পর্ব-৩

কিম জং উনের বডি ডাবল কি সত্যিই নেই?

কিম জং উনের বডি ডাবল কি সত্যিই নেই?
কিম জং উন। ছবি: রয়টার্স

বর্তমান বিশ্বের আলোচিত যে কয়েকজন নেতাকে নিয়ে একাধিক রহস্য রয়েছে, তার মধ্যে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন অন্যতম। এই আলোচনা যতটা না তার কার্যক্রম নিয়ে, তার চেয়ে বেশি পরিবারতন্ত্র এবং তার উত্তরসূরি নিয়ে। তবে অন্যসব স্বৈরশাসকের মতো, কিম জং উনের বডি ডাবল নিয়েও একটা অধ্যায় রয়েছে আলোচনার টেবিলে।

কিম জং উনের বডি ডাবল ব্যবহারের তত্ত্বটি প্রথম জোরালো হয় ২০২০ সালের মে মাসে। প্রায় ২০ দিন আড়ালে থাকার পর তিনি যখন একটি সার কারখানার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, তখন নেটিজেনরা তার দাঁত, কানের লতি ও চুলের রেখায় অসামঞ্জস্য দাবি করেন।

পরে ২০২১ সালে তার ওজন হ্রাসের তথ্য সংবাদমাধ্যমে আসার পর এই গুঞ্জন আবার চাঙা হয়। অনেকের দাবি ছিল, নতুন ‘কিম’ আগের চেয়ে অনেক বেশি চনমনে, আরও বেশি তরুণ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি, গার্ডিয়ান, মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও বার্তা সংস্থা এপির মতো মিডিয়ায় এই প্রতিবেদন বেশ ফলাও করে প্রচার করা হয়। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল এই ইস্যু। দেশটির গোয়েন্দারা তো এখনো কিমের পেছনে লেগে আছেন।

সংবাদমাধ্যম হেরাল্ডের এক প্রতিবেদন বলছে, ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা সাধারণত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তাদের দাবি উপস্থাপন করে থাকেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ছবিতে কিমের কানের গঠন এবং হাসির সময় দাঁতের পাটির পার্থক্য দেখা যায়। এ ছাড়া মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে কিমের প্রায় ২০ কেজি ওজন কমানোকে অনেকে অসম্ভব বলে মনে করেন। তাদের দাবি, এ তো আসল কিম নয়।

বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো–২০১৭ সালের একটি ভিডিও। তাতে দেখা যায়, কিম দুজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছেন, যারা হুবহু তার মতো পোশাক পরা এবং দেখতেও অনেকটা তার মতোই। একে অনেকে ‘বডি ডাবল’ বা ছদ্মবেশীর মহড়া হিসেবে দেখেন। এখন পর্যন্ত সেটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বেশি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উন। ছবি: রয়টার্স
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উন। ছবি: রয়টার্স

তবে এসব ‘গুজবের’ বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস) ভিন্ন কথা বলছে। সংবাদমাধ্যম দ্য উইক বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং হাই-রেজুলেশন ভিডিও বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জানিয়েছে, কিম জং উনের কোনো ‘বডি ডাবল’ নেই। তারা কিমের ওজন পরিবর্তনের ট্র্যাকিং এবং মুখের বায়োমেট্রিক তথ্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছেন, এটি আসল কিম জং উনই, তার কোনো নকল নেই।

কিমের হাতের কবজিতে একবার একটি কালো দাগ দেখা গিয়েছিল, যাকে হৃদরোগের চিকিৎসার চিহ্ন হিসেবে মনে করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তার বডি ডাবলের শরীরে এমন চিহ্ন থাকার কথা নয়।

ইতিহাসে সাদ্দাম হোসেন বা অ্যাডলফ হিটলারের মতো একনায়কদের বডি ডাবল ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে। উত্তর কোরিয়াতেও কিম জং ইলের (কিমের বাবা) আমলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘পলিটিক্যাল ডেকয়’ বা প্রতিরূপ ব্যবহারের প্রথা ছিল বলে ধারণা করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিম জং উন হয়তো নিরাপত্তার খাতিরে জনাকীর্ণ স্থানে বা কুচকাওয়াজে নিজের ছদ্মবেশী ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা বা গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সভায় ‘ডাবল’ ব্যবহার করা কার্যত অসম্ভব। সংবাদমাধ্যম এবিসিনিউজের ২০২১ সালের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দক্ষিণ কোরীয় গোয়েন্দাদের এমন দাবির কথাই বলা হয়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ২০২৬ সালের শুরুতে কিম জং উন এবং তার মেয়ে কিম জু আয়ের ঘনঘন জনসমক্ষে উপস্থিতি এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব গণমাধ্যম কিমের ‘ডাবল’ খোঁজার চেয়ে তার ‘উত্তরসূরি’ নির্বাচনের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। এক্ষেত্রে তার মেয়ে ছাড়াও আর কোনো সন্তান রয়েছে কিনা–সেটি হতে পারে সবচেয়ে আলোচ্য। কেননা মেয়েকে উত্তরসূরি বানাতে চাওয়া কিম তাকে এতবার সামনে আনবেন বলে মনে হয় না। তিনি নিজেও বাবার ক্ষমতায় থাকার সময় আড়ালেই ছিলেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের করা ডকুমেন্টারি সেই বার্তাই দেয়।

গত জানুয়ারিতে উত্তর কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসে কিমকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী এবং সক্রিয় দেখা গেছে, যা বডি ডাবল-সংক্রান্ত জল্পনাকে বর্তমানে কিছুটা স্তিমিত করে রেখেছে। এ নিয়ে আলোচনা এখন আর ডালপালা মেলছে না।

সার কথা হলো, কিম জং উনের ‘বডি ডাবল’ সংক্রান্ত খবরগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধোঁয়াশা ও অস্পষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যদিও উত্তর কোরিয়া একটি ‘রুদ্ধদ্বার দেশ’ হওয়ার কারণে যেকোনো গুজব দ্রুত ডালপালা মেলে। তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও গোয়েন্দা তথ্য এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য ‘ডাবলের’ অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। মূলত তার ওজন পরিবর্তন এবং দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকাই এই রহস্যের প্রধান রসদ ছিল। এখন আর নতুন রসদ মিলছে না।

সম্পর্কিত