Advertisement Banner

ভারতে ফার্টিলিটি রেট কমছে কেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভারতে ফার্টিলিটি রেট কমছে কেন?
ছবি: রয়টার্স

ভারতে এই প্রথমবার উর্বরতার হার জনসংখ্যা সংকোচন রোধের জন্য প্রয়োজনীয় সীমার নিচে নেমে গেছে। যা ভবিষ্যতে শ্রমিকের ঘাটতি এবং বার্ধক্যজনিত সমাজ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

কয়েক দশক ধরে ভারতে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দেশের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যাগত জরিপ ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসআরএস) স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিপোর্ট-সহ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বেশ কয়েক বছর ধরেই ভারতের উর্বরতার হার কমছে। অবশ্য এতদিন পুনরুৎপাদন হার জনসংখ্যা বৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট বেশি ছিল।

ভারতের অফিস অব দ্য রেজিস্ট্রার জেনারেল অ্যান্ড সেন্সাস কমিশনার কর্তৃক মে মাসে প্রকাশিত সর্বশেষ এসআরএস রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ভারতের মোট উর্বরতার হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর) নেমে এসেছে নারী প্রতি ১.৯টি সন্তানে-যা দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২.১-এর মানদণ্ড স্তরের চেয়েও কম। টিএফআর হলো একজন নারী তার জীবদ্দশায় গড়ে কতজন সন্তানের জন্ম দিতে পারেন তার প্রত্যাশিত সংখ্যা। ২০০০-এর দশকে ভারতের টিএফআর ছিল নারী প্রতি প্রায় ৩.৩টি সন্তান। 

উর্বরতার হার কমে যাওয়ার কারণ কী?

সত্তরের দশক থেকে শুরু করে কয়েক দশক ধরে ভারতের সরকার এবং নীতি-নির্ধারকরা তথাকথিত অতিরিক্ত জনসংখ্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাদের যুক্তি ছিল, তৎকালীন অপেক্ষাকৃত দরিদ্র একটি দেশের জন্য জনসংখ্যা ছিল অনেক বেশি, কিন্তু তা সামাল দেওয়ার মতো সম্পদ ছিল অত্যন্ত সীমিত।

ভারতের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বহু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—যার মধ্যে সত্তরের দশকে মানুষকে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ করার একটি সংক্ষিপ্ত ও বিতর্কিত প্রচেষ্টাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তা সত্ত্বেও, ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’ নিয়ে সতর্কবার্তা দিচ্ছিলেন।

কিন্তু ২০২২ সালের মধ্যেই প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ভারত এক অজানা পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। দেশটির জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য জরিপ-এর প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায় যে, সব সম্প্রদায়ের মধ্যেই উর্বরতার হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। অথচ এর ঠিক এক বছর পরেই চীনকে ছাড়িয়ে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশে পরিণত হয়। ১৫০ কোটি জনসংখ্যার সেই বড় খবরের আড়ালে উর্বরতার হার কমে যাওয়ার তথ্যটি ঢাকা পড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার সহজলভ্যতা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সহজপ্রাপ্যতা উর্বরতার হার কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এর পাশাপাশি সন্তান লালন-পালনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ও ভূমিকা রাখছে।

ভারতে সামাজিক নীতি নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ দীপা সিনহা আল জাজিরাকে বলেন, “সমাজে যখন আরও বেশি সংখ্যক নারীর শিক্ষা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজস্ব মতামত প্রকাশের অধিকার তৈরি হয়, তখন সাধারণত মোট উর্বরতার হার কমে যায়। এছাড়া অর্থনীতি যখন ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে এবং সন্তান লালন-পালনের খরচ বেড়ে যায়, তখনও এটি হ্রাস পায়।”

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

শিশু মৃত্যুর হার কমে যাওয়ার সাথে সাথে বেশি সন্তান নেওয়ার ইচ্ছাও কমে আসে। সর্বশেষ এসআরএস রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে শিশু মৃত্যুর হারে উল্লেখযোগ্য হ্রাস রেকর্ড করা হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রতি হাজারে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৩০ জন থাকলেও ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি হাজারে ২৪ জন।

এই উপাদানগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উর্বরতার হারের ভিন্নতার সাথেও প্রায় নিখুঁতভাবে মিলে যায়।

গত মে মাসের জনসংখ্যাগত জরিপ রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্যগুলো-যেমন উত্তর ভারতের বিহার, যেখানে শিক্ষার হার সবচেয়ে কম এবং শিশু মৃত্যুর হার বেশি; সেখানে দেশের সর্বোচ্চ উর্বরতার হার ২.৯ রেকর্ড করা হয়েছে। এরপরেই রয়েছে উত্তর প্রদেশ, উর্বরতার হার সেখানে ২.৬।

এর বিপরীতে, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষার হার অন্যতম সর্বোচ্চ এবং শিশু মৃত্যুর হার সর্বনিম্ন। সেখানে প্রজনন হারও সর্বনিম্ন ১.২। তামিলনাড়ু ও কেরালার মতো দক্ষিণের রাজ্যগুলো, যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা ভারতের মধ্যে অন্যতম সেরা, সেখানে এই হার ছিল ১.৩।

দীপা সিনহা বলেন, “আশির দশকের প্রথম দিকে ভারতের আঞ্চলিক উন্নয়নের ওপর করা বহু গবেষণায় দেখা গেছে যে, অর্থনীতি এবং সমাজে নারীর অবস্থান—উভয়ক্ষেত্রেই দক্ষিণের রাজ্যগুলো দ্রুত উন্নতি করেছে যা, সেখানে উর্বরতার হার কম হওয়ার পেছনে অবদান রেখেছে।”

এর পরিণতি কী?

২০০৫ সালে ভারতের জনসংখ্যা জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের পর্যায়ে প্রবেশ করে। এটি এমন একটি পর্যায় যখন কোনো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যা (১৫-৬৪ বছর) শ্রমশক্তির বাইরে থাকা বৃদ্ধ ও শিশুদের সংখ্যার চেয়ে বেশি হয়। ইউএনএফপিএ-এর মতে, ভারতের এই জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের মেয়াদ ২০৫৫ সাল পর্যন্ত বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাপান, সিঙ্গাপুর এবং হংকং ষাটের দশকে এই পর্যায়ে প্রবেশ করেছিল এবং দ্রুত উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। চীন এই পর্যায়ে প্রবেশ করে আশির দশকে এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের সাথে এর সমন্বয় ঘটিয়ে একটি অর্থনীতি হিসেবে দ্রুত মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আজ এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। 

ভারতেও এই জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। তবে লাখ লাখ মানুষ এখনো বেকার এবং চীনের মতোই ভারতও একটি উন্নত অর্থনীতি হওয়া থেকে এখনো অনেক দূরে রয়েছে।

এখন, উর্বরতার হার হ্রাস পাওয়ার কারণে ভারত হয়তো জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের সুফল পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারবে না বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। যার মূল কারণ হ্রাসমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া জনসংখ্যা।

দীপা সিনহা আল জাজিরাকে বলেন, “যদি কম শিশুর জন্ম হয়, তবে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ভারতে এমন বয়োবৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে যারা শ্রমশক্তিতে তেমন অবদান রাখতে পারবেন না, যা দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।” 

ভারতের জনসংখ্যাগত উপাত্তের পেছনের রাজনীতি

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে উর্বরতার হারের ব্যাপক তারতম্যের কারণে আগামী বছরগুলোতে এমনিতেই জনবহুল উত্তরের রাজ্যগুলো দেশের সিংহভাগ জনসংখ্যার আবাসস্থলে পরিণত হবে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জটিলতা।

দক্ষিণের রাজ্যগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ—মোদি সরকার তাদের কম তহবিল দিয়ে শাস্তি দিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় সম্পদ বণ্টন নিয়ে এই বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে। চলতি বছরের শেষে ভারত সরকার পার্লামেন্টে নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের নীতি উত্থাপন করবে। ২০২৭ সালে শেষ হওয়া নতুন আদমশুমারির ভিত্তিতে এই আসন বিন্যাস করা হবে। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, জনসংখ্যার অনুপাতে আইনসভায় দক্ষিণের রাজ্যগুলোর আসন সংখ্যা কমে যেতে পারে।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

এদিকে, ভারতের মুসলমানরা হিন্দুদের চেয়ে বেশি সন্তান জন্ম দিয়ে একদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে—ক্ষমতাসীন বিজেপি ও কট্টর হিন্দু ডানপন্থীদের এমন প্রচারণায় হিন্দুদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। এমনকি গত ফেব্রুয়ারিতে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত হিন্দু দম্পতিদের অন্তত ৩-৪টি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানান।

তবে সরকারি উপাত্ত বলছে ভিন্ন কথা। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ। তাছাড়া, ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে হিন্দুদের উর্বরতার হার যেখানে ৩.৩ থেকে কমে ১.৯৪ হয়েছে, সেখানে মুসলিমদের ক্ষেত্রে তা ৪.৪১ থেকে কমে ২.৩৬-এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ, অন্য যেকোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর তুলনায় মুসলিমদের উর্বরতার হার সবচেয়ে দ্রুত গতিতে কমছে। মূলত, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে ভারতের সামগ্রিক উর্বরতার হার এখন ব্যাপকভাবে নিম্নমুখী।

ভারত কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে?

ভারত সরকার এখনো উর্বরতার হার কমে যাওয়ার বিষয়টি মোকাবিলায় দেশব্যাপী কোনো নীতি ঘোষণা না করলেও, বিভিন্ন রাজ্য ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে আরও বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।

গত মাসে, দক্ষিণ ভারতের রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ ঘোষণা করেছে, পরিবারগুলো তাদের তৃতীয় সন্তানের জন্মের জন্য ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তানের জন্য ৪০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তা পাবে। এসআরএস উপাত্ত অনুযায়ী, অন্ধ্রপ্রদেশের মোট উর্বরতার হার ১.৪।

পশ্চিমের গোয়া এবং দক্ষিণের কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যগুলো প্রথমবারের মতো মা-বাবা হতে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইভিএফ বা কৃত্রিম গর্ভধারণ কেন্দ্র চালু করেছে, যা মানুষকে আরও বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করছে।

দীপা সিনহা বলেন, “ভারত সরকারের উচিত মানুষের ব্যক্তিগত প্রজনন সংক্রান্ত পছন্দকে সম্মান জানানো এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো।”

দীপা আরও বলেন, “ভারতের মতো দেশের জন্য নিজস্ব জনসংখ্যাগত কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার ওপর ভিত্তি করে একটি জননীতি তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা যদি একটি বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার দেশে পরিণত হতে চলি, তবে আমাদের বহু প্রবীণ মানুষকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।” তার মতে, দেশের এখন এমন একটি নীতি প্রয়োজন যা বৃদ্ধ বয়সে তাদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

সম্পর্কিত