লম্বা টেবিল ব্যবহার করতেন। এমনকি নিজের মন্ত্রীদের থেকেও তিনি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখেন। অথচ, ২০২৩ সালের শেষের দিকে তাকে রাশিয়ার দাগেস্তান অঞ্চলে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে এবং আবেগপ্রবণভাবে করমর্দন করতে দেখা যায়। এই ‘জনঘনিষ্ঠ পুতিন’ এবং ‘নিভৃতচারী পুতিন’-এর মধ্যে চারিত্রিক অমিলটি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজর কেড়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, এআই ভয়েস অ্যানালাইসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখা গেছে, বিভিন্ন ভাষণে পুতিনের কণ্ঠের পিচ এবং ফ্রিকোয়েন্সিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বিদ্যমান, যা কেবল বয়স বা অসুস্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

পুতিনের কয়টা ডুপ্লিকেট আছে?

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা প্রধান কিরিলো বুদানভ সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও ডেইলি মেইলকে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, অন্তত তিনজন ব্যক্তি পুতিনের ডাবল হিসেবে কাজ করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, আসল পুতিন যখন গুরুতর অসুস্থ থাকেন, তখন এই ডাবলদের ব্যবহার করা হয়।

রাশিয়ার ফেডারেল গার্ড সার্ভিসের সাবেক ক্যাপ্টেন গ্লেব কারাকুলভের মতে, পুতিন তার প্রকৃত অবস্থান গোপন রাখতে এবং সম্ভাব্য গুপ্তহত্যা এড়াতে তার বাসভবনগুলোতে হুবহু একই রকম অফিস বা ‘প্যারালাল অফিস’ ব্যবহার করেন। এটি বডি ডাবল থিওরিকে আরও জোরালো করে।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই ৬–এর কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বেশ কয়েকবারই দাবি করেছেন, পুতিন যদি সম্প্রতি মারা গিয়ে থাকেন বা গুরুতর শয্যাশায়ী হন, তবে ক্রেমলিন স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ডাবল ব্যবহার অব্যাহত রাখবে।

রাশিয়া কী বলছে?

রাশিয়া এই সমস্ত দাবিকে ‘কাল্পনিক’ এবং ‘পশ্চিমা ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “প্রেসিডেন্ট পুতিন সর্বদা সক্রিয় এবং সুস্থ আছেন। তার কোনো বডি ডাবল নেই।”

তবে বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন যদি প্লাস্টিক সার্জারি বা ফিলার ব্যবহার করেন (যার প্রমাণ তার গালের ফোলাভাব থেকে পাওয়া যায়), তবে চেহারার পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। কিন্তু বায়োমেট্রিক তথ্যের অমিল কেবল সার্জারি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

ভ্লাদিমির পুতিনের বডি ডাবল থাকা বা না থাকা কেবল একটি কৌতূহল নয়, এটি রাশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। যদি সত্যিই ডুপ্লিকেট ব্যবহার করা হয়, তবে তা রাশিয়ার শাসনব্যবস্থার ভঙ্গুরতা বা পুতিনের স্বাস্থ্যের চরম অবনতির দিকে ইঙ্গিত করে। তবে অকাট্য ডিএনএ প্রমাণ ছাড়া এই রহস্য হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি উন্মোচিত হবে না। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পুতিনের এই ‘ছায়া ব্যক্তিত্ব’ বিশ্বরাজনীতির অন্যতম বড় ধাঁধা হয়ে থাকবে।

সম্পর্কিত