বিবিসির প্রতিবেদন
এশিয়া মহাদেশ থেকে যে নয়টি দল এবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে, তাদের দিকে তাকালেই বোঝা যায় ভারতের সামনের পথটা কতটা কঠিন।
চরচা ডেস্ক

ভারত কি কখনো ফিফা বিশ্বকাপে খেলতে পারবে?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়েছে গত সপ্তাহে। আর এর সঙ্গেই ফিরে এসেছে ভারতীয় ফুটবল ভক্তদের সেই পরিচিত আক্ষেপ।
যারা বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় ফুটবল অনুসরণ করছেন তাদের কাছে এই প্রশ্নটি বড় ক্লিশে। ভারত যে কখনোই বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের এশীয় অঞ্চলের প্রাথমিক গণ্ডিই পার হতে পারেনি।
তবে আসল পরিহাসটা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও গোয়ার মতো ফুটবল-পাগল রাজ্যগুলোতে বিশ্বকাপ নিয়ে যে বিপুল উন্মাদনা দেখা যায়, তা দেখার মতো। এমনকি বিশ্বকাপে ভারতের কোনো অংশগ্রহণ না থাকা সত্ত্বেও, সরাসরি খেলা কভার করার জন্য দিন দিন ভারতীয় ‘অ্যাক্রেডিটেড’ সাংবাদিকদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
চারটি বিশ্বকাপ কাভার করা এক সিনিয়র ভারতীয় ফুটবল সাংবাদিক রসিকতা করে বলেন, “প্রেস বক্সে আমাদের প্রায়ই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়–ভারত কি আদৌ ফুটবল খেলে? তাদের বেশিরভাগই আমাদের ক্রিকেট-খেলুড়ে দেশ হিসেবে চেনে।”
শুধু ভারতই নয়, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশ প্রতিবেশী চীনও এবার বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, বিপুল জনসংখ্যার চীন বিশ্বকাপেই কোয়ালিফাই করেছে মাত্র একবার। তাও ২৪ বছর আগে, ২০০২ সালে।
আমাদের যা অভাব তা হলো, একটি সঠিক পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’। কারণ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের কোনো বড় কর্মসূচি নেই। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলীয় খেলা, তাই এর ফলাফল দেখতে আমাদের সময় দিতে হবে।
ফিফা এই বিশাল বাজারগুলোর গুরুত্ব খুব ভালো করেই জানে। আর তাই, ম্যাচের লাইভ সম্প্রচারের শেষ মুহূর্তের চুক্তি নিশ্চিত করতে ফিফা ভারতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মিডিয়া রাইটস টিম পাঠিয়েছিল।
ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা ও সাবেক জাতীয় অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া মনে করেন, ভারতের বিশ্বকাপে খেলা অসম্ভব নয়। তবে এর কোনো সহজ কোনো রাস্তা নেই।
বাইচুং বলেন, “হ্যাঁ, ভারত অবশ্যই (বিশ্বকাপে) খেলতে পারে, কারণ কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ৪৮ দলের নতুন এবং বড় ফরম্যাটে এশিয়ার কোটা বেড়ে এখন আটটি হয়েছে। সঙ্গে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফ জিতে আসা নবম দল হিসেবে ইরাকও এবার খেলছে। উজবেকিস্তান ও জর্ডানের মতো দলগুলো খেলছে। তবে এর জন্য সুন্দর পরিকল্পনা প্রয়োজন।”
ভুটিয়া আরও যোগ করেন, ভারতের মতো এত বড় দেশে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। তিনি বলেন, “আমাদের যা অভাব তা হলো, একটি সঠিক পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’। কারণ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের কোনো বড় কর্মসূচি নেই। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলীয় খেলা, তাই এর ফলাফল দেখতে আমাদের সময় দিতে হবে।”
১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমসে ভারতকে ব্রোঞ্জ জেতাতে সাহায্য করেছিলেন শ্যাম থাপা (৭৮)। ওটাই ছিল মহাদেশীয় পর্যায়ে ভারতের শেষ বড় সাফল্য। তিনিও একটি ধারাবাহিক তৃণমূল কর্মসূচির ওপর জোর দিয়ে বলেন, মূল চাবিকাঠি হলো আরও বেশি সংখ্যক শিশুকে এই খেলায় নিয়ে আসা।
তার কণ্ঠস্বরে বিরক্তির ছাপ ছিল স্পষ্ট। বাইসাইকেল-কিকের জন্য বিখ্যাত এই স্ট্রাইকার আক্ষেপ করে বলেন, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত অভিভাবকেরা দিন দিন তাদের সন্তানদের ফুটবল থেকে দূরে সরিয়ে ক্রিকেটের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
শ্যাম থাপা বলেন, “আমি নিজে বছরের পর বছর ধরে একটি যুব একাডেমি চালিয়েছি। আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যত বেশি ছোট শিশু এই খেলায় আসবে, তত বেশি উজ্জ্বল প্রতিভা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কিন্তু অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ) এমন একটি ব্যবস্থা চালু করার জন্য কী করেছে?”

এই খেলোয়াড় আরও যোগ করেন, অনেক ভারতীয় অভিভাবক তাদের সন্তানদের ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছেন এই আশায় যে, তারা হয়তো কোনো দিন একটি ‘লাভজনক আইপিএল (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ) চুক্তি’ পাবে।
তিনি বলেন, “তাদের বুঝতে হবে যে, ফুটবলেও যদি ক্যারিয়ার গড়া যায়, তবে সেখানেও ভালো টাকা আছে।”
এশিয়া মহাদেশ থেকে যে নয়টি দল এবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে, তাদের দিকে তাকালেই বোঝা যায় ভারতের সামনের পথটা কতটা কঠিন।
এই দলগুলো হলো–অস্ট্রেলিয়া, ইরান, জাপান, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, উজবেকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব ও ইরাক (প্লে-অফ খেলে)। এর মধ্যে জর্ডান ও উজবেকিস্তান এই প্রথম বিশ্বকাপে পা রাখল।
এই দুই নবাগত দলই বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ভারতের চেয়ে অনেক উপরে রয়েছে।
উজবেকিস্তানের র্যাঙ্কিং যেখানে ৫২ এবং জর্ডানের ৬৩, সেখানে গত ১৮ মাসে চরম অবনতির পর ভারত পিছিয়ে ১৩৬ নম্বরে নেমে গেছে।
এই র্যাঙ্কিংই বলে দেয় ভারতীয় ফুটবলের চ্যালেঞ্জটা কতটা বিশাল। ২০২২ সালে এআইএফএফ সভাপতি হওয়ার পর সাবেক ফুটবলার কল্যাণ চৌবে বলেছিলেন, “আমি এমন স্বপ্ন বিক্রি করব না যে ভারত আট বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে খেলবে। বরং আমি বলব, আমরা ভারতীয় ফুটবলকে তার বর্তমান অবস্থা থেকে এগিয়ে নিয়ে যাব।”
প্রায় চার বছর পর এখন প্রশ্ন উঠছে, তার প্রশাসন কি সত্যিই তা করতে পেরেছে?
ভারতীয় ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, অনেকের মতে গত তিন বছরে এআইএফএফ নিজেকে একটি হাসির পাত্রে পরিণত করেছে।
২০১৪ সালে ফেডারেশন বেশ ধুমধাম করে একটি ঘরোয়া ক্লাবভিত্তিক টুর্নামেন্ট ‘ইন্ডিয়ান সুপার লিগ’ (আইএসএল) চালু করেছিল। এতে ব্যবসা, বলিউড ও ক্রিকেটের বড় বড় ব্যক্তিত্বকে যুক্ত করা হয়। এ টুর্নামেন্ট পেশাদারভাবে চালানো হতো এবং ভালো বিদেশি খেলোয়াড়দের আকর্ষণ করত। কিন্তু এখন এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
আমাদের এক এক পা করে এগোতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করা। কারণ এটি আমাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ দেবে। আমরা যখন এশিয়ার সেরা ১৫-২০টি দেশের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, কেবল তখনই আমরা বিশ্বকাপের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারব।
আইএসএল-এর সর্বশেষ আসরটি শুরু হতে অনেক দেরি হয়েছিল। কারণ এআইএফএফ কোনো স্পন্সর খুঁজে পায়নি। এর ফলে শত শত ফুটবলারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং চারপাশে নেতিবাচক প্রচার ছড়ায়।
শেষ পর্যন্ত ফেডারেশন কোনো বাণিজ্যিক অংশীদার ছাড়াই একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ চালাতে বাধ্য হয়। এবং আগামী মৌসুমের জন্য তারা এখন আবার নতুন করে পরিকল্পনা শুরু করেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে, চৌবের ‘ভিশন ২০৪৭’–কে একটি ‘ভুলে যাওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির’ মতো মনে হচ্ছে। এর লক্ষ্য ছিল ৩৫ কোটি শিশুকে ফুটবলে নিয়ে আসা। আর বড় বড় লক্ষ্যের সাথে মাঠের পারফরম্যান্সের দূরত্ব কেবল বেড়েই চলেছে।
২০২৩ সালে একটি সংক্ষিপ্ত সুসময় দেখা গিয়েছিল। একটি আমন্ত্রিত টুর্নামেন্ট এবং সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর পুরুষদের সিনিয়র দল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০-র মধ্যে ফিরে এসেছিল। কিন্তু এরপর থেকে সেই অর্জনগুলো অনেকটাই ভেস্তে গেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের এশিয়ান অঞ্চলের বাছাইপর্বের তৃতীয় রাউন্ডে ওঠার আশা জাগিয়েও দল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এরপর আগামী বছরের এএফসি এশিয়ান কাপে যোগ্যতা অর্জন করতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে।
আপাতত, ২৪টি সেরা দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এশিয়ান কাপের টিকিট পাওয়াই ভারতের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
কয়েক বছর আগে সাংবাদিকদের সাথে এক অনানুষ্ঠানিক আড্ডায় সাবেক অধিনায়ক সুনীল ছেত্রী (যিনি ২০২৫ সালে অবসর ভেঙে মাঠে ফিরেছেন) বলেছিলেন, লক্ষ্য সবসময় বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত।
ছেত্রী বলেন, “আমাদের এক এক পা করে এগোতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করা। কারণ এটি আমাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ দেবে। আমরা যখন এশিয়ার সেরা ১৫-২০টি দেশের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, কেবল তখনই আমরা বিশ্বকাপের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারব।”
আপাতত ভবিষ্যৎ বেশ অন্ধকার দেখাচ্ছে। যদিও এআইএফএফ নেতৃত্ব একটি নীতি পরিবর্তনের জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা চাইছে যাতে প্রবাসী ভারতীয়রা ভারতের হয়ে খেলার অনুমতি পায়।
বর্তমানে বিদেশি পাসপোর্টধারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দেশের হয়ে খেলতে হলে সেই বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া রায়ান উইলিয়ামস ঠিক সেটাই করেছিলেন এবং ভারতের জার্সিতে দারুণ শুরু করে দ্রুতই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন।
যদি এই নীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়, তবে তা একটি বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
শুধুমাত্র এই বিশ্বকাপেই চারজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। কাতারের হয়ে তাহসিন মোহাম্মদ, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিশান ভেলুপিল্লে, নিউজিল্যান্ডের হয়ে সারপ্রীত সিং এবং কঙ্গোর হয়ে স্যামুয়েল মুতুসামি।
তবে আপাতত এই সবকিছুই কেবল সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে।
যতদিন না এটি সত্যি হচ্ছে, ততদিন ভারতীয় ভক্তরা দূর থেকেই খেলা দেখবে। তারা মেসি, রোনালদো ও নেইমারদের জন্য গলা ফাটাবে। আর কুরাসাওয়ের মতো দেশের সাফল্য দেখে অবাক হবে, যা বিশ্বকাপে পৌঁছানো এ যাবৎকালের সবচেয়ে ছোট দেশ।
আর তখনই সেই চিরন্তন প্রশ্নটি আবার মনে জাগবে: কুরাসাও যদি পারে, তবে ভারত কেন নয়?

ভারত কি কখনো ফিফা বিশ্বকাপে খেলতে পারবে?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়েছে গত সপ্তাহে। আর এর সঙ্গেই ফিরে এসেছে ভারতীয় ফুটবল ভক্তদের সেই পরিচিত আক্ষেপ।
যারা বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় ফুটবল অনুসরণ করছেন তাদের কাছে এই প্রশ্নটি বড় ক্লিশে। ভারত যে কখনোই বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের এশীয় অঞ্চলের প্রাথমিক গণ্ডিই পার হতে পারেনি।
তবে আসল পরিহাসটা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও গোয়ার মতো ফুটবল-পাগল রাজ্যগুলোতে বিশ্বকাপ নিয়ে যে বিপুল উন্মাদনা দেখা যায়, তা দেখার মতো। এমনকি বিশ্বকাপে ভারতের কোনো অংশগ্রহণ না থাকা সত্ত্বেও, সরাসরি খেলা কভার করার জন্য দিন দিন ভারতীয় ‘অ্যাক্রেডিটেড’ সাংবাদিকদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
চারটি বিশ্বকাপ কাভার করা এক সিনিয়র ভারতীয় ফুটবল সাংবাদিক রসিকতা করে বলেন, “প্রেস বক্সে আমাদের প্রায়ই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়–ভারত কি আদৌ ফুটবল খেলে? তাদের বেশিরভাগই আমাদের ক্রিকেট-খেলুড়ে দেশ হিসেবে চেনে।”
শুধু ভারতই নয়, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশ প্রতিবেশী চীনও এবার বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, বিপুল জনসংখ্যার চীন বিশ্বকাপেই কোয়ালিফাই করেছে মাত্র একবার। তাও ২৪ বছর আগে, ২০০২ সালে।
আমাদের যা অভাব তা হলো, একটি সঠিক পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’। কারণ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের কোনো বড় কর্মসূচি নেই। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলীয় খেলা, তাই এর ফলাফল দেখতে আমাদের সময় দিতে হবে।
ফিফা এই বিশাল বাজারগুলোর গুরুত্ব খুব ভালো করেই জানে। আর তাই, ম্যাচের লাইভ সম্প্রচারের শেষ মুহূর্তের চুক্তি নিশ্চিত করতে ফিফা ভারতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মিডিয়া রাইটস টিম পাঠিয়েছিল।
ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা ও সাবেক জাতীয় অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া মনে করেন, ভারতের বিশ্বকাপে খেলা অসম্ভব নয়। তবে এর কোনো সহজ কোনো রাস্তা নেই।
বাইচুং বলেন, “হ্যাঁ, ভারত অবশ্যই (বিশ্বকাপে) খেলতে পারে, কারণ কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ৪৮ দলের নতুন এবং বড় ফরম্যাটে এশিয়ার কোটা বেড়ে এখন আটটি হয়েছে। সঙ্গে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফ জিতে আসা নবম দল হিসেবে ইরাকও এবার খেলছে। উজবেকিস্তান ও জর্ডানের মতো দলগুলো খেলছে। তবে এর জন্য সুন্দর পরিকল্পনা প্রয়োজন।”
ভুটিয়া আরও যোগ করেন, ভারতের মতো এত বড় দেশে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। তিনি বলেন, “আমাদের যা অভাব তা হলো, একটি সঠিক পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’। কারণ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের কোনো বড় কর্মসূচি নেই। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলীয় খেলা, তাই এর ফলাফল দেখতে আমাদের সময় দিতে হবে।”
১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমসে ভারতকে ব্রোঞ্জ জেতাতে সাহায্য করেছিলেন শ্যাম থাপা (৭৮)। ওটাই ছিল মহাদেশীয় পর্যায়ে ভারতের শেষ বড় সাফল্য। তিনিও একটি ধারাবাহিক তৃণমূল কর্মসূচির ওপর জোর দিয়ে বলেন, মূল চাবিকাঠি হলো আরও বেশি সংখ্যক শিশুকে এই খেলায় নিয়ে আসা।
তার কণ্ঠস্বরে বিরক্তির ছাপ ছিল স্পষ্ট। বাইসাইকেল-কিকের জন্য বিখ্যাত এই স্ট্রাইকার আক্ষেপ করে বলেন, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত অভিভাবকেরা দিন দিন তাদের সন্তানদের ফুটবল থেকে দূরে সরিয়ে ক্রিকেটের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
শ্যাম থাপা বলেন, “আমি নিজে বছরের পর বছর ধরে একটি যুব একাডেমি চালিয়েছি। আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যত বেশি ছোট শিশু এই খেলায় আসবে, তত বেশি উজ্জ্বল প্রতিভা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কিন্তু অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ) এমন একটি ব্যবস্থা চালু করার জন্য কী করেছে?”

এই খেলোয়াড় আরও যোগ করেন, অনেক ভারতীয় অভিভাবক তাদের সন্তানদের ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছেন এই আশায় যে, তারা হয়তো কোনো দিন একটি ‘লাভজনক আইপিএল (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ) চুক্তি’ পাবে।
তিনি বলেন, “তাদের বুঝতে হবে যে, ফুটবলেও যদি ক্যারিয়ার গড়া যায়, তবে সেখানেও ভালো টাকা আছে।”
এশিয়া মহাদেশ থেকে যে নয়টি দল এবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে, তাদের দিকে তাকালেই বোঝা যায় ভারতের সামনের পথটা কতটা কঠিন।
এই দলগুলো হলো–অস্ট্রেলিয়া, ইরান, জাপান, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, উজবেকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব ও ইরাক (প্লে-অফ খেলে)। এর মধ্যে জর্ডান ও উজবেকিস্তান এই প্রথম বিশ্বকাপে পা রাখল।
এই দুই নবাগত দলই বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ভারতের চেয়ে অনেক উপরে রয়েছে।
উজবেকিস্তানের র্যাঙ্কিং যেখানে ৫২ এবং জর্ডানের ৬৩, সেখানে গত ১৮ মাসে চরম অবনতির পর ভারত পিছিয়ে ১৩৬ নম্বরে নেমে গেছে।
এই র্যাঙ্কিংই বলে দেয় ভারতীয় ফুটবলের চ্যালেঞ্জটা কতটা বিশাল। ২০২২ সালে এআইএফএফ সভাপতি হওয়ার পর সাবেক ফুটবলার কল্যাণ চৌবে বলেছিলেন, “আমি এমন স্বপ্ন বিক্রি করব না যে ভারত আট বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে খেলবে। বরং আমি বলব, আমরা ভারতীয় ফুটবলকে তার বর্তমান অবস্থা থেকে এগিয়ে নিয়ে যাব।”
প্রায় চার বছর পর এখন প্রশ্ন উঠছে, তার প্রশাসন কি সত্যিই তা করতে পেরেছে?
ভারতীয় ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, অনেকের মতে গত তিন বছরে এআইএফএফ নিজেকে একটি হাসির পাত্রে পরিণত করেছে।
২০১৪ সালে ফেডারেশন বেশ ধুমধাম করে একটি ঘরোয়া ক্লাবভিত্তিক টুর্নামেন্ট ‘ইন্ডিয়ান সুপার লিগ’ (আইএসএল) চালু করেছিল। এতে ব্যবসা, বলিউড ও ক্রিকেটের বড় বড় ব্যক্তিত্বকে যুক্ত করা হয়। এ টুর্নামেন্ট পেশাদারভাবে চালানো হতো এবং ভালো বিদেশি খেলোয়াড়দের আকর্ষণ করত। কিন্তু এখন এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
আমাদের এক এক পা করে এগোতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করা। কারণ এটি আমাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ দেবে। আমরা যখন এশিয়ার সেরা ১৫-২০টি দেশের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, কেবল তখনই আমরা বিশ্বকাপের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারব।
আইএসএল-এর সর্বশেষ আসরটি শুরু হতে অনেক দেরি হয়েছিল। কারণ এআইএফএফ কোনো স্পন্সর খুঁজে পায়নি। এর ফলে শত শত ফুটবলারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং চারপাশে নেতিবাচক প্রচার ছড়ায়।
শেষ পর্যন্ত ফেডারেশন কোনো বাণিজ্যিক অংশীদার ছাড়াই একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ চালাতে বাধ্য হয়। এবং আগামী মৌসুমের জন্য তারা এখন আবার নতুন করে পরিকল্পনা শুরু করেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে, চৌবের ‘ভিশন ২০৪৭’–কে একটি ‘ভুলে যাওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির’ মতো মনে হচ্ছে। এর লক্ষ্য ছিল ৩৫ কোটি শিশুকে ফুটবলে নিয়ে আসা। আর বড় বড় লক্ষ্যের সাথে মাঠের পারফরম্যান্সের দূরত্ব কেবল বেড়েই চলেছে।
২০২৩ সালে একটি সংক্ষিপ্ত সুসময় দেখা গিয়েছিল। একটি আমন্ত্রিত টুর্নামেন্ট এবং সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর পুরুষদের সিনিয়র দল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০-র মধ্যে ফিরে এসেছিল। কিন্তু এরপর থেকে সেই অর্জনগুলো অনেকটাই ভেস্তে গেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের এশিয়ান অঞ্চলের বাছাইপর্বের তৃতীয় রাউন্ডে ওঠার আশা জাগিয়েও দল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এরপর আগামী বছরের এএফসি এশিয়ান কাপে যোগ্যতা অর্জন করতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে।
আপাতত, ২৪টি সেরা দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এশিয়ান কাপের টিকিট পাওয়াই ভারতের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
কয়েক বছর আগে সাংবাদিকদের সাথে এক অনানুষ্ঠানিক আড্ডায় সাবেক অধিনায়ক সুনীল ছেত্রী (যিনি ২০২৫ সালে অবসর ভেঙে মাঠে ফিরেছেন) বলেছিলেন, লক্ষ্য সবসময় বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত।
ছেত্রী বলেন, “আমাদের এক এক পা করে এগোতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করা। কারণ এটি আমাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ দেবে। আমরা যখন এশিয়ার সেরা ১৫-২০টি দেশের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, কেবল তখনই আমরা বিশ্বকাপের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারব।”
আপাতত ভবিষ্যৎ বেশ অন্ধকার দেখাচ্ছে। যদিও এআইএফএফ নেতৃত্ব একটি নীতি পরিবর্তনের জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা চাইছে যাতে প্রবাসী ভারতীয়রা ভারতের হয়ে খেলার অনুমতি পায়।
বর্তমানে বিদেশি পাসপোর্টধারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দেশের হয়ে খেলতে হলে সেই বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া রায়ান উইলিয়ামস ঠিক সেটাই করেছিলেন এবং ভারতের জার্সিতে দারুণ শুরু করে দ্রুতই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন।
যদি এই নীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়, তবে তা একটি বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
শুধুমাত্র এই বিশ্বকাপেই চারজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। কাতারের হয়ে তাহসিন মোহাম্মদ, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিশান ভেলুপিল্লে, নিউজিল্যান্ডের হয়ে সারপ্রীত সিং এবং কঙ্গোর হয়ে স্যামুয়েল মুতুসামি।
তবে আপাতত এই সবকিছুই কেবল সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে।
যতদিন না এটি সত্যি হচ্ছে, ততদিন ভারতীয় ভক্তরা দূর থেকেই খেলা দেখবে। তারা মেসি, রোনালদো ও নেইমারদের জন্য গলা ফাটাবে। আর কুরাসাওয়ের মতো দেশের সাফল্য দেখে অবাক হবে, যা বিশ্বকাপে পৌঁছানো এ যাবৎকালের সবচেয়ে ছোট দেশ।
আর তখনই সেই চিরন্তন প্রশ্নটি আবার মনে জাগবে: কুরাসাও যদি পারে, তবে ভারত কেন নয়?

খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, আমেরিকা ইরানকে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিক্রির অনুমতি দেবে। এ ছাড়া পরবর্তী আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারলে ইরান ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি উন্নয়ন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে। তবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে–সে বিষয়ে এই

১৯৩৮-এর ইতালির পর টানা দুই বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি শুধু পেলে-গারিঞ্চার ব্রাজিলই গড়তে পেরেছে। এরপর ৬৪ বছর প্রতি চার বছর পরপর ভিন্ন কারও গলায়ই বিশ্বজয়ের মালা তুলে দিয়েছে। আর্জেন্টিনা কি এবার ছয় দশকেরও বেশি আগে ব্রাজিলের এঁকে দেওয়া পথের ধুলো সরিয়ে রাস্তা তৈরি করতে পারবে?