টাকা দিয়ে ভোট কেনা, রাতের ভোট–একই বৃত্তে বাংলাদেশ?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
টাকা দিয়ে ভোট কেনা, রাতের ভোট–একই বৃত্তে বাংলাদেশ?
ফাইল ছবি: চরচা

সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ৭৪ লাখ টাকাসহ জামায়াত নেতা আটক, কিংবা রাজধানীর সূত্রাপুরে টাকা বিলির সময় দলটির আরেক নেতার গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড, এমনকি কেন্দ্রে প্রবেশ-চেষ্টার অভিযোগও এসেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই এ ধরনের অভিযোগ ও প্রমাণসহ আটকও করা হচ্ছে। অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গেই জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতার পাওয়া যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে–টাকা দিয়ে ভোট কেনা কিংবা রাতের ভোটের সংস্কৃতি থেকে কি বাংলাদেশ বের হতে পারছে না?

ভোটারদের টাকা দেওয়ার অভিযোগে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর থানা জামায়াতের নায়েবে আমির মো. হাবিবকে গ্রেপ্তার করা হয় আজ বুধবার রাতে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে দুদিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মতিউর রহমান বলেন, সূত্রাপুর কমিউনিটি সেন্টার ভোটকেন্দ্রের সামনে থেকে তাকে আটক করা হয়। হাবিবের কাছে নগদ টাকা পাওয়া গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে মো. হাবিব দাবি করেছেন, তিনি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পোলিং এজেন্টদের ‘চা-নাস্তার খরচ’ বাবদ খামে করে ৫০০ টাকা করে দিচ্ছিলেন। তবে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে দণ্ডিত করা হয়েছে।

সৈয়দপুরের কথা আগেই বলা হয়েছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরে জামায়াতের জেলা আমিরকে আটক করার ঘটনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যম পুরো দিনই ছিল সরব। তবে এ ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ ঘটনায় তারা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে ব্যাখ্যা এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দাবি করেছে।

দলটির অভিযোগ, নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এভাবে নেতাকে জড়ানোর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।

সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে ঠাকুরগাঁও জেলার জামায়াত আমিরকে ৭৪ লাখ টাকাসহ আটক করা হয়। নীলফামারীর পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বুধবার দুপুরে সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন। পুলিশ জানিয়েছে, আটক নেতার নাম বেলাল উদ্দিন প্রধান। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির।

পরে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, এ টাকা ছিল ওই নেতার ব্যবসায়িক কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।

এর আগে শরীয়তপুরের নড়িয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা ও একটি ল্যাপটপসহ স্থানীয় এক জামায়াত নেতাকে আটক করা হয়। বার্তা সংস্থা ইউএনবির এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা যায়।

ইউএনবি বলছে, বুধবার বিকেলে নড়িয়া পৌরসভার বৈশাখীপাড়া এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। এ সময় ওই বাড়ি থেকে নগদ প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও একটি ল্যাপটপ, ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। অভিযানে মাস্টার গোলাম মোস্তফা নামে স্থানীয় এক জামায়াত নেতাকে আটক করা হয়।

এর আগে কুমিল্লার মুরাদনগরে ভোটারদের মাঝে টাকা বিতরণের অভিযোগে হাবিবুর রহমান হেলালী নামে এক জামায়াত নেতাকে আটক করেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে থানায় নিয়ে যান। এ সময় তার কাছ থেকে নগদ ২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তবে স্থানীয় জামায়াত নেতারা দাবি করছেন, এটি ষড়যন্ত্র।

এদিকে লক্ষ্মীপুরে বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও ধানের শীষের প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নির্বাচনী গাড়ি থেকে ৮০ লাখ টাকাসহ তাকে আটকের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। বুধবার শহরের ঝুমুর এলাকায় সেনাবাহিনীর তল্লাশির পর এই গুজব রটে। এ নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও পরে তা সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এ্যানি এক ভিডিও বার্তায় বিষয়টিকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ বলে দাবি করেন।

ভিডিও বার্তায় এ্যানি বলেন, “আমি লক্ষ্মীপুরে নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত রয়েছি। এরই মধ্যে শুনতে পেলাম যে, আমার নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত গাড়ি চেক করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি হলো, আমার নির্বাচনী এজেন্ট সেই গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে যাচ্ছিলেন।’

টাকার উৎস ও ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “সেখানে আমার নির্বাচনী ব্যয়ের ১৫ লাখ টাকা ছিল, যা কেন্দ্রভিত্তিক (সেন্টার ওয়াইজ) খরচের জন্য পাঠানো হচ্ছিল। কর্তৃপক্ষ সেটা চেক করেছেন এবং আদালত থেকে ইতিমধ্যেই সেটা রিলিজও (ফেরত) দিয়েছেন। আদালত নিশ্চিত হয়েছে যে, এটি কেন্দ্র ফি বাবদ ব্যবহারের জন্য ছিল।”

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ এর বাইরে থেকেও আসছে। বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার, হুমকি-ধমকি দেওয়া, ভোটারদের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ আসছে নানা তরফ থেকেই। আর ভোটের আগের দিনও রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের সামনে প্রার্থীদের ব্যানার–ফেস্টুন ঝুলতে দেখা গেছে–যা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনার পুরোপুরি লঙ্ঘন।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে দেশব্যাপী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২৬ এর ভোটগ্রহণ শুরু হবে। কিন্তু প্রচার বন্ধের ৪৮ ঘণ্টার নিয়ম কার্যকর না হওয়ায় নির্বাচন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইসির বিধি অনুযায়ী, ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের প্রচার নিষিদ্ধ। ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে ব্যানার, পোস্টার, ক্যাম্প বা বুথ স্থাপন নিষিদ্ধ। কিন্তু বুধবার সরেজমিনে ঢাকার একাধিক আসনে প্রচারসামগ্রী আগের মতোই ঝুলতে দেখা যায়।

ঢাকা-১৭ আসনের ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি কেন্দ্রের গেট, দেয়াল ও আশপাশে এখনো ঝুলছে বিএনপির প্রার্থী তারেক রহমান, জামায়াতের প্রার্থী এসএম খালিদুজ্জানসহ বিভিন্ন প্রার্থীর ফেস্টুন-ব্যানার।

একইসাথে ঢাকা-১২ আসনের তেজগাঁও মডেল হাই স্কুল, বটমূল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং মগবাজার ইস্পাহানি স্কুল কেন্দ্রের সামনেও একই চিত্র–ফুটবল প্রতীকের সাইফুল আলম নীরব, কোদাল প্রতীকের সাইফুল হক এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সাইফুল ইসলাম মিলনসহ বহু প্রার্থীর প্রচারসামগ্রী এখনো অপসারণ করা হয়নি।

সব মিলিয়ে কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এ নির্বাচন নিয়ে যে আশা ছিল–তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে জনমনে। বিশ্লেষকেরাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংকট কেটে যাবে বলে যে আশা ছিল, তা যে অনেকটাই অপূর্ণ, তা এখন স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিক থেকে বিশ্লেষক সবাই নির্বাচন কমিশনের দিকে আঙুল তুলছেন। আর নির্বাচন কমিশন এখনো আশ্বস্ত করছে।

সম্পর্কিত