Advertisement Banner

চীনের বিআরআই প্রকল্পের কিছুই করতে পারেননি ট্রাম্প

জেসিকা সি. লিয়াও এবং জেনেল গার্সিয়া
জেসিকা সি. লিয়াও এবং জেনেল গার্সিয়া
চীনের বিআরআই প্রকল্পের কিছুই করতে পারেননি ট্রাম্প
ছবি: এআই জেনারেটেড

একসময় পশ্চিমা বিশ্ব মনে করেছিল চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে। বিশেষ করে ঋণের ঝুঁকি, প্রকল্পের ব্যর্থতা এবং অংশীদার দেশগুলোর আর্থিক সংকটের কারণে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের বাস্তবতা সেই ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে উল্টে দিয়েছে। বরং দেখা যাচ্ছে, বিআরআই শুধু ফিরে আসেনি–এটি আরও শক্তিশালী, আরও কৌশলগত এবং আরও পরিশীলিত রূপ নিয়েছে।

এই পুনরুত্থানকে বোঝার জন্য প্রথমেই লক্ষ্য করতে হবে, চীন এখন বিআরআই-কে আর শুধুমাত্র অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখছে না। এটি এখন তার বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং-এর নেতৃত্বে চীন এই উদ্যোগকে এমনভাবে পুনর্গঠন করেছে, যা সরাসরি তার শিল্পনীতি, বাণিজ্য কৌশল এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত।

বিআরআই-এর পুনরুত্থান: সংখ্যার ভাষায় বাস্তবতা

২০২৫ সালে বিআরআই প্রকল্পের মোট মূল্য ২১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে– যা অতীতের রেকর্ডকেও ছাড়িয়েছে। একই সময়ে চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্য ৬.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এবং প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত তৈরি হয়। এই পরিসংখ্যান শুধু অর্থনৈতিক শক্তিরই ইঙ্গিত দেয় না; বরং এটি দেখায় যে, চীন বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় তার অবস্থান আরও সুসংহত করছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিআরআই এখন তিনটি মূল লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে-

  • উচ্চপ্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানি খাতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা।
  • গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিত করা।
  • অতিরিক্ত উৎপাদন বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে সামাল দেওয়া।

দেশীয় সংকট: অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ

চীনের অর্থনীতির ভেতরের বড় সমস্যা হলো ‘ওভারক্যাপাসিটি’ বা অতিরিক্ত উৎপাদন। দীর্ঘদিনের সরকারি ভর্তুকি ও শিল্পনীতির কারণে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেড়েছে, কিন্তু দেশীয় চাহিদা সেই হারে বাড়েনি। ফলে বিপুল পরিমাণ পণ্য অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি শুধু একটি অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং টিকে থাকার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রিক গাড়ি, সৌর প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারি– এসব খাতে উৎপাদন এত বেশি যে, দেশীয় বাজার তা নিতে  পারছে না।

এই সংকট মোকাবিলায় বিআরআই একটি ‘আউটলেট’ হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ, চীন তার অতিরিক্ত উৎপাদন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঠাচ্ছে– একদিকে বাজার তৈরি করছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়াচ্ছে।

পশ্চিমা শুল্কনীতি: বাধা নাকি সুযোগ?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে তার অগ্রযাত্রা ঠেকাতে চেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই পদক্ষেপ উল্টো ফল দিয়েছে।

চীন সরাসরি রপ্তানি কমিয়ে দিয়ে ‘পরোক্ষ রপ্তানি’ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ, সে তার উৎপাদন কারখানা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা বা অন্য কম শুল্কের দেশে স্থাপন করছে। ফলে সেই দেশগুলোর ‘উৎপাদিত পণ্য’ হিসেবে পণ্য পশ্চিমা বাজারে প্রবেশ করছে।

এই কৌশলকে বলা হয় ‘ট্যারিফ জাম্পিং’। উদাহরণস্বরূপ, চীনা কোম্পানিগুলো ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া বা মরক্কোয় কারখানা স্থাপন করে পশ্চিমা শুল্ক এড়িয়ে যাচ্ছে।

বিআরআই-এর নতুন রূপ: অবকাঠামো থেকে শিল্প কৌশল

প্রথমদিকে বিআরআই ছিল মূলত সড়ক, রেল, বন্দর– এই ধরনের অবকাঠামো প্রকল্প। কিন্তু এখন এটি পরিবর্তিত হয়ে শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং জ্বালানি খাতে বিস্তৃত হয়েছে।

২০২৫ সালে প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বিআরআই বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইভি ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর এবং ডেটা সেন্টার– এসব খাতে বিনিয়োগ চীনের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নেতৃত্ব নিশ্চিত করার কৌশলের অংশ।

একই সঙ্গে, চীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। লিথিয়াম, কপার, অ্যালুমিনিয়াম– এসব খনিজ আধুনিক শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিআরআই-এর মাধ্যমে চীন এসব সম্পদের উৎস দেশগুলোতে বিনিয়োগ করে সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে।

গ্লোবাল সাউথ: নতুন বাজার ও কৌশলগত অংশীদার

বিআরআই-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘গ্লোবাল সাউথ’– অর্থাৎ আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো। এই দেশগুলোতে চীন শুধু অবকাঠামো তৈরি করছে না; বরং একটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে। এর ফলে এসব দেশ চীনের উৎপাদিত পণ্যের বাজারে পরিণত হচ্ছে।

আফ্রিকায় বিআরআই প্রকল্পের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং চীনা রপ্তানির দ্রুত সম্প্রসারণ দেখায় যে, এই অঞ্চল এখন চীনের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু।

হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার: দ্বৈত কৌশল

চীন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ (হার্ডওয়্যার) করেই থেমে থাকেনি। এটি সমান্তরালে বাণিজ্য চুক্তি, নীতি কাঠামো এবং অর্থনৈতিক নিয়ম (সফটওয়্যার) তৈরি করছে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে চীন এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে তার বিনিয়োগ ও বাণিজ্য আরও সহজ ও সুরক্ষিত হয়।

এইভাবে, বিআরআই এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা– যেখানে রাস্তা, বন্দর, কারখানা, বাজার এবং আইন– সবকিছু একসাথে কাজ করছে।

সমালোচনা ও ঝুঁকি

তবে এই মডেলের কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। প্রথমত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থানীয় শিল্প চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। এতে তাদের অর্থনীতি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, অনেক দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। যদিও চীন এখন আগের তুলনায় বেশি সতর্ক, তবুও এই সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি।

তৃতীয়ত, পরিবেশগত প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও চীন সবুজ জ্বালানিতে বিনিয়োগ করছে, তবুও তেল ও গ্যাস খাতে তার বিনিয়োগ এখনো অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বার্তা

এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শুধুমাত্র শুল্ক আরোপ করে চীনের অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়– এটি এখন স্পষ্ট। বরং যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল দিতে হবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আকর্ষণীয় হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিআরআই এখন আর একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়– এটি চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। চীন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তার শিল্পনীতি, বাণিজ্য কৌশল এবং ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যকে একত্রিত করেছে।

পশ্চিমা বাধা যতই বাড়ুক, বিআরআই-এর মাধ্যমে চীন নিজেকে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে এই কৌশল কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে দুই বিষয়ের ওপর। প্রথমত, উন্নয়নশীল দেশগুলো কতটা লাভবান হয়। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা বিশ্ব কতটা কার্যকর বিকল্প তৈরি করতে পারে।

একটি বিষয় পরিষ্কার: বিআরআই এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং এটি আগামী বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

জেসিকা সি. লিয়াও: যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি ওয়ার কলেজের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি বিভাগের এশিয়ান

স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক এবং জেনেল গার্সিয়া: একই বিভাগের সিকিউরিটি স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক।

(লেখাটি সংক্ষেপিত আকারে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের সৌজন্যে প্রকাশিত)

সম্পর্কিত