সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাল হওয়া চ্যাটজিপিটি ট্রেন্ডে ব্যবহারকারীরা নিজেদের সেলফি আপলোড করে ছবিকে অতীতের বিভিন্ন সময়ের ফ্যাশনের আদলে রেট্রো ফটোগ্রাফে রূপ দিচ্ছেন। বাংলাদেশে যেমন গত শতকের আশির দশকের সময়ের ছবি তৈরির ট্রেন্ডটি ভাইরাল হয়েছে।
তবে এসব বানানো ছবি দেখতে মজার ও নস্টালজিক হলেও, ব্যক্তিগত ছবি আপলোডের আগে ছবিটি এবং এর সঙ্গে যুক্ত তথ্যের কী হয়, তা জানা প্রয়োজন ব্যবহারকারীদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজনের মুখের ছবি ব্যক্তিগত তথ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, কারণ এটি ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। একটি ছবির সঙ্গে মেটাডেটাও থাকতে পারে। এর মধ্যে ছবি তোলার সময়, কোন ডিভাইস দিয়ে ছবি তোলা হয়েছে এবং ফাইলের ধরন অনুযায়ী, ছবিটি কোথায় তোলা হয়েছে, সেসব তথ্যও থাকতে পারে।
ফলে কোনো ছবি আপলোড করার অর্থ হলো, সেই ছবির কপি একটি এআই সার্ভিসের কাছে দিয়ে দেওয়া। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মিন্ট এক প্রতিবেদনে বলছে, তখন ছবিটি ওই সেবার তথ্য সংরক্ষণ ও গোপনীয়তা নীতির আওতায় চলে যায়।
চ্যাটজিপিটিতে ছবি আপলোড করলে কী হয়?
চ্যাটজিপিটিতে কোনো ছবি আপলোড করলে সেটি আপনার কথোপকথনের অংশ হয়ে যায় এবং অন্যান্য কথোপকথনের তথ্যের সঙ্গে সংরক্ষিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবহারকারী নিজে মুছে না দেওয়া পর্যন্ত চ্যাটজিপিটির কথোপকথন তার অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত থাকে। তবে কোনো তথ্য মুছে ফেলার পরও এর কিছু অংশ ওপেনএআইয়ের সিস্টেমে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।
আইনি বা নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু তথ্য আরও বেশি সময় সংরক্ষিত হতে পারে। ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট থেকে আলাদা করে পরিচয় শনাক্ত করা যায় না, এমনভাবে রাখা তথ্যও দীর্ঘ সময় সংরক্ষিত হতে পারে।
চ্যাটজিপিটিতে কোনো ছবি আপলোড করলে সেটি আপনার কথোপকথনের অংশ হয়ে যায়। ছবি: পেক্সেলস
তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপলোড করা প্রতিটি ছবিই এআই’কে ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেনিং দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হবে। তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত বা সংরক্ষিত হবে, তা নির্ভর করে কোন পণ্য ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ব্যবহারকারীর সেটিংস কীভাবে নির্ধারিত আছে, তার ওপর। ওপেনএআই অবশ্য দাবি করছে, তাদের ব্যবসায়িক পণ্য ও এপিআইয়ের গ্রাহক তথ্য ডিফল্টভাবে মডেল ট্রেনিংয়ে ব্যবহার করা হয় না।
ছবিই একমাত্র তথ্য নয়!
গোপনীয়তার বিষয়টি শুধু সেলফি বা ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।এআইভিত্তিক সেবাগুলো ব্যবহারকারীর সরাসরি দেওয়া তথ্য, সেই তথ্য থেকে অনুমান করা বিভিন্ন বিষয়, সেশন-সংক্রান্ত মেটাডেটা এবং সংরক্ষিত ফাইল প্রসেস করতে পারে। সংবাদমাধ্যম ওয়্যারড–এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব সেবা আইপি ঠিকানা, ডিভাইসের ধরন, অপারেটিং সিস্টেম এবং ব্যবহারকারীর আনুমানিক ভৌগোলিক অবস্থানের মতো মৌলিক মেটাডেটাও সংগ্রহ করতে পারে। একই সেবায় বারবার কথোপকথনের মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারীর নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও তার আগ্রহ, অভ্যাস বা কাজের ধরন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যের ধরন তৈরি হতে পারে।
তাহলে কি ছবি আপলোড করা উচিত?
ভাইরাল এই ট্রেন্ডে ছবি আপলোড করলেই সেটি চুরি হয়ে যাবে বা ডিপফেক তৈরিতে ব্যবহার করা হবে, এমনটা একেবারে নিশ্চিত নয়। তবে মূল বিষয় হলো, ব্যবহারকারী নিজের ব্যক্তিগত ছবির একটি কপি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে দিচ্ছেন। তাই ছবিটি কীভাবে সংরক্ষণ ও প্রসেস করা হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সেবার নীতিমালা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবহারকারীদের এমন ছবি আপলোড করা এড়িয়ে চলা উচিত, যাতে অপ্রয়োজনীয় সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে। অন্য কারও ছবি, বিশেষ করে শিশুদের ছবি, তাদের অনুমতি ছাড়া আপলোড করার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেখানে সম্ভব মডেল ট্রেনিংয়ের জন্য তথ্য ব্যবহারের অনুমতি বন্ধ রাখা, সাময়িক ইনকগনিটো মোড ব্যবহার করা, প্রয়োজন না থাকা চ্যাট ও আপলোড করা ফাইল মুছে ফেলা এবং এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট কোন কোন সেবা বা তথ্যে প্রবেশ করতে পারে, তা পর্যালোচনা করা উচিত।
ওপেনএআই কী বলছে?
ওপেনএআই জানিয়েছে, চ্যাটজিপিটি এন্টারপ্রাইজ, চ্যাটজিপিটি বিজনেস, চ্যাটজিপিটি এডিইউ, চ্যাটজিপিটি ফর হেলথকেয়ার, চ্যাটজিপিটি ফর টিচার্স এবং তাদের এপিআইয়ের মাধ্যমে জমা দেওয়া তথ্য বাই ডিফল্ট মডেল ট্রেনিংয়ে ব্যবহার করা হয় না। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, এসব ব্যবসায়িক তথ্য সংরক্ষণ ও স্থানান্তরের সময় এনক্রিপ্ট করা থাকে। তবে ব্যক্তিগত চ্যাটজিপিটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে যারা ভাইরাল ১৯৮০–এর দশকের ছবি তৈরির ট্রেন্ডে অংশ নিচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য গোপনীয়তা ও তথ্য নিয়ন্ত্রণের সেটিংস ব্যবসায়িক পণ্যের তুলনায় ভিন্ন।
তাই রেট্রো সেলফি বানানোর আগে নিজের প্রাইভেসি সেটিংস একবার দেখে নেওয়া এবং ছবিটি কী ধরনের তথ্য প্রকাশ করছে, তা বুঝে দেখা ভালো হবে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ১৯৮০–এর দশকের এই ছবি হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন কোনো ট্রেন্ডের কারণে হারিয়ে যাবে। কিন্তু ব্যবহারকারীদের ছবির ডিজিটাল কপি সংশ্লিষ্ট সার্ভিসের কাছে আরও দীর্ঘ সময় থেকে যেতেই পারে।