২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দেন ব্রিকসের কোনো সদস্য যদি মার্কিন ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করে, তবে তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে রিও ডি জেনিরোতে যখন ব্রিকস সম্মেলন চলছিল, ট্রাম্প তখন ঘোষণা করেন, যেসব দেশ ব্রিকসের ‘আমেরিকাবিরোধী নীতি’র সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করবে তাদের পণ্যের ওপরও অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। তবে ট্রাম্পের এই চাপের ফল হিতে বিপরীত হতে পারে। বিকল্প বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর আগ্রহ আরও তীব্র হতে পারে দেশগুলোর মধ্যে।
২০২৫ সালের আগস্ট মাসে চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাক্ষাৎ করেন এবং ঘোষণা দেন যে নয়াদিল্লি ও বেইজিং প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার। এই ঘোষণা ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে আরেকটি চপেটাঘাত।
ট্রাম্পের আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় আগামী বছরগুলোতে উদীয়মান শক্তি ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হতে থাকবে। তবে সেই সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে, আমেরিকাকে বাদ দিয়ে অন্য দেশগুলো কি বৈশ্বিক সহযোগিতা ও মুক্ত বাণিজ্য সফলভাবে রক্ষা করতে পারবে?
প্রতীকী ছবিএক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেবে। অনিবার্যভাবেই বেইজিং ওয়াশিংটনের ক্ষতির বিনিময়ে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করবে। তবে চীন যদি প্রজ্ঞা ও সংযমের সঙ্গে কাজ করে, তাহলে এর ফলাফল হবে শক্তিশালী বৈশ্বিক সহযোগিতা, যেখানে চীনের প্রভাব হবে শক্তিশালী।
এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল বহুদিন থেকে। ভবিষ্যতে এই অঞ্চল ‘ওয়ার্ল্ড মাইনাস ওয়ান’ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে দুটি বাণিজ্য চুক্তি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে: আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (RCEP) এবং চীন-আসিয়ান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (CAFTA)।
১৫ সদস্যবিশিষ্ট RCEP প্রথম কার্যকর হয় ২০২২ সালে, বর্তমানে জিডিপি ও জনসংখ্যা–উভয় দিক থেকেই বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক জোট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে একত্রিত করে এই জোটটি বর্তমানে বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। RCEP-এর লক্ষ্য ২০ বছরের মধ্যে জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে প্রায় ৯০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা এবং ই-কমার্স ও মেধাস্বত্বের মতো ক্ষেত্রে অভিন্ন নিয়ম প্রণয়ন করা।
CAFTA ২০১০ সালে কার্যকর হয়েছিল এবং ২০১৫ ও ২০২৫ সালে হালনাগাদ করা হয়। সবুজ অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খল সংযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন ও আসিয়ানের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করছে এই চুক্তি। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, বেইজিংয়ের জন্য একটি স্পষ্ট কৌশলগত সাফল্য এই চুক্তি, বিশেষত ওয়াশিংটন যখন আসিয়ান দেশগুলোর ওপর চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আসিয়ান দেশগুলো কখনোই পুরোপুরি ওয়াশিংটনের পক্ষ নেবে না। বরং তারা ইতোমধ্যেই CAFTA চুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ এগিয়ে নিচ্ছে এবং চীনের প্রভাব নিজেদের মতো করে মোকাবিলা করছে। এই অঞ্চলে চীনের আচরণ নমনীয়। আসিয়ান দেশগুলোর চাপের কারণেই বেইজিং তার অর্থনৈতিক লাভ সীমিত করেছে এবং উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক ব্যবস্থার অনুকূল সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছে।
প্রতীকী ছবিইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ, ‘ওয়ার্ল্ড মাইনাস ওয়ান’-এর কল্পনায় যার ভূমিকা নিতান্ত নগণ্য হবে না। ২০২১ সালে ইইউ ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ চালু করে– অবকাঠামো, জ্বালানি ও জলবায়ু সুরক্ষা প্রকল্পকে একত্রিত করে বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব মোকাবিলার উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এই প্রকল্পের আওতায় পূর্ব আফ্রিকায় খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইইউ বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করছে, যার লক্ষ্য অধিকাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
ইউরোপ ও চীন দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার মতো অঞ্চলে এমনভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কের বদলে পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে। যেমন আফ্রিকা মহাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ উদ্যোগে সমন্বয় করতে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। তবে এখানে মনে রাখা দরকার, ইউরোপ বা চীন নিজে থেকে একত্রে কাজে আগ্রহ দেখায়নি, বরং আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার নেতারা এমন সহযোগিতার দাবি জানাচ্ছেন বলেই এটি সম্ভব হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের অনুপস্থিতিতে বিশ্ব কতটা কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারবে, তা নির্ধারণে ভারতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ট্রাম্পের চাপের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি নয়াদিল্লি দ্রুতই নিজেদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে আসিয়ান ও জাপানের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি জোরদার করার আলোচনা এবং ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তি। এছাড়া ২০২৪ সালে ভারত ইউরোপীয় ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার সদস্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশ আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড।
চীনের মতো ভারতও রাশিয়ার সঙ্গে তাদের অধিকাংশ বাণিজ্য পরিচালনা করে জাতীয় মুদ্রায়। রাশিয়া ভারতের অস্ত্র আমদানির ৩৬ শতাংশ সরবরাহ করে। ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলেও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রতি নয়াদিল্লির এই অঙ্গীকার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের প্রভাবই খর্ব করবে।
(প্রখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত নিবন্ধ অনুসারে)