Advertisement Banner

হরমুজ: ভূ-রাজনীতি কেন্দ্রে ওমান, সামনে কঠিন পরীক্ষা

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
হরমুজ: ভূ-রাজনীতি কেন্দ্রে ওমান, সামনে কঠিন পরীক্ষা
অচলাবস্থায় জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে হরমুজ প্রণালিতে। ছবি: রয়টার্স

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে হরমুজ প্রণালি আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ওমানের কৌশলগত অবস্থান এবং তেহরানের সঙ্গে তাদের সুদূরপ্রসারী কূটনীতি এক বড় পরীক্ষায় পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক ওমর আহমাদ গত ১ জুন আন্তর্জাতিক নীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ক্রেডল’-এ এই বিষয়ে এক দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন।

এই নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের ৫ মে ইরান ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ (পিজিএসএ) নামের একটি নতুন সংস্থা গঠনের ঘোষণা দেয়। তেহরানের পক্ষ থেকে এই সংস্থাকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়ন্ত্রণ এবং শুল্ক বা ফি আদায়ের একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হয়, তবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার দীর্ঘদিনের সামরিক হুমকিকে একটি স্থায়ী প্রশাসনিক বাস্তবতায় রূপান্তর করবে। যা তাদের বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল এই বাণিজ্য পথের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ এনে দেবে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই পুরো সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ওমান। ইরান হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনার বিষয়ে ওমানকে তাদের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। যার কারণ মূলত দুটি।

প্রথমত, ওমান দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের এক বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারী দেশ। দ্বিতীয়ত, ওমানের ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা হরমুজ প্রণালির প্রবেশদ্বারের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

ওমান এখানে কেবল দুটি বিবদমান পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানকারী বা আলোচনার আয়োজক দেশ নয়, বরং হরমুজ প্রণালির নিয়মকানুন কে নির্ধারণ করবে, ইরান কতটুকু সেখানে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে পারবে এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ওমানের এই কেন্দ্রীয় ভূমিকা মেনে নেবে কিনা– তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ওমান এক অনিবার্য শক্তি হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এমন কোনো চুক্তি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা মেনে নেবে না– যা এই জলপথে মার্কিন আধিপত্য দুর্বল করে বা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। ফলে ওমান এখন নিজের ভূ-রাজনৈতিক উপযোগিতার কারণেই তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছে।

ওমানকে একসময় ‘মধ্যপ্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ বলা হতো শান্ত ও নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ওমান কেবল আলোচনার নীরব আয়োজক হয়ে থাকতে পারছে না। বরং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও বলপ্রয়োগের নীতির বাইরে গিয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টার কারণে দেশটি বিভিন্ন পরাশক্তির মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

নিবন্ধটিতে ওমানের এই কূটনৈতিক সক্ষমতার পেছনের ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত কারণগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ওমানের এই গুরুত্ব মূলত তৈরি হয়েছে তার ভৌগোলিক অবস্থান, সংযত পররাষ্ট্রনীতি এবং দশকের পর দশক ধরে অর্জন করা পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। ওমান এমন সব দেশের মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করেছে যাদের মধ্যে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, অথবা ইয়েমেনের সানা সরকার ও সৌদি আরব। ইরানের সঙ্গে ওমানের সম্পর্ক বর্তমান ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পত্তনের আগে, অর্থাৎ শাহের আমল থেকেই বিদ্যমান এবং এই সম্পর্ক কোনো ধর্মীয় বা আদর্শিক ভিত্তির ওপর নয়, বরং পারস্পরিক উপকূলরেখা, বাণিজ্য ও অভিন্ন নিরাপত্তার বাস্তবতার ওপর গড়ে উঠেছে।

হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় সব জাহাজকেই ওমান উপসাগরের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী জাহাজ চলাচলের যে নির্ধারিত রুট বা ‘ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম’ রয়েছে, তা ওমানের বহিঃঅঞ্চল মুসান্দাম উপদ্বীপের জলসীমার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই ওমান এই অঞ্চলের প্রতিটি পক্ষ– যথা ইরান, জিসিসি ভুক্ত দেশসমূহ, পাকিস্তান, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় জ্বালানি বাজারের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

জনমত ও গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং ওমানি শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ বিন আওয়াদ আল-মাশিখির বরাত দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, এই সংকটের শিকড় অনেক গভীরে। তিনি ১৯৭৪ সালে শাহের আমলে ওমান ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে দুই দেশ হরমুজ প্রণালির দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল।

পরবর্তীতে ওমানের ভূমিকা এই জলপথের যাতায়াত পর্যবেক্ষণ, আঞ্চলিক জলসীমা রক্ষা, সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জাহাজগুলোকে সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়ার মধ্যে বিকশিত হয়। ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে ওমানের উপযোগিতা অত্যন্ত স্পষ্ট, কারণ রিয়াদ বা আবুধাবির মতো ওমান কখনো তেহরানের সাথে সম্পর্ককে ধর্মীয় বা আদর্শিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেনি।

ওমান সবসময় নিজের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করেছে এবং ইরানের ওপর পশ্চিমাদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশলের অংশীদার হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যার ফলে আজ ওমান ইরানের সাথে এমন এক সময়ে কথা বলতে পারছে যখন অন্য কারো সেই সুযোগ নেই। জিসিসির অভ্যন্তরেও ওমান কখনো অন্য দেশের স্বার্থে বিঘ্ন ঘটায়নি, তবে ইরান, ইয়েমেন বা ফিলিস্তিন ইস্যুতে তারা রিয়াদ বা আবুধাবির আক্রমণাত্মক নীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে।

উপসাগরীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল্লাহ বাবদ ‘দ্য ক্রেডল’-কে বলেছেন যে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের বর্তমান অবস্থান মূলত তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ভারসাম্যমূলক কৌশলেরই অংশ। ওমান এখানে একই সাথে তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কার্যকারিতা ও নৌচলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখা। দ্বিতীয়ত, ইরানের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক রক্ষা করা এবং যেকোনো ধরনের যুদ্ধ বা উত্তেজনা এড়ানো। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা পরাশক্তি ও অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সরাসরি কোনো সংঘাতে না জড়ানো।

তবে মাস্কটের জন্য সমস্যা হলো, হরমুজ প্রণালি ইস্যুটি যতই রাজনৈতিকীকরণ হচ্ছে, এই তিনটি বিপরীতমুখী লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন-ইরান ট্র্যাক কূটনীতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়্যিদ বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি ২০২৬ সালের আলোচনা প্রক্রিয়ায় তেহরানের কাছ থেকে একটি বড় পারমাণবিক ছাড় আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও বর্তমান যুদ্ধের পর সেই সমঝোতা আবার বাঁচিয়ে তোলা যাবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে এটি প্রমাণ করে যে ইরান ওমানকে কতটা গুরুত্ব দেয়।

তেহরানের দৃষ্টিতে ওমান এমন এক প্রতিবেশী যে বহু সংকটের মধ্যেও সম্পর্ক বজায় রেখেছে, ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিতে যোগ দেয়নি এবং সবসময় বলে এসেছে যে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বাইরের কোনো শক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। আর ওয়াশিংটনের জন্য ওমানের এই স্বাধীনচেতা নীতি ক্রমেই অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ওমান যখন মার্কিন-ইসরায়েলি স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ার সাথে নিজের মধ্যস্থতার ভূমিকাকে মেলাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

নিবন্ধে উত্থাপিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, ওমান কি কেবল হরমুজ প্রণালির নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে? নাকি তারা ইরানের সাথে শুল্ক আদায় ও নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওমানি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য এখনো অত্যন্ত সতর্ক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে ‘নিরাপদ ও টেকসই’ নৌচলাচল এবং উত্তেজনা হ্রাসের কথা বলছেন। অন্যদিকে তেহরানের ভাষা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও নিয়ন্ত্রণমূলক। জননীতি বিশ্লেষক আহমেদ আল-মুখাইনি এই বিষয়ে বলেছেন যে, ওমান হরমুজ প্রণালিকে কোনো ‘দরকষাকষির ঘুঁটি’ হিসেবে দেখে না। বরং একে সার্বভৌমত্বের একটি কাজ এবং এই কৌশলগত ধমনীকে সচল রাখার একটি দায়িত্ব মনে করে।

ওমানে পৌঁছানোর পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে স্বাগত জানান দেশটির কর্মকর্তারা। ছবি: রয়টার্স
ওমানে পৌঁছানোর পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে স্বাগত জানান দেশটির কর্মকর্তারা। ছবি: রয়টার্স

ওমানের মূল লক্ষ্য হলো নৌচলাচল উন্মুক্ত, আইনসম্মত ও অনুমানযোগ্য রাখা এবং এই প্রণালিকে কোনো যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হতে না দেওয়া। ড. বাবদ উল্লেখ করেছেন যে, ওমান ও ইরানের সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো মূলত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৌচলাচলের স্বাধীনতার নীতিগুলো পরিচালনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, কোনো একক বা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। মুখাইনি আরও যোগ করেন যে, ইরানের সাথে ওমানের এই যোগাযোগ কোনো আদর্শিক মিল থেকে নয়, বরং ভূগোলের অনিবার্যতার কারণে। ইরান হলো এক সংকীর্ণ জলপথের ওপারের প্রতিবেশী। তাই তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং ওমানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি।

তবে এই ইরান-মুখী কূটনীতি ওমানকে জিসিসির প্রতিশ্রুতি থেকে দূরে সরিয়ে নেয়নি, বরং ওমান তার জিসিসি প্রতিবেশীদের এই বার্তা দিচ্ছে যে তারা তেহরানের প্রক্সি বা প্রতিনিধি না হয়েও সরাসরি ও স্পষ্টভাবে কথা বলতে সক্ষম এবং রিয়াদ বা আবুধাবিকে আশ্বস্ত করতে পারে যে তারা কোনো সংঘাতমূলক ব্লগের অংশ হচ্ছে না। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও পাকিস্তান প্রত্যেকেই এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।

ড. মাশিখি জানান, বর্তমান সংকটের সময়েও ওমান সৌদি আরব এবং কুয়েতের সাথে তাদের জলসীমা দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে সমন্বয় করেছে এবং ওমান এই জলপথের নিরাপত্তা বজায় রাখার সমস্ত ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতি একা বহন করতে চায় না। এর অর্থ এই নয় যে রিয়াদ বা ইসলামাবাদ ইরানের শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা মেনে নেবে, তবে ওমানি কূটনীতি মার্কিন-ইরান সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে তাদের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। মুখাইনির মতে ওমানের নীতির মূল ভিত্তি হলো– নিরপেক্ষতা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়, ভারসাম্য মানে অস্পষ্টতা নয় এবং সংলাপ মানে কারও পক্ষে চলে যাওয়া নয়।

এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই গত ২৭ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে এক নজিরবিহীন হুমকি দেন, যা ওমানের সমালোচকদেরও স্তব্ধ করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালির আলোচনায় ওমানের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্রাম্প হুশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, ওমানকে অন্য সবার মতোই আচরণ করতে হবে, অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘উড়িয়ে দিতে’ (ব্লো আপ) বাধ্য হবে।

এই মন্তব্যকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ওমানের মধ্যস্থতার প্রতি ওয়াশিংটনের ধৈর্যচ্যুতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ট্রাম্পের এই হুমকিকে ‘বিপজ্জনক’ এবং ‘দাদাগিরি’ হিসেবে নিন্দা করেছেন। এবং বলেছেন যে জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপে ওমানের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্বেগ কেবল শুল্ক আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওয়াশিংটন এমন যেকোনো আঞ্চলিক সমাধানকে রুখে দিতে চায় যা এই জলপথে তাদের একচ্ছত্র পুলিশি ক্ষমতাকে দুর্বল করে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো ভবিষ্যৎ নিরাপত্তামূলক চুক্তিকে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের শর্তের সাথে জুড়ে দিতে চায়।

কিন্তু ওমানের পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবে আরব শান্তি উদ্যোগ, ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষা এবং ইসরায়েলের স্বীকৃতিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার শর্ত হিসেবে না মানার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ওমানি বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ আল-আসামি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন যে, ট্রাম্পের এই ক্ষোভের আসল কারণ শুল্ক নয়, বরং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বা ইসরায়েলের সাথে চুক্তি নিয়ে ওমানের অবিচল ও আপসহীন অবস্থান।

ইয়েমেনের পরিস্থিতিও ওমানের এই নীতিকে প্রভাবিত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত এবং বর্তমানে বিলুপ্ত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ (এসটিসি)-এর ইসরায়েল-বান্ধব নীতি এবং ওমানের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি ওমানকে আরও সতর্ক করে তুলেছে।

নিবন্ধের শেষ অংশে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ভূমিকার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ওমান ও ইরানের যেকোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বা স্বীকৃত ভূমিকা আবুধাবিকে চরম অস্বস্তিতে ফেলবে।

আরব আমিরাত গত কয়েক বছর ধরে নিজেকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিক, ফাইন্যান্স এবং শিপিং সাম্রাজ্য হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে এবং ইয়েমেন থেকে হর্ন অব আফ্রিকা পর্যন্ত বিভিন্ন বন্দর ও দ্বীপের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। হরমুজ প্রণালিতে ওমান ও ইরানের যৌথ ভূমিকা এই আমিরাতি সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল ধমনীর ওপর একটি বড় কৌশলগত আঘাত।

ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে ওমানের মুসান্দাম এলাকা আরব আমিরাতকে হরমুজ প্রণালির প্রবেশদ্বারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আবুধাবি যত বড় বন্দর বা পাইপলাইনই তৈরি করুক না কেন, তারা ওমানের এই প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক সুবিধাকে স্থানান্তরিত করতে পারবে না।

এমনকি হরমুজ প্রণালিকে এড়ানোর জন্য নির্মিত আমিরাতের ‘হাবশান-ফুজাইরাহ’ পাইপলাইনও তাদের ওমানের জলসীমা থেকে মুক্ত করতে পারে না। কারণ ফুজাইরাহ থেকে বের হওয়া জাহাজগুলোকেও ওমান উপসাগরের মধ্য দিয়ে যেতে হয় যেখানে ওমানের নৌবাহিনীর সিদ্ধান্ত ও বন্দরের বড় ভূমিকা রয়েছে। তদুপরি, জাতিসংঘের সমুদ্র আইন চুক্তির ২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক জলসীমায় সাধারণ যাতায়াতের জন্য কোনো ধরনের শুল্ক বা ফি আদায় নিষিদ্ধ, যদি না কোনো বিশেষ সেবা দেওয়া হয়। ওমান এই চুক্তি অনুস্বাক্ষর করলেও ইরান বা আমিরাত তা করেনি, যা ওমানকে কোনো ধরনের জোরপূর্বক শুল্ক আদায়ের ব্যবস্থাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করা থেকে বিরত রাখছে।

ড. বাবদ মনে করেন, ওমান-ইরান সম্পর্কের কারণে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ছড়াতে পারে আমিরাতের সাথে। কারণ আবুধাবি মনে করে ওমান এখানে ইরানকে অতিরিক্ত সুবিধা দিচ্ছে। তবে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ওমানের এই কূটনীতি রিয়াদের বর্তমান তেহরান-বিরোধী উত্তেজনা কমানোর নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যতক্ষণ না ইরান এই অঞ্চলের একক দ্বাররক্ষক হয়ে উঠছে। কাতারও ওমানের এই নীতিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।

নিবন্ধের শেষে ওমর আহমাদ এই সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে, হরমুজ প্রণালি এখন আর কেবল জাহাজ চলাচলের পথ নয়, বরং এটি একটি বড় পরীক্ষা যে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো নিজেরা লিখবে, নাকি বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে। ওমান সামরিক সংঘাত এড়িয়ে, তেহরানের সাথে সংলাপ বজায় রেখে এবং নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা করে এই মহাবিপদের মধ্যেও মাঝখানে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

সম্পর্কিত