আমেরিকা কী ইরানে হামলা করবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আমেরিকা কী ইরানে হামলা করবে?
আমেরিকা-ইরানের পতাকা। এআই দিয়ে তৈরি

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এবং উন্নত যুদ্ধবিমান মোতায়েনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে নিজেদের সদিচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। মঙ্গলবার ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা একযোগে এই কূটনৈতিক আগ্রহের কথা জানান।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি ন্যায়সংগত চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে এমন একটি নজিরবিহীন চুক্তিতে পৌঁছানোর, যা উভয়ের উদ্বেগ নিরসন ও পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করবে। আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিলে এই চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব।

আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তৃতীয় দফা পরোক্ষ পরমাণু আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত আগের দুই দফার আলোচনায় মূলত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং তেহরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

ইরানের রাজনৈতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মজিদ তাখত রাভানচি এনপিআর রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে যা যা প্রয়োজন, ইরান তার সবটুকুই করতে প্রস্তুত। আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে জেনেভায় আলোচনার টেবিলে বসব।’’ তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু হবে পরমাণু ইস্যু।

একইসঙ্গে মার্কিন হামলার আশঙ্কায় কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে রাভানচি বলেন, আমেরিকা যদি হামলা চালায়, তবে ইরান এ অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে বাধ্য হবে। তিনি সতর্ক করেন, একবার যুদ্ধ শুরু হলে তা থামানো সহজ হবে না এবং এর ফলে পুরো অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ আবদোররহিম মুসাভি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, শত্রুপক্ষ যদি এবার কোনো ভুল করে, তবে ইরান তাদের ওপর মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেবে। তিনি জানান, অতীতে ইরান উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করলেও মার্কিন কর্মকাণ্ড তেহরানকে তাদের কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে।

এদিকে, তেহরানে সফররত আর্মেনিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সাথে এক বৈঠকে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদে বলেন, ‘‘ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে দেশ কঠোরভাবে আত্মরক্ষা করবে এবং শত্রুকে এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা দেবে।’’

মঙ্গলবার ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা ফার্স জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ উপকূলে রেভল্যুশনারি গার্ডস একটি বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে। উপকূল ও দ্বীপসমূহ রক্ষা এবং শত্রুসেনার প্রবেশ ঠেকানোর লক্ষ্যেই এই মহড়া পরিচালিত হয়।

কূটনৈতিক আলোচনার ডামাডোলের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে ওয়াশিংটন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, ইরানের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক শক্তিবৃদ্ধির অংশ হিসেবে আমেরিকার ১১টি উন্নত এফ-২২স্টিলথ ফাইটার জেট দক্ষিণ ইসরায়েলের একটি বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করেছে।

পাশাপাশি, বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড বর্তমানে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছেছে। এটি অচিরেই ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ও অন্যান্য গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারের সাথে যোগ দেবে।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা হবে সহজ জয়। যদিও সংবাদমাধ্যমের খবর ছিল যে, মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন ইরান আক্রমণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন, ট্রাম্প সেই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

২৪ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেসে দেওয়া ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে ইরানকে নতুন করে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘‘তারা এরইমধ্যে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে যা ইউরোপ এবং আমাদের বিদেশি ঘাঁটিগুলোর জন্য হুমকি। এখন তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ চালাচ্ছে যা খুব শীঘ্রই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।’’

অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের অনমনীয় মনোভাবের সমালোচনা করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘তাদেরে ভবিষ্যতে পুনরায় অস্ত্র কর্মসূচি, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট জানান, ইরান তাকে এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। আলোচনার বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘আমরা তাদের সাথে আলোচনা করছি। তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়, কিন্তু আমরা এখনো তাদের মুখ থেকে সেই কাঙ্ক্ষিত গোপন কথাটি শুনিনি যে 'আমরা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করব না।’’

সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক পথই তার প্রথম পছন্দ উল্লেখ করে ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন, ‘‘তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী মদদদাতা রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ইরানকে আমি কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে দেব না। এটি কোনোভাবেই হতে দেওয়া যায় না।’’

সম্পর্কিত