ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বিজয়ী আসলে কে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বিজয়ী আসলে কে?
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধে চীন জড়িয়ে পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির ধোঁয়াশাকে বলে ‘ফগ অব ওয়ার’। এটি অনেক সময় সংঘাত চলাকালীন প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন করে তোলে। কখনো কখনো যুদ্ধের দামামা থেমে যাওয়ার অনেক পরেও সেই অস্পষ্টতা থেকে যায়।

গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সেই খণ্ডযুদ্ধের ক্ষেত্রেও ঠিক এমন ‘ফগ অব ওয়ার’ তৈরি হয়।

দ্য ইকোনোমিস্টের এক প্রতিবেদক সম্প্রতি ভারতের সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘অপারেশন সিঁদুর’ (ভারত এই সংঘাতের যে নাম দিয়েছিল) থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তবে অবাক করা বিষয় হলো, ভারত এই সংঘাত থেকে যা শিক্ষা নিয়েছে, পাকিস্তান আবার এই জায়গায় তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

আর এই যে দুইপক্ষের এই বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে পুনরায় সংঘাত শুরু হলে বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেভ

গত বছরের এই সংকটের সূত্রপাত ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ২৬ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার সময়। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পর, ৭ মে ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৯টি স্থানে বিমান হামলা চালায়। এই লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবের বেশ কিছু এলাকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ভারতের এই পদক্ষেপ ছিল ২০১৯ সালের সংকটের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। সে সময় ভারত কেবল একটি স্থানে আঘাত হেনেছিল।

এরপর দুই পক্ষই একে অপরের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যা শেষ পর্যন্ত ১০ মে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাধ্যমে শান্ত হয়।

এই সংঘাতের শেষে উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করেছে। তবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারত এবার তাদের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুগুলোর সবকটিতেই আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে (উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের অভিযানে ভারত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়)। ১০ মে ভারতের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ‘জটিল ও উদ্ভাবনী আক্রমণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ইউনিভার্সিটি অব অ্যালবানির বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি। তার মতে, ভারতের এই আক্রমণ পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অনেকাংশেই পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছিল।

অন্যদিকে ক্ল্যারি বলেন, ওইদিন পাকিস্তানের ছোড়া অনেকগুলো অথবা সম্ভবত সবকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই হয় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে নয়তো মাঝপথে আটকে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে পাকিস্তানের হামলার ফলে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ না পাওয়া যাওয়াই এই দাবির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

এত কিছুর পরেও পাকিস্তান যুক্তিযুক্তভাবেই দাবি করতে পারে, তারা ভারতকে চড়া মূল্য দিতে বাধ্য করেছে। সংঘাতের প্রথম দিন অর্থাৎ ৭ মে, পাকিস্তান ভারতের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে—যার সংখ্যা সম্ভবত ছিল পাঁচটি। তবে সামরিক পরাজয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিজয় ছিনিয়ে আনা ছিল আরও বড় ঘটনা।

সংকট নিরসনে দুই দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে দাবি বারবার করে আসছেন, তাতে ভারত এখনো ক্ষুব্ধ। এ ছাড়া ট্রাম্প যেভাবে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, তা-ও ভারতকে ব্যথিত করেছে। উল্লেখ্য যে, এই সংঘাতের পরপরই আসিম মুনির নিজেকে ‘ফিল্ড মার্শাল’ পদে উন্নীত করেন, দেশে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেন এবং অত্যন্ত চতুরতার সাথে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ট্রাম্পের নাম প্রস্তাব করেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক। ছবি: বাংলাদেশ সরকারের প্রেস উইং
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক। ছবি: বাংলাদেশ সরকারের প্রেস উইং

ভারতীয় কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে তাদের দাবি, এই সংঘাতের সীমা কতটুকু হতে পারে, সে বিষয়ে তাদের স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে। একজন কর্মকর্তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভারতের একটি সুনির্দিষ্ট ‘এস্কেলেশন ম্যাট্রিক্স’ রয়েছে, এর মাধ্যমে তারা সংঘাতের মাত্রা কেমন হতে পারে সে বিষয়ে ছক কষে ফেলেছে। সেখানে বিস্তারিত উল্লেখ করা আছে যে, কোনো ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানলে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে এবং কোন পদক্ষেপটি বিপদসীমা অতিক্রম করবে।

অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, ওই কয়েক দিনের লড়াই থেকে ভারত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে। আর তা হলো, প্রথাগত যুদ্ধ এবং পারমাণবিক যুদ্ধের মাঝামাঝিতে একটা অনেকটা জায়গা বা সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, পারমাণবিক পর্যায়ে না গিয়েও সামরিক শক্তির লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট সুযোগ আছে বলে তারা মনে করছেন।

অবশ্যই, এর কিছু অংশ নিছক বীরত্ব প্রদর্শন বা বাহাদুরিও হতে পারে। যেকোনো যুদ্ধে প্রতিটি পক্ষই নিজেদের সাফল্যকে বড় করে এবং ক্ষয়ক্ষতিকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে রাখা। কিন্তু মে মাসের এই খণ্ডযুদ্ধ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের ধারণার মধ্যে যে পার্থক্য, তা রীতিমতো আকাশপাতাল।

পাকিস্তান হয়তো এই ধারণা নিয়ে ফিরেছে যে, পরবর্তী যেকোনো সংঘাতে ভারতই প্রথম পিছু হটবে, আমেরিকা দ্রুত মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে আসবে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনীতি আবারও পাকিস্তানের পক্ষেই যাবে। অন্যদিকে, ভারতের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ১০ মে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এবং ভারতের উচিত ছিল আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া। এই দুই দেশের বিপরীতমুখী অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পরবর্তী লড়াইটি হতে পারে আরও বেশি অনিশ্চিত এবং অনেক বেশি বিপজ্জনক।

(লেখাটি দ্য ইকোনোমিস্ট থেকে অনুবাদ করে প্রকাশিত)

সম্পর্কিত