Advertisement Banner

বিশ্বকাপের জন্য মেক্সিকো কতটা নিরাপদ?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিশ্বকাপের জন্য মেক্সিকো কতটা নিরাপদ?
ছবি: রয়টার্স

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হচ্ছে ১১ জুন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এবারের বিশ্বকাপের খেলাগুলো হবে কানাডা আর মেক্সিকোতেও। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল এককভাবে। মেক্সিকোতে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালে দুইবার বিশ্বকাপ হয়েছে। কানাডাতে অবশ্য এই প্রথম ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ হিসেবে পরিচিত ফুটবলের বিশ্ব আসর আয়োজিত হতে যাচ্ছে।

মেক্সিকো বিশ্বকাপ আয়োজনে অভিজ্ঞ। কিন্তু মেক্সিকো দর্শকদের জন্য কতটা নিরাপদ? যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়াতে আসলেই কোনো ঝুঁকি আছে কিনা!

এবার বিশ্বকাপ উপলক্ষে লাখো বিদেশি যখন মেক্সিকো সফরে যাবেন, তখন তারা শুধু ফুটবলের রঙ বেরঙের গ্রাফিতি, খেলোয়াড়দের বিশাল ভাস্কর্য বা প্রাণবন্ত ফ্যান উৎসবই দেখবেন না। দেশটির প্রধান পর্যটন এলাকাগুলোতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বাড়তি পুলিশ উপস্থিতিও দেখতে পাবেন। এর লক্ষ্য হলো দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মেক্সিকোর ইতিবাচক ভাবমূর্তি বজায় রাখা।

মেক্সিকো সরকার জানিয়েছে, প্রায় এক লাখ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হবে বিশ্বকাপের তিন আয়োজক শহর–মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা ও মনতেরেতে। পাশাপাশি যেসব এলাকায় অংশগ্রহণকারী দলগুলো অনুশীলন করবে বা দলগুলোর বেস ক্যাম্প থাকবে, সেখানেও নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।

এটি ‘প্ল্যান কুকুলকান’ নামে একটি বড় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ। মায়া পুরাণের সর্পদেবতা কুকুলকানের নামে এই পরিকল্পনার নাম রাখা হয়েছে। এতে ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের কয়েক ডজন সংস্থা যুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রও এতে সহযোগিতা করছে।

মেক্সিকোর কর্মকর্তারা বলছেন, ড্রাগ কার্টেল-সহিংসতা, অপরাধ ও দায়মুক্তির ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এই পরিকল্পনা দেশকে নিরাপদ রাখতে সক্ষম হবে।

গুয়াদালাহারা শহরটি ড্রাগ কার্টেল সহিংসতা ও মানুষ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জর্জরিত। ছবি: রয়টার্স
গুয়াদালাহারা শহরটি ড্রাগ কার্টেল সহিংসতা ও মানুষ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জর্জরিত। ছবি: রয়টার্স

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেক্সিকো নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করায় দর্শকেরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকবেন ঠিকই, কিন্তু দেশটির কিছু অঞ্চল এখনও নানা ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব ঝুঁকি পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর নানা মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।

মেক্সিকো সিটি

১১ জুনের উদ্বোধনী ম্যাচসহ বিশ্বকাপের পাঁচটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকো সিটিতে। দেশের তুলনামূলক নিরাপদ শহরগুলোর একটি ধরা হয় মেক্সিকো সিটিকে। তবে ঝুঁকি একেবারে নেই, এমন নয়।

কোয়াহুইলা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ভিক্টর ম্যানুয়েল সানচেজ ভালদেসের মতে, অন্য দুই আয়োজক শহরের মতো বড় ড্রাগ কার্টেলদের দখলে না থাকলেও মেক্সিকো সিটিতে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় রয়েছে এবং তারা নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

সানচেজ সিএনএনকে বলেন, “মেক্সিকো সিটিতে বড় বড় চোরাচালান চক্র, মানবপাচার, যৌন ব্যবসা, মাদক বেচাকেনা এবং কিছু চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কও রয়েছে। তবে এটি দেশের এমন এলাকা, যেখানে মাথাপিছু পুলিশ ও নিরাপত্তা ক্যামেরার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। ফলে এখানকার অপরাধের ধরন কিছুটা আলাদা।”

এই গবেষক বলেন, বিশ্বের অন্য বড় শহরগুলোর মতো মেক্সিকো সিটিতেও পর্যটকেরা পকেটমার, ছিনতাই ও প্রতারণার মতো ছোটখাটো অপরাধের মুখোমুখি হতে পারেন।

প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের এই মহানগরে পরিবহন ব্যবস্থাও নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন মনতেরে টেকনোলজিকোর সমাজবিজ্ঞান ও সরকারবিষয়ক স্কুলের অধ্যাপক ও গবেষক তেরেসা মার্তিনেজ।

তার ভাষ্য, “মেক্সিকো সিটির মতো শহরে সারারাত সচল পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এটি শুধু নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের বিষয় নয়, এর বাইরে আরও নানা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন পরিবহন যেন নিরাপদ, কার্যকর এবং দেশি-বিদেশি সব দর্শকের জন্য সহজলভ্য থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।”

মেক্সিকো নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। ছবি: রয়টার্স
মেক্সিকো নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। ছবি: রয়টার্স

নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে কর্তৃপক্ষ শহরজুড়ে প্রায় ৫৬ হাজার কর্মকর্তা মোতায়েন করছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে থাকবেন ট্রাফিক পুলিশ, বিশেষ ইউনিট, পর্যটক পুলিশ এবং আকাশপথে নজরদারি দল।

ইতোমধ্যে শহরের প্রধান চত্বর এল জোকালোতে কড়া নিরাপত্তা দেখা যাচ্ছে। ঢাল ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেলধারী নিরাপত্তাকর্মীরাও সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। ১১ জুন থেকে এই চত্বরে ‘ফ্যান ফেস্টিভ্যাল’ অনুষ্ঠিত হবে।

গুয়াদালাহারা

মেক্সিকোর এই শহরটিতে গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গুয়াদালাহারা শহরটি ড্রাগ কার্টেল সহিংসতা ও মানুষ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জর্জরিত শহর। এ দুটি এ মুহূর্তে মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট।

শহরটি জালিস্কো অঙ্গরাজ্যের রাজধানী। এই অঞ্চলটি দেশের অন্যতম বড় ও ভয়ংকর মাদকচক্র ‘জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল’-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাজ্যটিতে তাদের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, গত ফেব্রুয়ারিতে মেক্সিকান কর্তৃপক্ষ তাদের নেতা নেমেসিও ‘এল মেনচো’ ওসেগুয়েরা সেরভান্তেসকে আটক করলে কার্টেলটি সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

জালিস্কো অঙ্গরাজ্য নিখোঁজ মানুষের সংখ্যার জন্যও কুখ্যাত। জালিস্কো সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা দেশে সর্বোচ্চ।

বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন বেসামরিক সংগঠন রাজ্যজুড়ে প্রায় প্রতিদিন অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে। এসব অভিযানে গোপন কবর থেকে নিখোঁজদের শত শত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গত এক বছরেও বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজনের প্রধান স্টেডিয়ামের কাছাকাছি এলাকা থেকে মরদেহ পাওয়া গেছে।

গবেষক তেরেসা মার্তিনেজ বলেন, “তিনটি আয়োজক শহরের মধ্যে আমার মনে হয় গুয়াদালাহারার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।”

সাধারণত এসব সংকট স্থানীয়দেরই বেশি প্রভাবিত করে, তার মানে এই নয় যে পর্যটকদের কোনো ঝুঁকি নেই।

মনতেরে

বিশেষজ্ঞদের মতে, গুয়াদালাহারার মতো মনতেরেতেও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।

সানচেজের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তঘেঁষা নুয়েভো লেওন অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত হওয়ায় মনতেরে মাদক পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে পরিচিত। শহরটি জ্বালানি চুরি, বিবাদমান কার্টেলগুলোর মধ্যে সহিংসতা এবং অর্থ পাচারের মতো অপরাধের জন্যও কুখ্যাত।

সানচেজ বলেন, শহরের ভেতরেও অপরাধী গোষ্ঠীগুলো মাদক বিক্রি ও বাসিন্দাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি চালায়।

তবে গুয়াদালাহারার মতো মনতেরের এসব বড় ধরনের অপরাধ বিদেশি দর্শকদের ওপর সরাসরি বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে না। যদিও তারা পকেটমার, ছিনতাই ও প্রতারণার মতো ছোটখাটো অপরাধের শিকার হতে পারেন।

দেশজুড়ে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, প্রতারণা ও নকল পণ্য বিক্রির সমস্যা (বিশেষ করে ভুয়া টিকিট বিক্রি) দেশের যেকোনো এলাকায় ঘটতে পারে।

তেরেসা মার্তিনেজ বলেন, “যদি ভ্রমণসংক্রান্ত প্রতারণা, ভুয়া টিকিট বা ভুয়া ট্যুরের কথা বলা হয়, তাহলে এসব প্রতারণার মূল লক্ষ্যই হলো পর্যটকেরা, বিশেষ করে দেশি ও বিদেশি দর্শকেরা।”

কর্মকর্তারা এসব ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছেন। দর্শনার্থীরা যেন বিশ্বস্ত ও প্রসিদ্ধ সূত্রগুলো থেকে পণ্য ও সেবা নেন, সেজন্য সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে।

মেক্সিকোজুরে মানব পাচার একটি বড় ধরনের সমস্যা।

কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও গবেষকদের আশঙ্কা, বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসায় যৌন পর্যটনের চাহিদা বাড়তে পারে। সেই চাহিদা মেটাতে অপরাধী চক্রগুলো আরও বেশি অসহায় মানুষকে, এমনকি শিশু, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও অভিবাসীদেরও জোর করে যৌন ব্যবসায় ঠেলে দিতে পারে।

তেরেসা মার্তিনেজ বলেন, “এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে ফুটবল দেখতে আয়োজক শহরগুলোতে আসা কিছু মানুষ যৌন ভোগের উদ্দেশ্যেও আসে। বিষয়টি ঘৃণ্য হলেও সত্য। তারা এমন মানুষদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখে, যাদের জীবনকে তারা মূল্যহীন মনে করে।”

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম। ছবি: রয়টার্স
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম। ছবি: রয়টার্স

মেক্সিকোতে যেসব ফুটবল সমর্থকেরা যাওয়ার কথা ভাবছেন–এসব সংগঠিত অপরাধঘটিত সহিংসত তাদের জন্য অবশ্যই উদ্বেগের বিষয় হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধী গোষ্ঠীগুলো নিজেরাও পর্যটন থেকে লাভবান হয় বলে তারা বড় ধরনের অস্থিরতা কম রাখার চেষ্টা করতে পারে।

সমর্থকেরা যেসব পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে–যেমন কানকুন ও পুয়ের্তো ভালিয়ার্তা, সেসব এলাকায় অপরাধীরা রেস্তোরাঁ, নাইট ক্লাব ও হোটেল থেকে চাঁদা আদায় করছে এবং পর্যটন থেকে আসা আয়ের একটি অংশ দখল করছে।

বাসিন্দাদের নিরাপত্তা কি উপেক্ষিত হচ্ছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকালের সময় মেক্সিকোর বড় শহরগুলো বিদেশি দর্শকদের জন্য মোটামুটি নিরাপদ থাকবে। তবে টুর্নামেন্ট শেষ হলে এবং পর্যটকেরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলে মেক্সিকোর দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো থেকেই যাবে। তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশ্বকাপকেন্দ্রিক বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া সেই সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।

এতে মেক্সিকোতে দীর্ঘদিনের একটি সমালোচনা আবার সামনে এসেছে–সরকার অনেক সময় নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তার চেয়ে বিদেশিদের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে মেক্সিকো সিটিতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভ করেছে। তারা অভিযোগ তোলে, সরকার বিদেশি দর্শকদের জন্য আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে বিপুল সম্পদ ব্যয় করছে, কিন্তু দেশে নিখোঁজ মানুষদের খুঁজে বের করার কাজে যথেষ্ট গুরুত্ব ও অর্থ দিচ্ছে না।

এর আগে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম সরকারের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

গবেষক সানচেজ বলেন, টুর্নামেন্ট চলাকালে আরও বিভিন্ন সংগঠন তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, বিশ্বকাপকে এসব সমস্যা সামনে আনার একটি সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করা হবে। স্টেডিয়ামের বাইরে, মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথে বা ফ্যান জোনে বিক্ষোভ হতে পারে–এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

সম্পর্কিত