মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ওয়াশিংটন এখন মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এসে দেশটির বর্তমান সামরিক জান্তা সরকারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এই আকস্মিক পরিবর্তনের মূল কারণ হলো মিয়ানমারের মাটির নিচে থাকা বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ সম্পদ (রেয়ার-আর্থ মিনারেলস) হস্তগত করা। মাইকেল হ্যাক নামে একজন ফ্রিলান্স লেখক ও এশিয়া বিষয়ক গবেষকের গত ১ জুন সোমবার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘ফরেন পলিসি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত নিবন্ধে এ কথা লিখেছেন।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৮৮ সালে মিয়ানমারে যখন জেনারেল নে উইনের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে, তখন একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল যে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের সহায়তায় যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে। আন্দোলনকারীরা আমেরিকান সৈন্যদের স্বাগত জানাতে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করেছিল এবং প্ল্যাকার্ডও ছেপেছিল। কিন্তু বাস্তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনোই আসেনি। যে জাহাজটিকে কেন্দ্র করে এই আশার আলো তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল স্রেফ নিয়মিত টহলে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস কোরাল'।
তবে সামরিক সহায়তা না দিলেও, পরবর্তী দশকগুলোতে ওয়াশিংটন বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা, শরণার্থী কর্মসূচি এবং ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র মতো প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ২০২৪ সাল পর্যন্ত রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট– উভয় প্রশাসনই এই ধারা বজায় রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে সেই দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন জান্তা সরকারের সাথে এক ধরনের ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের ভিত্তি প্রস্তুত করছে। এর মূল লক্ষ্য বৈশ্বিক খনিজ সম্পদের বাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা। নিবন্ধে এই পরিস্থিতিকে ‘শার্ক ট্যাংক’ বা তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক পরিবেশের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেখানে একদল মধ্যস্থতাকারী বা উদ্যোক্তা ট্রাম্প ও মিয়ানমারের জান্তা প্রধানদের মধ্যে চুক্তি করিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের সাফল্যের পর যুক্তরাষ্ট্রে মিয়ানমারের গণতন্ত্রের পক্ষে জোরালো জনমত ও লবিং গড়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে, ১৯৯৭ সাল থেকে ওয়াশিংটন ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মিয়ানমার থেকে সব ধরনের আমদানি এবং সেখানে মার্কিন বিনিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। একই সময়ে মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যম মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এবং প্রবাসে থাকা গণতন্ত্রকামী শক্তির একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।
এরপর ২০১০-এর দশকে যখন মিয়ানমারে একটি আধা-বেসামরিক সরকার গঠিত হয়, তখন ওয়াশিংটন একে স্বাগত জানায়। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ২০১১ সালে দেশটিতে ঐতিহাসিক সফর করেন, যা নির্বাসিত বহু নেতাকে দেশে ফেরার সাহস জোগায়। পরবর্তীতে বারাক ওবামা এবং প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতো ব্যক্তিত্বরাও দেশটিতে যান। কিন্তু এই গণতান্ত্রিক উত্তরণের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেতে বেশি সময় লাগেনি। কাচিন এবং রাখাইন রাজ্যে জাতিগত সংঘাত তীব্র রূপ নেয় এবং ২০১৭ সালে ভয়াবহ সামরিক অভিযানের মুখে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী (বাস্তবে আরও বেশি) বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকা। ছবি: রয়টার্সএর পর ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে পুনরায় ক্ষমতা দখল করলে দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। এই দফায় জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক সাফল্য লাভ করতে শুরু করে, যা চীনের পরোক্ষ অস্ত্র সহায়তা এবং প্রবাসী মিয়ানমার নাগরিকদের অর্থায়নে বেগবান হয়েছিল। জো বাইডেনের প্রশাসনের শেষ সময় পর্যন্ত ওয়াশিংটন জান্তাবিরোধী এবং সীমান্ত অঞ্চলের অসামরিক গোষ্ঠীগুলোর সাথে যোগাযোগ বজায় রেখে তাদের মানবিক ও কৌশলগত সহায়তা দিয়ে আসছিল।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর এই মানবিক ও গণতান্ত্রিক সহায়তার পুরো কাঠামোটিই ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে নিবন্ধটিতে স্পষ্ট করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রচার এবং মানবিক সহায়তার মূল কর্মসূচিগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটিতে নিয়োজিত অভিজ্ঞ সিভিল সারভেন্ট বা সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছে। ইয়াঙ্গুনে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন মিশন প্রধান সুসান স্টিভেনসনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে যে, নতুন প্রশাসন বৈদেশিক সহায়তা বাজেট মারাত্মকভাবে হ্রাস করেছে। এর ফলে মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ‘ইউএসএআইডি’ কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সীমান্ত অঞ্চলের শরণার্থী শিবিরগুলোতে। সেখানে জরুরি খাদ্য রেশন বন্ধ হয়ে গেছে এবং স্থানীয় চিকিৎসা ক্লিনিকগুলো বন্ধ হওয়ায় সাধারণ মানুষ ওষুধ না পেয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ছে। একই সাথে মার্কিন সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ এবং ‘রেডিও ফ্রি এশিয়া’র কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যুদ্ধের ময়দান থেকে সঠিক তথ্য পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে। থাইল্যান্ডের উৎপাদন খাতে কর্মরত মিয়ানমারের অভিবাসী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষাও প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বাসনের অপেক্ষায় থাকা হাজার হাজার শরণার্থীর পথ বন্ধ করে মিয়ানমারের ওপর সম্পূর্ণ ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং প্রায় চার হাজার প্রবাসী নাগরিকের সাময়িক সুরক্ষা মর্যাদা (টিপিএস) নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ট্রাম্প। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র ইমেইলের মাধ্যমে দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বার্মার জনগণের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তারা সহিংসতা হ্রাস, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং মানবিক সহায়তার পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।
মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা বিরল খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য নিজেদের বাজেট ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে। এর পেছনে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক কারণ রয়েছে; মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের জন্য আগামী ১ জানুয়ারি, ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) থেকে চীনের উৎপাদিত বিরল খনিজ উপাদানগুলো সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই খনিজ উপাদানগুলো আধুনিক প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম এবং নবায়নযোগ্য শক্তি খাতের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য। চীনকে প্রতিস্থাপন করার এই মরিয়া অনুসন্ধানই ওয়াশিংটনের নজর পুনরায় মিয়ানমারের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। কারণ মিয়ানমার হলো এই ধরনের খনিজ উপাদানের অন্যতম বৃহত্তম বৈশ্বিক উৎস।
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সওয়াশিংটনের ব্যবসায়ী মহলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা ‘ফরেন পলিসি’কে বলেছেন যে, আগের প্রশাসনগুলোতে এক ধরনের ‘উদারনৈতিক অহমিকা’ বা আদর্শিক শুচিতা ছিল, যার কারণে তারা বিতর্কিত বা একনায়কতান্ত্রিক সরকারের সাথে কথা বলত না। কিন্তু এখন নীতি বদলেছে– বর্তমান প্রশাসন সবার সাথেই ব্যবসা করতে প্রস্তুত। এই নতুন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে মার্কিন চেম্বার অব কমার্সের প্রাক্তন প্রধান অ্যাডাম কাস্তিলো এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসারী ‘মাগা’ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের দপ্তরের সাথে লবিং শুরু করেছেন। কাস্তিলো মনে করেন, তথাকথিত থিংক ট্যাংক বা বুদ্ধিজীবীদের নীতিগুলো অকেজো এবং আমেরিকার কৌশলগত খনিজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তথা 'তাতমাদো'-এর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
তবে এই নতুন বাণিজ্যিক নীতি যে খুব সহজে সফল হবে, তা মানতে নারাজ সাবেক মার্কিন কূটনীতিক সুসান স্টিভেনসন। তিনি বিষয়টিকে একটি ‘বাস্তবতাহীন স্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, যেসব এলাকায় এই বিরল খনিজ সম্পদগুলো রয়েছে, তার বেশিরভাগই জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই, বরং সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে জান্তাবিরোধী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। এমনকি খনিজ উত্তোলন করা সম্ভব হলেও তা পরিবহন করা এক বিশাল লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ। থাইল্যান্ড সীমান্ত দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, আগে যেখানে সীমান্তে একটি চৌকিতে বা চেকপয়েন্টে কর দিতে হতো, এখন সেখানে অন্তত আটটি ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর চেকপয়েন্টে অর্থ দিতে হয়।
এর চেয়েও বড় বাধা হলো, খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চলের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো চীনের কাছ থেকে অস্ত্র ও প্রযুক্তির সহায়তা পায়। ফলে বেইজিংয়ের প্রভাব ডিঙিয়ে তারা আমেরিকার কাছে এই খনিজ সম্পদ বিক্রি করবে– এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। চীন সহজেই তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে। অবশ্য এই সব বাধা সত্ত্বেও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায়ী এবং সাবেক অভিনেতা ব্রক পিয়ার্স এই খনিজ অনুসন্ধানের দৌড়ে শামিল হয়েছেন। তিনি চীন এবং মিয়ানমার উভয়ের সাথেই তার পূর্ব কাজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে দাবি করেছেন যে, তিনি এই কৌশলগত সংকট সমাধান করতে পারবেন। পাশাপাশি ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সহযোগী ও লবিস্ট রজার স্টোন মিয়ানমারের জান্তা সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে ওয়াশিংটনের সাথে তাদের সম্পর্ক পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়েছেন।
ট্রাম্প অতীতে রজার স্টোনকে অবজ্ঞা করলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্টোনের মতো ব্যক্তিদের এই ধরনের লবিং এখন বেশ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। নিবন্ধের শেষে লেখক মাইকেল হ্যাক মন্তব্য করেছেন যে, ওয়াশিংটন জান্তার সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে বা খনিজ সম্পদ সরাতে পারবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। তবে এই খনিজ দখলের প্রতিযোগিতা যে পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমেরিকার এই নীতি পরিবর্তন সত্ত্বেও মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলগুলো এখনো ওয়াশিংটনের দিকেই তাকিয়ে আছে। কারণ সুসান স্টিভেনসনের ভাষায়– আমেরিকা যতই নির্ভরযোগ্যতা হারাক না কেন, এই মুহূর্তে জান্তার হাত থেকে বাঁচার জন্য তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প নেই।