ads

বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত: বিপদ ধেয়ে আসছে ভোক্তার দিকে

বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত: বিপদ ধেয়ে আসছে ভোক্তার দিকে
জ্বালানি তেলের জন্য মোটরসাইকেল চালকদের ভিড়। ছবি: চরচা

গত ১৮ মার্চ জেট ফুয়েলের দাম লিটারে ৮২ টাকা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারির ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই প্রত্যাহার করে নিয়েছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু, এ অবস্থা ধরে রাখা যায়নি। এক সপ্তাহেরও কম সময় পরে শতকরা ৮০ শতাংশ বা লিটারে প্রায় ৯০ টাকা বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা নির্ধারণ করে কমিশন। এই বৃদ্ধি যে অস্বাভাবিক এটি বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নাই।

নিয়মিত আকাশপথের যাত্রী না হলে এর প্রভাব সেই গ্রাহকের ওপর পড়বে না। কিন্তু আকাশপথের যাত্রী ও বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো বুঝতে পারছে জেট ফুয়েলের এই দামের ঊর্ধ্বগতি কতটা প্রভাব ফেলেছে। এই প্রভাব দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রুট, উভয়ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। ঢাকা থেকে সৈয়দপুর বা চট্টগ্রাম রুটে চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায় টিকিট পাওয়া যেত। বর্তমানে সেখানে ন্যূনতম ছয় থেকে সাত হাজার টাকার নিচে টিকিট মিলছে না। শেষ মুহূর্তে এই দাম ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যান্য রুটেও বেড়েছে হাজার থেকে ১২ শ টাকা। নিয়মিত ব্যবসার কাজে চট্টগ্রামের যাত্রী রফিকুল ইসলাম চরচাকে বলেন, আগে তিনি সপ্তাহে কখনো কখনো দুইবার যাওয়া আসা করতেন। টিকেটের দাম বৃদ্ধির পর গত ১৫ দিনে একবার গেছেন। আকাশপথে বেড়াতে যাওয়া মাঝে অনেকের জন্য সহনীয় হয়ে গিয়েছিল। এখন বিলাসিতা।

এতটা প্রভাব পড়বে জেনেও কেন এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি? বিইআরসি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং আমদানি খরচ হিসাব করে এর চেয়ে কমানোর উপায় ছিল না। প্রথমে দাম বাড়িয়ে তা প্রত্যাহার করার পর আবারও আরো বেশি পরিমাণে দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় কিছুটা দ্বিধাদন্দ্ব যে ছিল তা পরিষ্কার।

কিন্তু রান্নার জ্বালানি এলপিজি’র দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কমিশনের ছিল না কোনো দ্বিধা। ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম এক লাফে বাড়ানো হয়েছে ৩৮৭ টাকা! এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি আঘাত করছে সাধারণ মানুষের রান্না ঘরে। প্রভাব পড়েছে পকেটে। আগে একটি পরিবারের মাসে দেড় সিলিন্ডার গ্যাসের জন্য যেখানে খরচ হতো ২ হাজার টাকার কিছু বেশি। এই মাস থেকে সেই খরচ বেড়ে হবে ২৬০০ টাকা।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে এই দাম বৃদ্ধির কোনো বিকল্প ছিল না বলে জানিয়েছিলেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। পাইপলাইনে গ্যাস ব্যবহারকারী, বৈদ্যুতিক চুলা, কিংবা লাকড়ি ব্যবহারকারীরা এবারো বেঁচে গেছেন। তবে, বিপদ টের পাচ্ছেন এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ৬০ লাখের বেশি পরিবার।

জ্বালানি সংকটের কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশে বাড়ানো হয়েছে জেট ফুয়েলের দাম। ছবি: রয়টার্স
জ্বালানি সংকটের কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশে বাড়ানো হয়েছে জেট ফুয়েলের দাম। ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শেষ ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ছিল সর্বোচ্চ ৭০ ডলার ৪৯ সেন্ট। সেই দাম বেড়ে মার্চ মাসে গড়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০০ ডলারে। এপ্রিলের ৪ তারিখে উঠেছে ১০৯ ডলারে! তারপরও দেশে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। সরকার ভর্তুকি ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু চাপ বাড়ছে অর্থনীতিতে। অর্থনীতিবিদদের অনেকে সতর্ক করছেন—এই অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন। কারণ, তেলের আমদানি ব্যয় বাড়লে তা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

অথর্নীতিতে চাপের পাশাপাশি ঝুঁকি আছে নির্ধারিত পরিমাণ তেল সময়মতো ডেলিভারি নিয়েও। পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির হিসাবে, মার্চ মাসে তেল আমদানিতে ১৭টি এলসি খোলা হয়। এর মধ্যে চারটি কার্গো দেশে পৌঁছেছে। ছয়টি পথে। বাকি সাতটির বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, এপ্রিল মাসে খোলা ১৫টি এলসির মধ্যে মাত্র তিনটি কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। ১৩টির প্রাথমিক সম্মতি পাওয়া গেছে। তবে, জ্বালানি বিভাগের নিয়মিত ব্রিফিং-এ জানানো হয়েছে এপ্রিল মাসের জন্যও জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি হবে না। সরকার সম্ভাব্য সব বিকল্প থেকে তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ সফল হলে তেল পাওয়া নিয়ে হয়ত কোনো অনিশ্চয়তা থাকবে না। তবে দামের বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠান থেকে দেশের বাজারে তেলের দাম না বাড়িয়ে কতদিন চলা সম্ভব তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তেলের দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন তিনি।

যদি তেলের দাম বাড়ে? এর প্রভাব থেকে কোনো অবস্থাতেই মুক্ত থাকতে পারবেন না সাধারণ মানুষ। কাঁচাবাজারের আলু-পটল থেকে শুরু করে বিনোদন যাত্রা, সবক্ষেত্রেই টের পাবে পকেট।

এখানেই শেষ নয়। প্রকৃতি গরম হয়ে উঠছে। ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের তামমাত্রা। শুরু হয়েছে লোডশেডিং। শঙ্কা আছে নিয়ন্ত্রণহীন লোডশেডিং- এর।

গত এক সপ্তাহের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি ছিল জ্বালানি সংকটে জর্জরিত। গত ২৮ মার্চ যেখানে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট। ২ এপ্রিল এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৪১০ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ মাত্র ছয় দিনে চাহিদা বেড়েছে প্রায় ১৪২৭ মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হিমশিম খেতে হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগকে।

এই সময়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল অনিয়মিত। ২৮ মার্চ গ্যাস সরবরাহ ছিল ৮৮৩ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। যা ২ এপ্রিল কমে ৮৪৫ এমএমসিএফডিতে নেমে আসে। গ্যাসের এই স্বল্পতার কারণে ঘোড়াশাল, মেঘনাঘাট এবং সিদ্ধিরগঞ্জের মতো বড় বড় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি।

অন্যদিকে, পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ‘কয়লা সংকট’ এর কারণে বন্ধ আছে, যা জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করছে। ঘোড়াশাল ৩ নম্বর ইউনিট ও সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট ইউনিটসহ বেশ কয়েকটি বড় কেন্দ্র দীর্ঘ সময় ধরে ওভারহোলিং বা প্রজেক্ট ওয়ার্কের কারণে বন্ধ রয়েছে, যা পিক সিজনে দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। এছাড়া, সোনাগাজী ৭৫ মেগাওয়াট সোলার প্ল্যান্ট এবং শাহজীবাজার ১০০ মেগাওয়াট জিটিপিপি দীর্ঘদিন ধরে ‘টেস্ট রান’ পর্যায়েই আছে, এগুলো পূর্ণ উৎপাদনে আসতে পারছে না। ফেনী ১১৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি মাঝে মাঝে বন্ধ থাকতে দেখা গেছে।

ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে পায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে পরিস্থিতি সামলে দিয়েছিল দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ। এবার টাকার অভাবে ফার্নেস অয়েলের জন্য এলসি খুলতে পারছে না বলে অভিযোগ করছেন ব্যবসায়ীরা।

এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে কার্যকর ফুয়েল মিক্সিংয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে। এই চাপ পড়বে গিয়ে ডলারের রিজার্ভে। বাড়বে ভর্তুকির পরিমাণ। এই বৃদ্ধিরও একটি হিসাব বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২৮ মার্চ দৈনিক জ্বালানি খরচ ছিল প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা। যা ২ এপ্রিল নাগাদ বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩ কোটি টাকার ওপরে চলে গেছে। বিশেষ করে তেলের মাধ্যমে উৎপাদনে খরচ ১১১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫৯০ কোটি টাকার ওপরে চলে গেছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

এ অবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাক কিংবা না যাক, দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণ করতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। এতদিন গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ টাকা ৩৬ পয়সায় কিনে ৬ টাকা ৬৩ পয়সায় বিক্রি করেছে পিডিবি। এবার এই উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে। ফলে ভর্তুকির যে আকার দাঁড়াচ্ছে তা দিয়ে আইএমএফ-এর কাছে কিস্তি ছাড়ের প্রসঙ্গ আনতে পারবে না সরকার।

ভোক্তার জন্য সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, প্রাথমিকভাবে লোডশেডিং এর বিষয়টি স্বীকার করবে না বিদ্যুৎ বিভাগ। রিপোর্ট ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ৩১ মার্চ সন্ধ্যায় ৩৯ মেগাওয়াট এবং ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতির তথ্য স্পষ্ট থাকলেও রিপোর্টে লোডশেডিং বলা হচ্ছে শূন্য (০)! তবে, ভোক্তা হিসাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের যেকোনো পণ্য নিয়ে প্যানিক বায়িং কিংবা অপচয়ের মতো দ্বায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ সবাইকে বিপদে ফেলবে।

যদি বিশ্ব পরিস্থিতি এমন থাকে এই সহজ সরল হিসাবটা অনেকটা এমন থাকবে। আর যদি ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়? যদি সরকারের কোনো পলিসি ডিসিশন কাজ না করে? তখন কী হবে?

বাংলাদেশ ভোক্তা সমিতির (ক্যাব) জ্বালানি ‍উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম চরচাকে বলেন, “সরকার যদি ব্যবস্থাপনায় সচেতন না হয় জ্বালানি পণ্যের অস্থিতিশীল বাজার যেকোনো বিপদে ফেলতে পারে বাংলাদেশকে। এমনকি অন্ধকারে কাটাতে হতে পারে দিনের পর দিন।”

সম্পর্কিত