আল জাজিরার বিশ্লেষণ
চরচা ডেস্ক

২৪ বছর বয়সী সীমা আক্তার। ফুটবল অনুশীলনের সময় তার বন্ধু তাকে একটা খবর দিল, বাংলাদেশের পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফাঁসির দণ্ড হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রীর কাছে এটা ছিল প্রতিশোধের একটা মুহূর্ত।
গত বছর হাসিনার নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন অভিযান চালালে সীমার বেশ কয়েকজন বন্ধু নিহত হন। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান। ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়াদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন।
সীমা আক্তার শেখ হাসিনাকে বলেন, “ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভেবেছিল তাকে কেউ হারাতে পারবেন না, তিনি চিরকাল রাজত্ব করবে। তার ফাঁসির দণ্ড আমাদের শহীদদের জন্য ন্যায়বিচারের দিকে একটা পদক্ষেপ।”
তবে সীমা বলেন, শুধু দণ্ড ঘোষণা যথেষ্ট নয়। আমরা তারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দেখতে চাই! তবে এটা সহজে হবে না।

২০২৪ সালের আগস্টে বিক্ষোভকারীরা শেখ হাসিনার বাসভবনে হামলা করলে তিনি ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। এখনও তিনি ফাঁসির মঞ্চ থেকে অনেক দূরে, ভারতের নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশ বারবার তাকে হাস্তান্তরের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করছে। এদিকে ভারতে তার উপস্থিতি গত ১৫ মাস ধরে দিল্লি ঢাকা উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন হাসিনা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ায় এই উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
যদিও ভারত হাসিনা পরবর্তী ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, নয়াদিল্লি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ডের মুখে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে, এমন কোনো পরিস্থিতি তারা কল্পনা করতে পারছেন না।
ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, “নয়াদিল্লি কীভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে?”
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতা থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৯৬ সালে। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ক্ষমতার বাইরে চলে যান, আবার ২০০৯ সালে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরে পরপর ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকেন। এই সময়ে বিরোধী দলগুলো প্রায়শই নির্বাচন বর্জন করে কিংবা অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। তারা শাসনামলে হাজার হাজার মানুষকে জোর করে গুম করার অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, অনেককে বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হয়েছে। ওই সময় নির্যাতনের ঘটনা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং বিরোধীদের বিচার ছাড়াই কারাগারে পাঠানো হতো।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনা তার সরকার অর্থনৈতিক সাফল্য দেখিয়ে শাসনের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করত। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার যে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অভিহিত করেছিলেন, সেই দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং মাথাপিছু আয়ে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযুদ্ধের বংশধরদের জন্য কোটা নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন নিরাপত্তা বাহিনীর নির্মম দমনের পর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলন একসময় শেখ হাসিনার পদত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকায় ছাত্র বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। জাতিসংঘের হিসেবে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়।

ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যান। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ইউনূসের সরকার এরপর থেকে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ নয়াদিল্লির প্রতি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে।
শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে সুর আরও চড়িয়েছে। মন্ত্রণালয় ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির কথা উল্লেখ করে বলেছে, হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো নয়াদিল্লির জন্য একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। তারা আরও বলেছে, হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রাখলে তা হবে ‘অত্যন্ত অবান্ধব আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞা’।
কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, প্রত্যর্পণ চুক্তিতে একটি ব্যতিক্রম আছে যদি অপরাধী রাজনৈতিক হয়, তাহলে প্রত্যর্পণ বাধ্যতামূলক নয়।
নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক সঞ্জয় ভারদ্বাজ বলেন, ভারত এটাকে (হাসিনার মামলা) বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছে।
ভারদ্বাজের মতে, নয়াদিল্লির চোখে আজ বাংলাদেশ ‘ভারত বিরোধী শক্তি’ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ইউনূস বারবার ভারতের সমালোচনা করেছেন, আর হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা আন্দোলনের নেতারা প্রায়শই নয়াদিল্লিকে হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য দোষারোপ করেন। এই পটভূমিতে হাসিনাকে ফেরত দেওয়া মানে ভারত বিরোধীদের বৈধতা দেওয়া হয়ে যাবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা হাসিনার বিরুদ্ধে রায় নোট করেছে এবং নয়াদিল্লি সব পক্ষের সঙ্গেই গঠনমূলক সম্পর্ক রাখবে।
কিন্তু বাস্তবে নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক এখন হিমশীতল। হাসিনার আমলে যে সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জোট ছিল, তা এখন অবিশ্বাসে ভরা সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়েছে।
সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মতে, এই পরিস্থিতি শিগগিরই বদলাবে না।
তিনি বলেন, এই সরকারের আমলে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ থাকবে, কারণ তারা বারবার বলতে থাকবে যে, ভারত হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে না।
তবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন হওয়ার কথা, তা নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। যদিও হাসিনার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং বেশিরভাগ বড় দল বিশেষ করে বিএনপি ভারতের সমালোচক, তবু নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করা ভারতের জন্য সহজ হবে।
পিনাক বলেন, “এভাবে চলতে পারে না, ঢাকায় আমাদের একটা নির্বাচিত সরকার দরকার। ভারতকে অপেক্ষা করতে হবে, কিন্তু বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলোতে সদিচ্ছা বজায় রাখতে হবে।”
জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত বলেন, হাসিনা প্রশ্নে ভারত দ্বিধায় পড়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে জনরোষের কথা তারা অস্বীকার করে না। আদর্শ পরিস্থিতিতে ভারত চাইবে আওয়ামী লীগ কোনো একসময় আবার ক্ষমতায় ফিরুক।
তবে বিশ্লেষকরা এও বলছেন, বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশ হাসিনাকে আর কখনো সুযোগ দেবে না এটা ভারতকে মেনে নিতে হবে। পরিবর্তে ঢাকার অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে।
শ্রীরাধা দত্ত বলেন, “ভারতের সেখানকার অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক কখনো ছিল না। কিন্তু এখন তা বদলাতে হবে। বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। কিন্তু হাসিনা প্রত্যর্পণের এই একটি এজেন্ডার বাইরে আমাদের এগোতে হবে।”
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশ দুটির মধ্যে চার হাজার কিলোমিটারের সীমান্ত আছে। চীনের পরই ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক সঙ্গী। উত্তেজনা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বেড়েছে।
কিন্তু ভারত দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে, তাদের সম্পর্ক বাংলাদেশের সঙ্গে। কোনো দল বা নেতার সঙ্গে নয়। তবু বাস্তবে তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে।

১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ভারতের সহায়তায় শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশে রূপান্তরিত করেন। পাকিস্তানের বিভক্তি ভারতের জন্য একটি বড় কৌশলগত ও নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করেছিল।
হাসিনার সঙ্গে ভারতের ব্যক্তিগত সম্পর্কও প্রায় সমান পুরনো। ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। তবে তিনি ও তার ছোট বোন রেহানা জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান। তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদের আশ্রয় দেন। হাসিনা স্বামী এম এ ওয়াজেদ, সন্তান ও রেহানাকে নিয়ে নয়াদিল্লিতে একাধিক বাড়িতে থেকেছেন এবং আকাশবাণীর বাংলা বিভাগেও কাজ করেছেন।
ছয় বছর নির্বাসনের পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে বাবার দলের নেতৃত্ব নেন। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ও ২০০৯ থেকে দ্বিতীয়বার দীর্ঘ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন। তার শাসনকালে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উত্তরোত্তর ফুলেফেঁপে উঠলেও দেশের ভেতরে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ‘অন্যায্য’ চুক্তির জন্য সমালোচনার মুখে পড়েন।
ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালানোর সময় তার গন্তব্য নিয়ে কারও সন্দেহ ছিল না। নয়াদিল্লির কাছে অবতরণের পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাকে গ্রহণ করেন।
সাবেক ভারতীয় দূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, “এবার আমরা হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাইনি। তিনি তখনও ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাই একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্বাভাবিকভাবেই তাকে গ্রহণ করেছেন। আর অন্য কোনো বিকল্পও ছিল না।”
ভারতের সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, “এখন তো তার ফাঁসির আদেশ হয়ে গেছে-তিনি কি বাংলাদেশে ফিরতে পারেন? তিনি ভারতের বন্ধু ছিলেন, ভারতের নৈতিক অবস্থান নিতেই হবে।”
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, হাসিনার ভারতে থাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কাঁটা হয়ে থাকবে। তবে এর মাধ্যমে ভারত তার মিত্রদের প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এর রাজনৈতিক লাভও হতে পারে বলে কুগেলম্যান মনে করেন। অন্য বিশ্লেষকদের থেকে ভিন্নমত দিয়ে তিনি বলেন, হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস দেখিয়েছে, পরিবারভিত্তিক দলগুলো কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেলেও একবারে ধ্বংস হয় না। ধৈর্য ধরলে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে তাদের আবার ফিরে আসার পথ খুলতে পারে।

২৪ বছর বয়সী সীমা আক্তার। ফুটবল অনুশীলনের সময় তার বন্ধু তাকে একটা খবর দিল, বাংলাদেশের পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফাঁসির দণ্ড হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রীর কাছে এটা ছিল প্রতিশোধের একটা মুহূর্ত।
গত বছর হাসিনার নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন অভিযান চালালে সীমার বেশ কয়েকজন বন্ধু নিহত হন। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান। ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়াদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন।
সীমা আক্তার শেখ হাসিনাকে বলেন, “ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভেবেছিল তাকে কেউ হারাতে পারবেন না, তিনি চিরকাল রাজত্ব করবে। তার ফাঁসির দণ্ড আমাদের শহীদদের জন্য ন্যায়বিচারের দিকে একটা পদক্ষেপ।”
তবে সীমা বলেন, শুধু দণ্ড ঘোষণা যথেষ্ট নয়। আমরা তারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দেখতে চাই! তবে এটা সহজে হবে না।

২০২৪ সালের আগস্টে বিক্ষোভকারীরা শেখ হাসিনার বাসভবনে হামলা করলে তিনি ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। এখনও তিনি ফাঁসির মঞ্চ থেকে অনেক দূরে, ভারতের নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশ বারবার তাকে হাস্তান্তরের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করছে। এদিকে ভারতে তার উপস্থিতি গত ১৫ মাস ধরে দিল্লি ঢাকা উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন হাসিনা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ায় এই উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
যদিও ভারত হাসিনা পরবর্তী ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, নয়াদিল্লি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ডের মুখে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে, এমন কোনো পরিস্থিতি তারা কল্পনা করতে পারছেন না।
ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, “নয়াদিল্লি কীভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে?”
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতা থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৯৬ সালে। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ক্ষমতার বাইরে চলে যান, আবার ২০০৯ সালে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরে পরপর ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকেন। এই সময়ে বিরোধী দলগুলো প্রায়শই নির্বাচন বর্জন করে কিংবা অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। তারা শাসনামলে হাজার হাজার মানুষকে জোর করে গুম করার অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, অনেককে বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হয়েছে। ওই সময় নির্যাতনের ঘটনা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং বিরোধীদের বিচার ছাড়াই কারাগারে পাঠানো হতো।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনা তার সরকার অর্থনৈতিক সাফল্য দেখিয়ে শাসনের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করত। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার যে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অভিহিত করেছিলেন, সেই দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং মাথাপিছু আয়ে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযুদ্ধের বংশধরদের জন্য কোটা নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন নিরাপত্তা বাহিনীর নির্মম দমনের পর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলন একসময় শেখ হাসিনার পদত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকায় ছাত্র বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। জাতিসংঘের হিসেবে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়।

ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যান। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ইউনূসের সরকার এরপর থেকে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ নয়াদিল্লির প্রতি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে।
শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে সুর আরও চড়িয়েছে। মন্ত্রণালয় ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির কথা উল্লেখ করে বলেছে, হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো নয়াদিল্লির জন্য একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। তারা আরও বলেছে, হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রাখলে তা হবে ‘অত্যন্ত অবান্ধব আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞা’।
কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, প্রত্যর্পণ চুক্তিতে একটি ব্যতিক্রম আছে যদি অপরাধী রাজনৈতিক হয়, তাহলে প্রত্যর্পণ বাধ্যতামূলক নয়।
নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক সঞ্জয় ভারদ্বাজ বলেন, ভারত এটাকে (হাসিনার মামলা) বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছে।
ভারদ্বাজের মতে, নয়াদিল্লির চোখে আজ বাংলাদেশ ‘ভারত বিরোধী শক্তি’ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ইউনূস বারবার ভারতের সমালোচনা করেছেন, আর হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা আন্দোলনের নেতারা প্রায়শই নয়াদিল্লিকে হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য দোষারোপ করেন। এই পটভূমিতে হাসিনাকে ফেরত দেওয়া মানে ভারত বিরোধীদের বৈধতা দেওয়া হয়ে যাবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা হাসিনার বিরুদ্ধে রায় নোট করেছে এবং নয়াদিল্লি সব পক্ষের সঙ্গেই গঠনমূলক সম্পর্ক রাখবে।
কিন্তু বাস্তবে নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক এখন হিমশীতল। হাসিনার আমলে যে সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জোট ছিল, তা এখন অবিশ্বাসে ভরা সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়েছে।
সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মতে, এই পরিস্থিতি শিগগিরই বদলাবে না।
তিনি বলেন, এই সরকারের আমলে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ থাকবে, কারণ তারা বারবার বলতে থাকবে যে, ভারত হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে না।
তবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন হওয়ার কথা, তা নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। যদিও হাসিনার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং বেশিরভাগ বড় দল বিশেষ করে বিএনপি ভারতের সমালোচক, তবু নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করা ভারতের জন্য সহজ হবে।
পিনাক বলেন, “এভাবে চলতে পারে না, ঢাকায় আমাদের একটা নির্বাচিত সরকার দরকার। ভারতকে অপেক্ষা করতে হবে, কিন্তু বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলোতে সদিচ্ছা বজায় রাখতে হবে।”
জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত বলেন, হাসিনা প্রশ্নে ভারত দ্বিধায় পড়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে জনরোষের কথা তারা অস্বীকার করে না। আদর্শ পরিস্থিতিতে ভারত চাইবে আওয়ামী লীগ কোনো একসময় আবার ক্ষমতায় ফিরুক।
তবে বিশ্লেষকরা এও বলছেন, বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশ হাসিনাকে আর কখনো সুযোগ দেবে না এটা ভারতকে মেনে নিতে হবে। পরিবর্তে ঢাকার অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে।
শ্রীরাধা দত্ত বলেন, “ভারতের সেখানকার অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক কখনো ছিল না। কিন্তু এখন তা বদলাতে হবে। বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। কিন্তু হাসিনা প্রত্যর্পণের এই একটি এজেন্ডার বাইরে আমাদের এগোতে হবে।”
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশ দুটির মধ্যে চার হাজার কিলোমিটারের সীমান্ত আছে। চীনের পরই ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক সঙ্গী। উত্তেজনা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বেড়েছে।
কিন্তু ভারত দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে, তাদের সম্পর্ক বাংলাদেশের সঙ্গে। কোনো দল বা নেতার সঙ্গে নয়। তবু বাস্তবে তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে।

১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ভারতের সহায়তায় শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশে রূপান্তরিত করেন। পাকিস্তানের বিভক্তি ভারতের জন্য একটি বড় কৌশলগত ও নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করেছিল।
হাসিনার সঙ্গে ভারতের ব্যক্তিগত সম্পর্কও প্রায় সমান পুরনো। ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। তবে তিনি ও তার ছোট বোন রেহানা জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান। তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদের আশ্রয় দেন। হাসিনা স্বামী এম এ ওয়াজেদ, সন্তান ও রেহানাকে নিয়ে নয়াদিল্লিতে একাধিক বাড়িতে থেকেছেন এবং আকাশবাণীর বাংলা বিভাগেও কাজ করেছেন।
ছয় বছর নির্বাসনের পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে বাবার দলের নেতৃত্ব নেন। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ও ২০০৯ থেকে দ্বিতীয়বার দীর্ঘ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন। তার শাসনকালে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উত্তরোত্তর ফুলেফেঁপে উঠলেও দেশের ভেতরে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ‘অন্যায্য’ চুক্তির জন্য সমালোচনার মুখে পড়েন।
ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালানোর সময় তার গন্তব্য নিয়ে কারও সন্দেহ ছিল না। নয়াদিল্লির কাছে অবতরণের পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাকে গ্রহণ করেন।
সাবেক ভারতীয় দূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, “এবার আমরা হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাইনি। তিনি তখনও ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাই একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্বাভাবিকভাবেই তাকে গ্রহণ করেছেন। আর অন্য কোনো বিকল্পও ছিল না।”
ভারতের সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, “এখন তো তার ফাঁসির আদেশ হয়ে গেছে-তিনি কি বাংলাদেশে ফিরতে পারেন? তিনি ভারতের বন্ধু ছিলেন, ভারতের নৈতিক অবস্থান নিতেই হবে।”
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, হাসিনার ভারতে থাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কাঁটা হয়ে থাকবে। তবে এর মাধ্যমে ভারত তার মিত্রদের প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এর রাজনৈতিক লাভও হতে পারে বলে কুগেলম্যান মনে করেন। অন্য বিশ্লেষকদের থেকে ভিন্নমত দিয়ে তিনি বলেন, হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস দেখিয়েছে, পরিবারভিত্তিক দলগুলো কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেলেও একবারে ধ্বংস হয় না। ধৈর্য ধরলে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে তাদের আবার ফিরে আসার পথ খুলতে পারে।