Advertisement Banner

ইসরায়েলি সেনার মিথ্যা প্রচার ও সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণের ভেতরের কথা

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইসরায়েলি সেনার মিথ্যা প্রচার ও সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণের ভেতরের কথা
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: রয়টার্স

+৯৭২ ম্যাগাজিন ও দ্য হটেস্ট প্লেস ইন হেল-এর যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্র ইউনিটের ভেতরকার এক গভীর সত্য উন্মোচিত হয়েছে। গিলি– যিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করতে চেয়েছেন– ২০২৩ সালের অক্টোবরে আইডিএফের মুখপাত্র ইউনিটে রিজার্ভ ডিউটিতে ডাক পান এবং নর্দান কমান্ডে নিযুক্ত হন। সেই সময় দক্ষিণে হামাসের হামলার পর উত্তর দিক থেকে হিজবুল্লাহ রকেট ও ট্যাংকবিধ্বংসী মিসাইল ছুড়তে শুরু করে। তবে সাধারণ মানুষ যেন আতঙ্কিত না হয় তাই উত্তর ফ্রন্টের প্রকৃত পরিস্থিতি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। গিলির ভাষায়, বাস্তবে আগুন জ্বলছিল। কিন্তু তারা দেখাচ্ছিলেন শক্তি ও অপ্রতিরোধ্যতার মিথ্যা ছবি। এই অভিজ্ঞতা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে– যে ব্যবস্থায় তিনি বছরের পর বছর কাজ করেছেন, সেটি আসলে কী করছে?

ইরান যুদ্ধ নিয়েও গিলির মন্তব্য অর্থবহ। তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য শক্তির ওপরই প্রায় সব মনোযোগ, বাকি বিষয়গুলো উপেক্ষিত। আইডিএফ তেহরানে কতটা জোরে আঘাত করছে বা আকাশে আধিপত্যের কথা শুনলে তার আশ্বস্ত লাগে না, কারণ বাস্তবে ব্যালিস্টিক মিসাইল এখনো ছোড়া হচ্ছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সুযোগ নেই। দশটি সফল ইন্টারসেপশনের পাশাপাশি সরাসরি আঘাতও হচ্ছে। তিনি আজ কাকে বিশ্বাস করেন জানতে চাইলে দ্বিধাহীনভাবে গিলি বলেন– কাউকে না, আইডিএফ মুখপাত্রকেও নয়, সামরিক সংবাদদাতাদেরও নয়, কারণ তারা সবাই মুখপাত্র মাত্র।

গোপন মনোস্তাত্ত্বিক অভিযান ও ভুয়া ফ্যাক্ট চেকিং চ্যানেল

প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রথম ১৪ মাসে আইডিএফ মুখপাত্র ইউনিট ইসরায়েল ও বিদেশে জনমত গড়তে একটি গোপন মনোস্তাত্ত্বিক অভিযান পরিচালনা করে। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর ফ্যাক্ট চেক ডেইলি কনটেন্ট নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালু হয়। এর ইংরেজি বিবরণে এটিকে নিরপেক্ষ শিক্ষামূলক উদ্যোগ বলে উপস্থাপন করা হয়। দুই সপ্তাহ পরে একটি মার্কিন-ভিত্তিক অ্যাকাউন্ট থেকে ইউটিউব চ্যানেল এবং পরদিন ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট চালু হয়। বাস্তবে এগুলো আইডিএফ মুখপাত্র ইউনিটেরই তৈরি এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রচারণা একটি স্বাধীন অলাভজনক মিডিয়া উদ্যোগের আড়ালে ইসরায়েলি সামরিক বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ডজনখানেক ভিডিও তৈরি ও বিতরণ করেছে। কিন্তু কখনও তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেনি।

এই চ্যানেলগুলো বড় সাবস্ক্রাইবার বেস পায়নি। তবে অভিযানটি নোয়া তিশবি ও সারাই গিভাতিসহ ডজনখানেক ইসরায়েলি ও প্রো-ইসরায়েলি আন্তর্জাতিক প্রভাবশালীদের সামরিক কর্তৃপক্ষের সমন্বিত বার্তা ছড়িয়ে দিতে কাজে লাগায়। হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া কনটেন্ট লক্ষ লক্ষ দর্শকের কাছে পৌঁছায়। ভিডিওগুলো ইসরায়েলি সরকারি বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরে। যেমন ইহুদিরা ঐতিহাসিক যুদাহ রাজ্যের কারণে ফিলিস্তিনে উপনিবেশকারী নয়, গাজায় ইসরায়েলের কার্যক্রম গণহত্যা নয় ইত্যাদি।

এই অভিযানে জড়িত এক সৈনিক দ্য হটেস্ট প্লেস ইন হেল নামের হিব্রু সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, চ্যানেলগুলো বিদেশি দর্শকদের লক্ষ্য করে নিজেদের উদ্দেশ্যহীন এবং ইসরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্টতাহীন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু সবকিছু তাদের ইউনিটের মধ্যে তৈরি হয়েছে এবং স্পষ্টভাবে ইসরায়েলি বক্তব্য প্রচার করেছে। ক্যাম্পেইন বিভাগকে তিনি আইডিএফ মুখপাত্র ইউনিটের মধ্যে নৈতিকভাবে সবচেয়ে ধূসর ক্ষেত্র বলেছেন। প্রথমে মনে হয়েছিল বিশ্বকে তারা কী পেরিয়েছে তা দেখানো জরুরি। কিন্তু খুব দ্রুতই লক্ষ্য পরিবর্তন হয়ে যায়। যখন তিনি ছাড়া পান, তখন নিজেকে এর অংশ হওয়ায় গভীর বিতৃষ্ণা অনুভব করেন।

হামলার ফুটেজ ও সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মুখপাত্র ইউনিট ৭ অক্টোবরের হামাস হামলার ফুটেজ– হামাস সদস্যদের তোলা ভিডিওসহ সংগ্রহ ও পুনর্বিন্যাস করে সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে লাগিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার পরিণতি হলো বেয়ারিং উইটনেস টু দ্য অক্টোবর সেভেন ম্যাসাকার বা যা ইসরায়েলে অ্যাট্রোসিটিজ ভিডিও নামে পরিচিত– এটা ৪৭ মিনিটের একটি কাঁচা ফুটেজের সংকলন। ইউনিটে কর্মরত এক সৈনিক বলেছেন, এটা ছিল ওয়াইল্ড ওয়েস্টের মতো– কোনো সেন্সরশিপ ছিল না। সবাই বস্তাপচা উপাদানে ভেসে যাচ্ছিল এবং যত বেশি সম্ভব বিতরণের চাপ ছিল। ঠিক সোশ্যাল মিডিয়া বিজ্ঞাপন প্রচারের মতো: কী কাজ করে, কী করে না, কীসে মনোযোগ পাওয়া যায়।

সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণে পুরস্কার ও শাস্তির কৌশল

প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে উঠে এসেছে আইডিএফ মুখপাত্র ইউনিট কীভাবে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করে। ইউনিটটি জনগণ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংযোগের প্রধান মাধ্যম। তথ্য যাচাই বা সামরিক কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিতে সাংবাদিকদের এই ইউনিটের কাছে যেতে হয়। যে ব্যবস্থা এটিকে বিপুল ক্ষমতার মালিক করে। রনি ২০১৯ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং পরে ৭ অক্টোবরের পর রিজার্ভিস্ট হিসেবে ডাক পান। তিনি বলেছেন, ১৬ জন ইসরায়েলি সাংবাদিক একটি বিশেষ সংবাদদাতা গোষ্ঠীর সদস্য যারা এক্সক্লুসিভ ব্রিফিং, কনফারেন্স, হটলাইন ও বিশেষ ইভেন্ট পায়। যে সাংবাদিক ও মিডিয়া আইডিএফের জন্য সমালোচনামূলক, তাদের কম প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্মে পাঠানো হয় বা বছরের পর বছর প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখা হয়।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, তার সমালোচনামূলক সংবাদ পেশাগতভাবে মূল্য দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর কাছের লোকেরা তাকে বলেছেন তার সমালোচনা অতিরিক্ত। বছরের পর বছর বয়কট সহ্য করতে হয়েছে, যতদিন না তার প্রকাশনা চাপ দিয়ে আইডিএফকে সংবাদদাতা গোষ্ঠীতে তাকে নিতে বাধ্য করে। সেখানে প্রবেশের পরও দেখেছেন ভেতরে আরও স্তর আছে– কম সমালোচনামূলক সাংবাদিকদের স্পষ্ট অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। জুম ব্রিফিংয়ে কিছু প্রভাবশালী সাংবাদিক উপস্থিতও থাকেন না; কিন্তু তবুও তথ্য প্রকাশ করেন, অর্থাৎ আগাম তথ্য পেয়েছেন। আরেকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক সংবাদদাতা বলেছেন, আইডিএফ মুখপাত্র পুরস্কার ও শাস্তির কৌশলে কাজ করে– সমালোচনা করলে শাস্তি পেতে হয়।

হারেৎজ সাংবাদিকের জবানবন্দি: সত্য চাপা দেওয়াই লক্ষ্য

হারেৎজ পত্রিকার সামরিক সংবাদদাতা ইয়ানিভ কুবোভিচ– যিনি যুদ্ধকালীন একাধিক বড় তদন্তমূলক প্রতিবেদন করেছেন– দ্য হটেস্ট প্লেস ইন হেলকে বলেছেন, তিনি যখন আইডিএফ মুখপাত্রের কাছে কিছু জানতে চাইতেন তখন ইউনিটের মূল লক্ষ্য ছিল তাকে প্রতিবেদনটি বাদ দিতে এবং তারাও সঠিক তথ্য দিত না। ৭ অক্টোবরের পর থেকে সমস্ত আঘাত সহ্য করে আইডিএফ এমন সব সংবাদ দমনে সর্বশক্তি ব্যয় করছে যা ব্যর্থতা, নৈতিক সমস্যা বা কমান্ড সংক্রান্ত ত্রুটি উন্মোচন করে। একই অহংকারে তারা ফিরে গেছে– সংবাদমাধ্যম সমালোচনা করতে পারবে না।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

কুবোভিচ সংবাদদাতা গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আইডিএফ মুখপাত্র ও সংবাদদাতা গোষ্ঠীর সম্পর্ক তার কাছে হাস্যকর। কখন কথা বলা যাবে এবং কার সাথে সেটি মুখপাত্র ইউনিট ঠিক করে। দুই বছরের বেশি যুদ্ধের পরেও সামরিকবাহিনীর প্রধানের সাথে দু-একবার দেখা হয়েছে। চিফ অব স্টাফ জামির দায়িত্ব নেওয়ার পর সাউদার্ন কমান্ড প্রধানের সাথে একবারও সাক্ষাৎ হয়নি, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট। তারা সমালোচনাকারী সাংবাদিকদের সাথে দেখা করতে অস্বীকার করেন। কারণ এতে নাকি মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নির্বাচিত তথ্য ফাঁস এবং মিডিয়া বাজারে প্রভাব

প্রতিবেদনে নির্বাচিত তথ্য ফাঁসের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। রনি জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট উপাদান একটি মিডিয়ায় প্রকাশিত হবে অন্যটিতে নয়– এটি নিশ্চিত করা তাদের কাজের অংশ ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে উরি তেজাফন নামের ইসরায়েলি গোষ্ঠীর সদস্যরা লেবাননে ঢুকে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দুই সপ্তাহ ব্যাখ্যা দিতে অস্বীকার করার পর ইউনিট ইসরায়েলি আর্মি রেডিওর সামরিক সংবাদদাতাকে তথ্য ফাঁস করে এবং ঘটনাটি তদন্তাধীন গুরুতর ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মিলিটারি রিপোর্টাররা যারা আইডিএফ মুখপাত্রের হাত থেকে কিছু খায় না, তারা না খেয়ে থাকে বলেও রনি মন্তব্য করেছেন।

একজন সাংবাদিক বেনামে বলেছেন, শেষ পর্যন্ত সবটাই রেটিংয়ের বিষয়। যখন কিছু ঘটে, সংবাদদাতা গোষ্ঠীকে আগে ব্রিফ করা হয় এবং তারাই প্রথম প্রকাশ করে। যদি তুমি সেই গোষ্ঠীর বাইরে থেকে ১০ মিনিট পরে প্রকাশ কর, তুমি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাও। আরেকজন সাংবাদিক বলেছেন, মিডিয়া মালিকেরা প্রতিযোগীদের স্কুপ পেতে দেখে একই চান। এটা সব মিলিয়ে একটি চক্র তৈরি করে যেখানে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ ও সমালোচনা দমন চলতে থাকে।

ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বাস ও জবাবদিহিতার দাবি

+৯৭২ ম্যাগাজিনের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ইসরায়েলি সামরিক প্রচারণা যন্ত্রের একটি পদ্ধতিগত চিত্র তুলে ধরেছে– যেখানে জনগণের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের অবিরাম তাড়না, সুবিধাভোগী সাংবাদিকদের প্রাধান্য এবং সর্বোপরি প্রতারণার সাংগঠনিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। আড়াই বছরের অবিরাম যুদ্ধের পর ইসরায়েলি জনগণের সেনাবাহিনীর বক্তব্যের ওপর আস্থা কমতে শুরু করেছে। সাইরেনের ফাঁকে ফাঁকে আরও বেশি ইসরায়েলি প্রশ্ন করছেন– তাদের যা বলা হচ্ছে তা কি আসলে অর্জিত হচ্ছে? তাহলে আশ্রয়কক্ষে কেন এখনও ছুটতে হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সামরিক প্রচারণা যন্ত্র এবং বাস্তবতার মধ্যে ফাটল বাড়তেই থাকবে।

সম্পর্কিত