একসময় ডেঙ্গুকে বর্ষাকালের রোগ হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। শরৎ পেরিয়ে হেমন্তও যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখনো দেশে বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। আজ বৃহস্পতিবার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ছয়জন।
নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৪৬৩ জন। এর আগে চলতি বছরে এক দিনে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ৯ জনের মৃত্যুর রেকর্ড হয় গত ৮ সেপ্টেম্বর। এ দিন হাসপাতালে ভর্তিও হয়েছিলেন রেকর্ড ১ হাজার ৫৭১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত মোট ১৩৯ জন মারা গেছেন। আর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৮ হাজার ৪৩০ জন।
এখন প্রশ্ন হলো দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ?
গতকাল বুধবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে জানিয়েছেন-ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ—এই পাঁচ বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’। এসব বিভাগে আক্রান্ত রোগী এবং এডিস মশার লার্ভার উৎপত্তিস্থল বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলেও তথ্য দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
এ ছাড়াও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, আইএফআরসির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয় বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে যেসব জেলা ও শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, সেখানকার স্বাস্থ্যসেবায় এই চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেঙ্গুর গুরুতর রোগী ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ায় হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা, রক্ত সঞ্চালন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর চাহিদাও বেড়েছে। তবে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ডেঙ্গু শনাক্তের এনএস১ দ্রুত পরীক্ষার কিট, স্যালাইন, রোগীর শয্যার পাশে ব্যবহারের আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্র, হেমাটোক্রিট পরীক্ষার সক্ষমতা, রক্তের ব্যাগ এবং অ্যাফেরেসিস কিটের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে গুরুতর ডেঙ্গু রোগীদের দ্রুত শনাক্ত, শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সও জানিয়েছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়ছে এবং শয্যার সংকট দেখা দিচ্ছে।
বাড়ছে মানুষের আর্থিক চাপও
ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাব আক্রান্ত মানুষের জীবনে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি নানা ধরনের আর্থিক চাপও তৈরি করছে বলে উল্লেখ করা বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট, আইএফআরসির প্রতিবেদনে। বলা হয় হাসপাতালে ভর্তি, যাতায়াত, রোগীর দেখাশোনা এবং অসুস্থতার কারণে কাজ করতে না পারায় পরিবারের ওপর বাড়তি খরচ ও আয় হারানোর চাপ পড়ছে।
দেশের আটটি বিভাগেই দ্রুত ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা থাকায় সামনে আরও সংক্রমণ ও গুরুতর রোগীর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সচেতনতা, শিক্ষা ও তথ্য প্রচারের উপকরণের ঘাটতি এবং কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় পরিবার পর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধের উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
আবহাওয়াও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভারী বৃষ্টিপাত, বেশি আর্দ্রতা ও উষ্ণ তাপমাত্রার মতো অনুকূল আবহাওয়া আগামী কয়েক সপ্তাহেও মশার বংশবিস্তার ও ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এর আগে বাংলাদেশে বড় ধরনের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের পেছনে এসব পরিবেশগত পরিস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপের এই সময়ে নিম্নআয়ের পরিবার, শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যারা স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এসব মানুষের ক্ষেত্রে অসুস্থতার পাশাপাশি চিকিৎসার খরচ, আয় হারানো এবং গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কাও বাড়ছে।
কেন কমছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ?
ডেঙ্গু কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন চরচাকে বলেন, “ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা গেল না, কারণ আমরা শুধুমাত্র হাসপাতালের আইসিইউ নিয়েই চিন্তিত আছি৷। এটা কমিউনিটিভিত্তিক নিবিড় কাজের মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা যে মাঝেমাঝে রাসায়নিক ছিটানো দেখি, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক আকারে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের নেতৃত্বে যে পরিচ্ছন্ন অভিযান হওয়ার কথা আছে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর, তা যেন সফল হয়। আর সে দলে যেন কীটতত্ত্ববিদ থাকে, রোগতত্ত্ববিদরা যেন থাকেন, সে দলে যেন পরিবেশবিদরা থাকে, চিকিৎসকরাও যেন থাকে।”
তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টানা কয়েকবছর কাজ করে যেতে হবে জানিয়ে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, “ (এডিস মশা) একসময় পরিষ্কার জমাট বাঁধা পানিতে ডিম পাড়তে। কিন্তু এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে এডিস মশা ঘোলা পানিতেও ডিম পাড়ে।” এমনকি লবণাক্ত পানি ও খাল-বিলেও লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান ডা. মুশতাক। আর তাই, উপকূলীয় অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে।