গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপসযোগ্য নয় এমন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে তিন দিন আগে পাস হয়েছে। বিলে গুমের অভিযোগ করা, তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা, বিচার এবং ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের প্রতিকারের জন্য আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে।
এ আইনে গুমের শিকার ব্যক্তির জন্য কী কী সুরক্ষা আছে, তা দেখে নেওয়া যাক।
থানায় অভিযোগ
বিলের ধারা ১৫(১) অনুযায়ী, গুম-সংক্রান্ত কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে ভুক্তভোগী নিজে, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী অথবা গুমের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা কোনো ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করতে পারবেন। তবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা অফিসার ইনচার্জ অভিযোগ নিতে অস্বীকার করলে অভিযোগকারী এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে নালিশি মামলা করতে পারবেন।
অর্থাৎ গুমের অভিযোগ জানানোর প্রথম সুযোগ থানায়। সেখানে অভিযোগ গ্রহণ না করা হলে সরাসরি আদালতে যাওয়ার পথও আইনে রাখা হয়েছে।
অভিযোগ পাওয়ার পর কী হবে
আইনের ১৫(২) ধারা অনুযায়ী, থানায় পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে থানা এবং ক্ষেত্রমত এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নালিশি মামলা দায়েরের পর ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
গুমের অভিযোগ কোনো আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে। তবে কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অথবা স্বতপ্রণোদিত হয়ে সরকার অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো শৃঙ্খলা-বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার দিতে পারবে। এই বিধানটি রয়েছে ধারা ১৫(৩)-এ।
তদন্ত শেষ করার সময়
তদন্তের জন্যও আইনে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ধারা ১৫(৪) অনুযায়ী, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা ৯০ দিনের মধ্যে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্ত শেষ করবেন এবং প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
যুক্তিসঙ্গত কারণে ওই সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব না হলে এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তদন্তের মেয়াদ ৩০ দিন পর্যন্ত বাড়াতে পারবেন।
বর্ধিত সময়ের মধ্যেও তদন্ত শেষ না হলে তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
তদন্ত শেষে মামলা যাবে কোথায়
ধারা ১৫(৫) অনুযায়ী, তদন্ত শেষে যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আলামতসহ তদন্ত প্রতিবেদন এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপন করবেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। প্রতিবেদন ও তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে ম্যাজিস্ট্রেট সন্তুষ্ট হলে এবং অপরাধ আমলে নিয়ে বিচারিক আদালতে বিচারের জন্য পাঠালে ওই আদালতে বিচার শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ আমলে নেওয়ার সময় ম্যাজিস্ট্রেটকে সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিতে হবে না।
নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার ব্যবস্থা
গুমের অভিযোগ পাওয়ার পর শুধু মামলা বা তদন্ত নয়, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার ব্যবস্থাও আইনে রাখা হয়েছে। ধারা ১৬(১) অনুযায়ী, এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত গুম হওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার জন্য আটক কেন্দ্র, অন্য কোনো স্থান বা স্থাপনায় ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১০০ অনুয়ায়ী তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবে।
অর্থাৎ অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি আটক বা গুম হয়ে থাকতে পারেন—এমন স্থান বা স্থাপনায় তল্লাশি চালানোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ধারা ১৬(২) অনুযায়ী, আদালতের জারি করা ওই তল্লাশি পরোয়ানা পুলিশ, অন্য কোনো শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য অথবা উপযুক্ত কোনো ব্যক্তি কার্যকর করতে পারবেন।
কী শাস্তি হতে পারে
বিলে গুমের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা জোরপূর্বক গুমের বিচার আগের মতোই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারে থাকবে। গুমের অন্যান্য ধরনকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে নতুন আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও বিলে রাখা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি না থাকলেও ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের দায়ের বিধান যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
শাস্তি নির্ধারণে কোন বিষয় বিবেচনায় আসবে
ধারা ১৭-তে “দণ্ড লাভ বা বৃদ্ধির পরিস্থিতি (Mitigating or aggravating factors)” নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
গুমের অপরাধে দণ্ড দেওয়ার সময় আদালত এ ধারায় বর্ণিত লাঘব বা বৃদ্ধির পরিস্থিতি বিবেচনা করতে পারবে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি গুম হওয়া ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারে সরাসরি বা কার্যকর ভূমিকা রাখলে, গুমের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলে অথবা গুমের সঙ্গে জড়িত অন্য অপরাধীদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তারে সহযোগিতা করলে তা দণ্ড লাঘবের ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসতে পারে।
এ ছাড়া আদালত বিবেচিত অন্য কোনো যুক্তিসঙ্গত পরিস্থিতিও বিবেচনা করতে পারবে।