ভূমিকম্প হচ্ছে ভূমির কম্পন। বিভিন্ন কারণে ভূ অভ্যন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি হলে তা যখন পৃথিবীপৃষ্ঠের অংশবিশেষের হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন বা কম্পন ঘটায় সেটিই ভূমিকম্প।
আজ শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৫। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল নরসিংদী।
অন্যদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫.৭ । রাজধানী থেকে মাত্র ১৩ কিমি দূরে নরসিংদীর মাধবদী উপজেলায় এর উৎপত্তিস্থল। ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিমি গভীরে এর উৎপত্তি বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি।
ভূমিকম্প কেন হয়
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর একেবারে বাইরের অংশটি প্রায় ১৫টি বড় খণ্ডে বিভক্ত, যেগুলোকে টেকটোনিক প্লেট বলা হয়। এই প্লেটগুলো মিলেই লিথোস্ফিয়ার তৈরি হয়। আমাদের পরিচিত ভূ-পৃষ্ঠের মহাদেশ ও সমুদ্রের তলদেশের ভূত্বক এবং তার নিচের ম্যান্টলের ওপরের স্তর দিয়ে লিথোস্ফিয়ার গঠিত হয়।
এই বিশাল টেকটোনিক প্লেটগুলো স্থির নয়; বরং তারা ম্যান্টলের ওপর ধীরে ধীরে চলাচল করে, যার ফলে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং পর্বতমালা তৈরি হয়।
আমাদের পরিচিত ভূ-পৃষ্ঠের মহাদেশ ও সমুদ্রের তলদেশের ভূত্বক এবং তার নিচের ম্যান্টলের ওপরের স্তর দিয়ে লিথোস্ফিয়ার গঠিত হয়। ছবি: বিজিএসগবেষকদের তথ্যমতে, টেকটোনিক প্লেটগুলো একে–অপরের সঙ্গে পাশাপাশি লেগে থাকে। কোনো কারণে এগুলোর নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ হলেই তৈরি হয় শক্তি। এই শক্তি সিসমিক তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। যদি তরঙ্গ শক্তিশালী হয়, তাহলে সেটি পৃথিবীর উপরিতলে এসে পৌঁছায়। আর তখনো যদি যথেষ্ট শক্তি থাকে, তাহলে সেটা ভূত্বককে কাঁপিয়ে তোলে। এই কাঁপুনিই মূলত ভূমিকম্প।
ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভের (বিজিএস) তথ্যমতে, প্লেটগুলো নড়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ম্যান্টলের সঞ্চালন প্রবাহ-পৃথিবীর অভ্যন্তরে উষ্ণ ম্যান্টলের যে প্রবাহ তৈরি হয়, তা প্লেটগুলোকে কনভেয়ার বেল্টের মতো ঠেলে এগিয়ে নেয়।
দ্বিতীয়ত, রিজ পুশ-মহাসাগরের মাঝের রিজ এলাকায় নতুন প্লেট তৈরি হয় এবং এগুলো তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ও উঁচু থাকে। তাই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি উঁচু প্লেটগুলোকে নিচের দিকে ঠেলে দেয় এবং তা দূরের ঠান্ডা প্লেটগুলোকে সরিয়ে দেয়।
তৃতীয়ত, স্ল্যাব পুল-পুরোনো ও ঠান্ডা প্লেটগুলো সাবডাকশন জোনে ম্যান্টলের ভেতরে ডুবে যায়। ডোবার সময় প্লেটের ডুবন্ত অংশটি বাকি পুরো প্লেটকে টেনে নিয়ে যায়।
গবেষকদের মতে, প্লেট চলাচলের সবচেয়ে বড় কারণ হলো স্ল্যাব পুল। ছবি: বিজিএসগবেষকদের মতে, প্লেট চলাচলের সবচেয়ে বড় কারণ হলো স্ল্যাব পুল, কারণ যেসব প্লেটের বড় অংশ নিচে ডুবে যাচ্ছে, সেগুলোই সবচেয়ে দ্রুতগতিতে নড়ে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় রিজ পুশকেও প্লেট চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, কোনো স্থানে ভূকম্পনের জন্য ফল্ট লাইনের বড় ভূমিকা রয়েছে। ভূত্বকের বিশাল খণ্ডকে টেকটোনিক ফল্ট বলা হয়। আর দুটি টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে থাকা ফাটলকে ফল্ট লাইন বলা হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর ভেতরে থাকা ফাটল বা ফল্ট বরাবর হঠাৎ সরে যাওয়ার কারণে ভূমিকম্প ঘটে। এই সময়ে জমে থাকা শক্তি মুক্ত হয়ে ভূকম্পীয় তরঙ্গ তৈরি করে, যা মাটিতে কাঁপুনি সৃষ্টি করে। সাধারণত ফল্ট বরাবর এই ধরনের সঞ্চালন দীর্ঘসময় ধরে জমা হওয়া চাপের কারণে ঘটে।
ভূমিকম্পের আগে ফল্টের দুই পাশে চাপ জমে যায় এবং পাথরগুলো ধীরে ধীরে বিকৃত হয়। যখন এই চাপ আরও বেশি হয়, তখন ফল্ট বরাবর হঠাৎ পাথরগুলো সরতে থাকে। এতে জমে থাকা চাপ মুক্ত হয় এবং পাথরগুলো তাদের আগের অবস্থায় ফিরে আসে, তবে ফল্ট বরাবর কিছুটা সরে যায়। এটি ইলাস্টিক রিবাউন্ড তত্ত্ব নামে পরিচিত।
এই তত্ত্ব প্রথম প্রস্তাব করেন ভূতত্ত্ববিদ হেনরি ফিল্ডিং রেইড ১৯০৬ সালের সান ফ্রান্সিসকো ভূমিকম্পের পর। এটি বোঝাতে সাহায্য করে যে, ভূমিকম্পের সময় পাথরগুলো কেমনভাবে কেঁপে ওঠে।