Advertisement Banner

শীর্ষ সম্মেলন থেকে কী কী চান ট্রাম্প ও সি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
শীর্ষ সম্মেলন থেকে কী কী চান ট্রাম্প ও সি?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের মধ্যে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনটি বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফর করছেন। এটা দীর্ঘ বিরতির পর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি সংলাপের পথ প্রশস্ত করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আজ ১৩ মে তিন দিনের সফরে বেইজিং পৌঁছেছেন। আগামী ১৫ মে তার বেইজিং ছাড়ার কথা।

ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের ডেপুটি এডিটর জেমস পামারের বিশ্লেষণ অনুসারে, সম্মেলনটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে. যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা প্রশ্নে এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাণিজ্য, তাইওয়ান সংকট এবং ইরান যুদ্ধ।

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্পের এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো একটি ‘সিগনেচার’ বা উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করা, যার মাধ্যমে তিনি তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান এবং পতনশীল জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে পারেন।

সি চিনপিং এই সম্মেলনে এক প্রকার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। কারণ গত এক বছরে চীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের হুমকি দিয়ে হোয়াইট হাউসকে এক প্রকার সমঝোতায় আসতে বাধ্য করেছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন কোম্পানির একদল প্রভাবশালী সিইও বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এই আলোচনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। পামার তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনের বিরুদ্ধে যে কঠোর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতি ছিল, বর্তমানে তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছে এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। বিশেষ করে এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংয়ের মতো ব্যক্তিত্বদের লবিংয়ের ফলে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপ রপ্তানির ক্ষেত্রে ট্রাম্প চীনের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করেছেন। ট্রাম্পের চাওয়া হলো, ২০২০ সালের ‘ফেজ ওয়ান’ চুক্তির মতো বড় কোনো সংখ্যার প্রতিশ্রুতি, যা শিরোনামে আধিপত্য বিস্তার করবে, যদিও সেই চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

অন্যদিকে, চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের অগ্রাধিকারগুলো ট্রাম্পের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। জেমস পামারের সূত্র অনুযায়ী, চীন বর্তমানে ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের চাপ তুলনামূলক সহজে কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। কারণ, গত বছর তাদের রপ্তানি রেকর্ড ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তাই শুল্ক কমানোর চেয়ে সি চিনপিং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড় পাওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগী। সি-এর প্রধান তিনটি লক্ষ্যের মধ্যে প্রথমটি হলো: ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো, যা চীনের অর্থনীতি এবং তাদের মধ্যপ্রাচ্যীয় মিত্রদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দ্বিতীয়ত, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির কঠোর অবস্থান থেকে তাকে সরিয়ে আনতে ট্রাম্পের প্রভাব ব্যবহার করা।

সানায়ে তাকাইচি মনে করেন যে, তাইওয়ানে চীনের কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ হলে জাপানও তাতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে। এটা বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। সি চিনপিংয়ের তৃতীয় এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো তাইওয়ান প্রশ্নে মার্কিন অবস্থানের একটি স্থায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত করা। যার মধ্যে রয়েছে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা এবং চীনের সম্ভাব্য আক্রমণের সময় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার নিশ্চয়তা।

পামারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সি চিনপিং এই সম্মেলনে এক প্রকার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। কারণ গত এক বছরে চীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের হুমকি দিয়ে হোয়াইট হাউসকে এক প্রকার সমঝোতায় আসতে বাধ্য করেছে।

জেমস পামারের এই প্রতিবেদনে তাইওয়ান ইস্যুটিকে সবচেয়ে জটিল মোড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সি চিনপিং চাইছেন, ট্রাম্প যেন তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার মতো ভাষাগত স্বীকৃতি দেন। যদিও দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ‘এক চীন’ নীতিকে স্বীকৃতি দিলেও তাইওয়ানের ওপর চীনের মালিকানা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয় না। কিন্তু ট্রাম্পের মতো নেতার কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে এমন কোনো বিবৃতি আদায় করা বেইজিংয়ের জন্য হবে একটি বড় প্রতীকী বিজয়।

পামার সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্প যদি তোষামোদ বা অর্থনৈতিক চুক্তির বিনিময়ে এমন কোনো মন্তব্য করেন, তবে তা তাইপেতে আতঙ্কের সৃষ্টি করবে এবং ওয়াশিংটনে দ্বিপক্ষীয় বিরোধের জন্ম দেবে। মার্কিন সিনেটের রিপাবলিকান সদস্যরাও তাইওয়ানের প্রতি জোরাল সমর্থন বজায় রাখার পক্ষে। ফলে ট্রাম্পের যেকোনো নমনীয় অবস্থান অভ্যন্তরীণভাবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।

তবে পামারের মতে, ট্রাম্পের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনি আজ দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতি কাল পরিবর্তন করে ফেললেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি, বিশেষ করে গত বছরের ‘সল্ট টাইফুন’ হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনাগুলো এই সম্মেলনে মার্কিন আলোচ্যসূচিতে না থাকাটা এক প্রকার বিস্ময়কর হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার ইস্যুটিও বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে পামার মনে করেন।

সবশেষে, জেমস পামারের এই বিশ্লেষণটি দেখায় যে, ট্রাম্প এবং সি একে অপরের কাছ থেকে যা চাইছেন তা অত্যন্ত বিপরীতধর্মী। ট্রাম্প যখন স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভ এবং প্রচারের দিকে নজর দিচ্ছেন, তখন সি চিনপিং দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তাইওয়ান ও ইরানের ওপর মার্কিন প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের এবারের সফরে ঐতিহাসিক রিচার্ড নিক্সনের ১৯৭২ সালের সফরের মতো রূপান্তরকারী প্রভাব না থাকলেও, এটি বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে দুই পরাশক্তির সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করবে।

যুদ্ধের ময়দানে ব্যয়বহুল সামরিক সরঞ্জাম এবং অভ্যন্তরীণভাবে ভঙ্গুর অর্থনীতির চাপে থাকা ট্রাম্পের জন্য এই সম্মেলনটি যেমন একটি সুযোগ, তেমনি সি চিনপিংয়ের জন্য এটি ওয়াশিংটনকে তার নিজের শর্তে কাজ করানোর একটি মোক্ষম সময়। পামারের এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণটি এটিই ইঙ্গিত দেয় যে, শেষ পর্যন্ত কার কৌশল সফল হবে তা নির্ভর করবে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ঝোঁক এবং সি-এর কূটনৈতিক ধৈর্যের ওপর। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, মার্কিন কংগ্রেস এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের চাপ উপেক্ষা করে তাইওয়ান বা নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো ‘গ্র্যান্ড বারগেইন’ বা বিশাল বড় চুক্তি করা ট্রাম্পের পক্ষে সহজ হবে না।

সম্পর্কিত