ফ্যাসিবাদীরা যে ৫ ধাপে ক্ষমতায় যায়

ফ্যাসিবাদীরা যে ৫ ধাপে ক্ষমতায় যায়
প্রতীকী ছবি

মানবসভ্যতার শুরুটা হয়েছিল মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। গোষ্ঠী গঠন হওয়ার পরই আসে তার নেতৃত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গ। এই প্রক্রিয়াতেই ধীরে রাজ্য বা সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। রাজা বা সম্রাটের শাসনকাল শুরু হয়। অতিসরলীকরণ মনে হলেও বংশানুক্রমিক শাসনের ইতিহাস এ রকমই। এরপর ধীরে ধীরে আসে গণতন্ত্রের ধারণা। আর এই ধারণাতেই স্বৈরাচার বা একনায়কের তত্ত্বের উদ্ভব, যদিও এমন শাসন তত্ত্ব সৃষ্টির আগেও ছিল। সেই একনায়কতন্ত্রেরই একটি চরম রূপ হলো ফ্যাসিবাদ।

১৯২০ থেকে ১৯৩০‑এর দশকে ইউরোপে এর প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভব ও বিস্তার ঘটে। এবং তার প্রতিভূই মূলত হিটলার ও মুসোলিনি। মুসোলিনি এ ক্ষেত্রে ছিলেন অগ্রগামী সৈনিক। হিটলার তাঁর কাছ থেকে অনেক শিক্ষাই নিয়েছিলেন এবং নিজের স্বার্থে সেসব কাজেও লাগিয়েছিলেন। বিশেষ করে প্রোপাগান্ডা ও সহিংসতার বহুমুখী ব্যবহারের বিষয়টি মুসোলিনির কাছ থেকেই হিটলার আত্তীকরণ করেছিলেন বলে ধারণা করেন অনেক বিশ্লেষক। জার্মানি ও ইতালির পর ফ্যাসিবাদী আদর্শের ভিত্তিতে ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন গঠিত হয়েছিল।

ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা আসলে অনেক। এই রাজনৈতিক আদর্শটি নিয়ত পরিবর্তনশীল এবং স্থান‑কাল‑পাত্রভেদে এর হরেক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, তাই ফ্যাসিবাদকে একদম নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করা এবং এর মান সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। কিছু বিশেষজ্ঞ ফ্যাসিবাদ বলতে একগুচ্ছ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, একটি রাজনৈতিক দর্শন বা একটি গণআন্দোলনকে বুঝিয়ে থাকেন। আবার অনেকে বলেন ফ্যাসিবাদ এমন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন, যেটি উগ্র জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ এবং ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বাধিক ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ সংজ্ঞাতেই ফ্যাসিবাদকে একনায়কতন্ত্রেরই আরেক রূপ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। এটিও মেনে নেওয়া হয়েছে যে, ফ্যাসিবাদে উগ্র জাতীয়তাবাদের চর্চা আবশ্যিক এবং যেকোনো মূল্যেই একে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।

ফ্যাসিবাদ বিষয়ক গবেষক রবার্ট প্যাক্সটন ফ্যাসিস্টদের রাষ্ট্র বা সরকার ক্ষমতা দখলের একটি ধারাবাহিক কাঠামো চিহ্নিত করেছেন। এই কাঠামোটির তিনি নাম দিয়েছেন, ‘ফাইভ স্টেজেস অব ফ্যাসিজম’। প্যাক্সটন মনে করেন, এই ৫ ধাপেই ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় বসে। মুসোলিনি ও হিটলারও এভাবেই ক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন।

১ম ধাপ: মোহভঙ্গের আশ্রয়ে প্রকাশ্যে আবির্ভাব

ইতালি ও জার্মানিতে মুসোলিনি ও হিটলারের আবির্ভাব ঘটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপর। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে পাওয়া দুর্দশাহেতুই এই আবির্ভাবের অন্যতম কারণ। ওই সময় ইতালি ও জার্মানিতে যেসব প্রথাগত রাজনীতিবিদ সক্রিয় ছিলেন, তাদের কর্মকাণ্ডে দুই দেশের মানুষ খুশি ছিল না। দেশের নেতারা যেভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জাতিকে নতিস্বীকার করিয়েছিল, সেটিই ছিল সাধারণ জনতার অসন্তুষ্টির মূল কারণ। ফলে জনগণের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল প্রবলভাবে।

এভাবেই প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি জনতার মোহভঙ্গ বা আস্থাহীনতার সুযোগ নিয়ে ফ্যাসিবাদের ভিত শক্ত করার কাজটি শুরু হয়। এই সুযোগ ঠিকমতো কাজে লাগানোর ওপরই নির্ভর করে পরবর্তী ধাপের কর্মকাণ্ড।

২য় ধাপ: রাজনৈতিক দল হিসেবে বৈধতা প্রতিষ্ঠা

সাধারণ জনতার মোহভঙ্গ বা আস্থাহীনতাকে কাজে লাগিয়ে জনগণের মনোকাঠামোতে শক্ত আসন তৈরি করে ফ্যাসিবাদ। এই জনঅসন্তুষ্টিই মূলত ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। কোনো কারণে জনগণের ক্ষোভ নেতিয়ে গেলেই ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক শক্তির উৎসে টান পড়ে। মুসোলিনি ও হিটলার নিজেদের রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করেছিলেন তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোকে ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলতে। এর বাইরে ওইসব ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম অস্ত্র ছিল সহিংসতা।

অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদীরা দুটি সমান্তরাল প্রক্রিয়ায় নিজেদের রাজনৈতিক দলকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। প্রথমে জনতার ক্ষোভকেই কেবল পুঁজি করে জনভিত্তি তৈরি করে নেয়। এরপর একদিকে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে ঢুকে পড়ে ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলে এবং সেই সাথেই অন্যদিকে স্রেফ বলপ্রয়োগের বন্য নীতিতে হাত পাকতে থাকে। এভাবেই ফ্যাসিস্টরা রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে।

facist 2

৩য় ধাপ: ডানপন্থীদের সঙ্গে মিশে শক্তিমত্তা অর্জন

দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যকার ইউরোপে প্রকৃতপক্ষে দুটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্রিয়াশীল ছিল। একটি হলো রক্ষণশীল আদর্শ এবং আরেকটি ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সেই সময় সমাজতান্ত্রিক আদর্শ নতুন দিশা দেখাচ্ছিল বিশ্বকে এবং একই সঙ্গে এক অজানা শঙ্কাও ছড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে রক্ষণশীল রাজনীতি সমাজতান্ত্রিক জুজুতে ভীত হয়ে পড়েছিল। আবার পুঁজিবাদীরাও আতঙ্কে ভুগছিল। ঠিক এমন পরিস্থিতিতেই তৃতীয় বিকল্প হিসেবে উঠে আসে ফ্যাসিস্টরা।

অর্থাৎ, আর্থ‑সামাজিক সংকটের সঙ্গে রাজনৈতিক বিকল্পের অভাব ও জুজুর ভয়ও ফ্যাসিস্টদের উত্থানে প্রবল ভূমিকা রাখে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছিল। রক্ষণশীলেরা সাধারণত ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ, জাতীয়তাবাদ, প্রথাগত আইন ও শৃঙ্খলার নীতির ওপর ভরসা রাখে। এই একই বোধে আস্থা থাকে ফ্যাসিস্টদেরও। ফলে আদর্শগতভাবে খানিকটা মিল থাকায় এ দুই পক্ষ কাছাকাছি আসে এবং একতাবদ্ধ হয়, রাজনীতিতে অংশীদার হয়। রক্ষণশীলেরা যদিও বুঝতে পারে যে, ফ্যাসিস্টরা আসলে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বন্দোবস্তকেই একেবারে উপড়ে ফেলতে চায়, তবু মন্দের ভালো হিসেবে তাদের সাথে জোট বাঁধে। ভাবতে থাকে যে, ভোটের মাঠের সুবিধায় জোট হোক, পরে না‑হয় ঝোপ বুঝে কোপ মেরে ফ্যাসিস্টদের বসিয়ে দেওয়া যাবে!

কিন্তু ঘটে আসলে এর উল্টোটা। আর এভাবেই সরকারি ক্ষমতা কাঠামোয় উত্থান ঘটে ফ্যাসিবাদীদের।

৪র্থ ধাপ: প্রতিষ্ঠানের উপর প্রভাব খাটাতে ক্ষমতার ব্যবহার

ক্ষমতায় বসার পর ফ্যাসিবাদীরা নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে সুসংহত করার কাজ শুরু করে দেয়। অর্থাৎ, যা অর্জিত হয়েছে সেটিকে রক্ষা করার একচেটিয়া বন্দোবস্তকে পাকাপোক্ত করার কাজ আরম্ভ হয়।

এক্ষেত্রে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেই ক্ষমতা সুসংহত করার পথ খোঁজে ফ্যাসিস্টরা। অর্থাৎ, ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই নিয়মিত নিজেদের শক্তির প্রদর্শনীর আয়োজন করতে থাকে। সরকারের অংশ হয়ে তারা অবাধে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ পায় এবং যেকোনো উগ্রবাদী ভাবনার প্রসারে সেই সুযোগকে কাজে লাগায়। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমান্তরালে চলতে থাকে বলপ্রয়োগের উদাহরণ সৃষ্টি। সংঘাত, সহিংসতা করে অথবা সংঘাত, সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করে এক ধরনের ভয়ের ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়। এই পরিবেশে ভিন্নমতের যে কেউ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফ্যাসিস্ট কাঠামোর বিরোধিতাকারী যে কেউ তখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার ভয় পায়। এই বোধ তৈরি করতে নানা উপায় ব্যবহার করা হয়। আর এভাবেই ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে নিজেদের দাবি আদায় করে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তি অর্জন করে ফ্যাসিবাদীরা। এক পর্যায়ে, জোর করে নিজেদের একমেবাদ্বিতীয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফ্যাসিবাদীরা।

৫ম ধাপ: আমূল সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পাদন

সমাজ ও সরকারের ওপর প্রায়‑পূর্ণ বা একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর ফ্যাসিস্ট নেতারা নিজেদের শক্তি বা ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য একের পর এক মরিয়া চেষ্টা চালাতে থাকে। এর জন্য আমূল সংস্কারের পথে হাঁটতে থাকে তারা। এর অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে অবশ্যই পুরো রাষ্ট্রের খোলনলচে পাল্টে সেটিকে ফ্যাসিবাদের আদর্শের বা ইচ্ছার সাথে সম্মতি উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করা।

এই পঞ্চম ধাপে এসেই ফ্যাসিবাদ তার চূড়ান্ত বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে। আগের চারটি ধাপে ক্রমে শক্তি অর্জনের পর সেই পুঞ্জীভূত শক্তির চরম প্রয়োগ দেখতে হয় এই ধাপে। এভাবেই ফ্যাসিবাদ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সীমানায় হাজির হয়। আর তার ফল ভোগ করতে হয় সবাইকেই।

ফ্যাসিবাদীদের ক্ষমতায় আসার ৫টি ধাপ তো জানা হলো। এবার একটি বিশেষ দ্রষ্টব্য দিয়ে দেওয়া যাক। সেটি হলো—কোনো দেশে বা অঞ্চলে ওপরের ধাপগুলো দেখতে পাওয়া গেলেই কিন্তু বুঝে নিতে হবে যে, সংকট আসন্ন!

সম্পর্কিত