রাশিয়া-চীন সম্পর্ক: ‘জুনিয়র পার্টনার’ তত্ত্ব কি ভেঙে পড়ছে?
চরচা ডেস্ক
রাশিয়া-চীন সম্পর্ক: ‘জুনিয়র পার্টনার’ তত্ত্ব কি ভেঙে পড়ছে?
চরচা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ১৮: ৫৩
পুতিন ও চিনপিং। ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে এক ধরনের অসম জোট হিসেবে তুলে ধরেছে। বলা হয়েছে, এই সম্পর্কে চীনই মূল শক্তি। রাশিয়া শুধু জ্বালানি, গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহকারী। অর্থাৎ, মস্কো হলো ‘জুনিয়র পার্টনার’।
কিন্তু বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি সেই পুরোনো ধারণাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেক্সেই মার্তিনোভ রুশ গণমাধ্যম আরটি ডট কমে লেখা সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলেছেন, রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক এখন আর শুধু বাণিজ্যিক নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত কৌশলগত জোটে রূপ নিচ্ছে। এই জোটের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি অর্থনীতি নয়, বরং ভূ-রাজনীতি।
পশ্চিমা চাপই দুই দেশকে কাছাকাছি এনেছে
ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস দীর্ঘদিন ধরে মনে করেছে, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই অবিশ্বাস রয়েছে। তাই চাপ বাড়ালে এই সম্পর্ক দুর্বল হবে। বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক যুদ্ধ–সব মিলিয়ে দুই দেশ আরও কাছাকাছি এসেছে।
বাস্তবতা অন্য কথা বলছিল। চীন বুঝতে পারে, পশ্চিমা চাপ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপদ সরবরাহ লাইন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। সেই জায়গায় রাশিয়ার বিকল্প নেই।
চীনের বিশ্লেষকেরাও এখন বলছেন, বাহ্যিক চাপই এই অংশীদারত্বের মূল ভিত্তি। কারণ খুব সহজ। রাশিয়ার দরকার বড় বাজার। চীনের দরকার নিরাপদ জ্বালানি ও কাঁচামাল। দুই দেশ একে অপরের ঘাটতি পূরণ করছে।
রাশিয়া এখন চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় ভিত্তি
২০২৪ সালের শেষ দিকে রাশিয়া চীনের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়। শুধু তেল নয়। নিকেল, তামা, অ্যালুমিনিয়াম, ধাতব আকরিক–সব ক্ষেত্রেই রাশিয়ার রপ্তানি দ্রুত বেড়েছে। কৃষিতেও একই চিত্র।
চীন ও রাশিয়া ১২ বছরের একটি বড় শস্য চুক্তি করেছে। এর আওতায় রাশিয়া চীনকে ৭০ মিলিয়ন টন শস্য ও তৈলবীজ সরবরাহ করবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবহন পথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহন হরমুজ প্রণালির মতো ঝুঁকিপূর্ণ রুটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রাশিয়ার পাইপলাইন স্থলপথে। এগুলো নৌ অবরোধ বা সামুদ্রিক সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ে না। ফলে চীনের কাছে রাশিয়া এখন শুধু সরবরাহকারী নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ।
বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি এখনো মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লেই চীনের উদ্বেগ বাড়ে।
কারণ চীনের আমদানিকৃত তেলের বড় অংশ ওই অঞ্চল থেকে আসে। এই অবস্থায় রাশিয়ার স্থলপথভিত্তিক জ্বালানি নেটওয়ার্ক বেইজিংয়ের কাছে ‘বিকল্প’ নয়, বরং ‘অপরিহার্য’ হয়ে উঠছে। এখানেই মার্কিন কৌশলের সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। ওয়াশিংটন চেয়েছিল, নিষেধাজ্ঞার চাপ দিয়ে চীনকে রাশিয়া থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। কিন্তু বাস্তবে চীন বুঝেছে, রাশিয়াকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা তার নিজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা কাজ করলেও স্থায়ী হয়নি
২০২৩ ও ২০২৪ সালে মার্কিন চাপের কারণে কিছু বড় চীনা ব্যাংক রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন কমিয়ে দেয়। কিছু জ্বালানি কোম্পানিও সতর্ক হয়। চীনের কিছু বন্দর রাশিয়ার নিষিদ্ধ জাহাজ প্রবেশে বাধা দেয়। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা তখন মনে করেছিলেন, বেইজিং ধীরে ধীরে মস্কো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু সেই মূল্যায়ন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কারণ বাস্তবতা অন্য কথা বলছিল। চীন বুঝতে পারে, পশ্চিমা চাপ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপদ সরবরাহ লাইন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। সেই জায়গায় রাশিয়ার বিকল্প নেই।
প্রতীকী ছবি
সম্পর্কের ভেতরে বাস্তববাদও আছে
রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে অনেক সময় ‘সীমাহীন অংশীদারত্ব’ বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে সম্পর্কটি পুরোপুরি আবেগনির্ভর নয়। চীন খুব হিসাব করে এগোয়। তারা রাশিয়ার বাজারে পশ্চিমা কোম্পানির শূন্যস্থান পূরণ করেছে। সুযোগ নিয়েছে, লাভও করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও বিবেচনা করেছে।
তাই বেইজিং এখনো পুরোপুরি নিজেকে রাশিয়ার সঙ্গে বেঁধে ফেলেনি। এটি কৌশলগত সতর্কতা। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সেই সতর্কতারও সীমা আছে। কারণ ভূগোল বদলানো যায় না।
দুই দেশের শক্তি ভিন্ন, কিন্তু পরিপূরক
রাশিয়ার আছে বিপুল জ্বালানি, খনিজ, কৃষি সম্পদ ও নিরাপদ ভূখণ্ড। চীনের আছে বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা, প্রযুক্তি, পুঁজি ও বিশাল বাজার। দুই দেশ আলাদা আলাদা শক্তির অধিকারী। কিন্তু একত্রে তারা একটি বড় কৌশলগত ব্লকে পরিণত হতে পারে। এই কারণেই পশ্চিমা উদ্বেগ বাড়ছে।
বাণিজ্যে ধাক্কা, কিন্তু সম্পর্কে নয়
২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য কিছুটা কমে যায়। মোট বাণিজ্য নেমে আসে প্রায় ২২৮ বিলিয়ন ডলারে। মূল কারণ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া। এছাড়া রাশিয়ার উচ্চ সুদের হার ও দুর্বল ভোক্তা বাজার চীনা রপ্তানিতেও প্রভাব ফেলে। চীনা গাড়ি রপ্তানিও কমে যায়।
তবু এসব সমস্যা সম্পর্কের ভিত্তি নড়াতে পারেনি। বরং দুই দেশ আরও বাস্তববাদী হয়েছে। ‘নর্দার্ন সি রুট’ এখন বড় কৌশলগত প্রকল্প। ২০২৫ সালের বিজয় দিবসে শি জিনপিংয়ের মস্কো সফর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সফরে দুই দেশ যৌথভাবে ‘নর্দার্ন সি রুট’ উন্নয়নের ওপর জোর দেয়। এই রুট ভবিষ্যতে সুয়েজ খাল বা হরমুজ প্রণালির বিকল্প হতে পারে।
চীনের জন্য এটি শুধু বাণিজ্যিক পথ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ। কারণ বেইজিং এখন বুঝছে, বৈশ্বিক সংঘাতের যুগে নিরাপদ বাণিজ্য রুটই সবচেয়ে বড় শক্তি। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভুল কোথায়? পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখেছেন। তারা ভাবতেন, বড় অর্থনীতি মানেই বড় নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু তারা ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা অবমূল্যায়ন করেছেন।
বাস্তবে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক এখন ‘সমান শক্তির’ সম্পর্ক না হলেও “সমান প্রয়োজনের” সম্পর্কে পরিণত হয়েছে।
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। সামনে কী হতে পারে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন বেইজিংকে ঘিরে। চীন কি সত্যিই রাশিয়াকে পূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করবে? নাকি শুধু সম্পদ সরবরাহকারী হিসেবেই দেখবে?
এই সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো ইউরেশিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করবে। একটি বিষয় অবশ্য এখন পরিষ্কার, মার্কিন চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক অস্থিরতা রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে দুর্বল করার বদলে আরও গভীর করেছে। আর এ কারণেই বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
পুতিন ও চিনপিং। ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে এক ধরনের অসম জোট হিসেবে তুলে ধরেছে। বলা হয়েছে, এই সম্পর্কে চীনই মূল শক্তি। রাশিয়া শুধু জ্বালানি, গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহকারী। অর্থাৎ, মস্কো হলো ‘জুনিয়র পার্টনার’।
কিন্তু বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি সেই পুরোনো ধারণাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেক্সেই মার্তিনোভ রুশ গণমাধ্যম আরটি ডট কমে লেখা সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলেছেন, রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক এখন আর শুধু বাণিজ্যিক নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত কৌশলগত জোটে রূপ নিচ্ছে। এই জোটের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি অর্থনীতি নয়, বরং ভূ-রাজনীতি।
পশ্চিমা চাপই দুই দেশকে কাছাকাছি এনেছে
ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস দীর্ঘদিন ধরে মনে করেছে, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই অবিশ্বাস রয়েছে। তাই চাপ বাড়ালে এই সম্পর্ক দুর্বল হবে। বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক যুদ্ধ–সব মিলিয়ে দুই দেশ আরও কাছাকাছি এসেছে।
বাস্তবতা অন্য কথা বলছিল। চীন বুঝতে পারে, পশ্চিমা চাপ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপদ সরবরাহ লাইন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। সেই জায়গায় রাশিয়ার বিকল্প নেই।
চীনের বিশ্লেষকেরাও এখন বলছেন, বাহ্যিক চাপই এই অংশীদারত্বের মূল ভিত্তি। কারণ খুব সহজ। রাশিয়ার দরকার বড় বাজার। চীনের দরকার নিরাপদ জ্বালানি ও কাঁচামাল। দুই দেশ একে অপরের ঘাটতি পূরণ করছে।
রাশিয়া এখন চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় ভিত্তি
২০২৪ সালের শেষ দিকে রাশিয়া চীনের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়। শুধু তেল নয়। নিকেল, তামা, অ্যালুমিনিয়াম, ধাতব আকরিক–সব ক্ষেত্রেই রাশিয়ার রপ্তানি দ্রুত বেড়েছে। কৃষিতেও একই চিত্র।
চীন ও রাশিয়া ১২ বছরের একটি বড় শস্য চুক্তি করেছে। এর আওতায় রাশিয়া চীনকে ৭০ মিলিয়ন টন শস্য ও তৈলবীজ সরবরাহ করবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবহন পথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহন হরমুজ প্রণালির মতো ঝুঁকিপূর্ণ রুটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রাশিয়ার পাইপলাইন স্থলপথে। এগুলো নৌ অবরোধ বা সামুদ্রিক সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ে না। ফলে চীনের কাছে রাশিয়া এখন শুধু সরবরাহকারী নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ।
বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি এখনো মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লেই চীনের উদ্বেগ বাড়ে।
কারণ চীনের আমদানিকৃত তেলের বড় অংশ ওই অঞ্চল থেকে আসে। এই অবস্থায় রাশিয়ার স্থলপথভিত্তিক জ্বালানি নেটওয়ার্ক বেইজিংয়ের কাছে ‘বিকল্প’ নয়, বরং ‘অপরিহার্য’ হয়ে উঠছে। এখানেই মার্কিন কৌশলের সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। ওয়াশিংটন চেয়েছিল, নিষেধাজ্ঞার চাপ দিয়ে চীনকে রাশিয়া থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। কিন্তু বাস্তবে চীন বুঝেছে, রাশিয়াকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা তার নিজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা কাজ করলেও স্থায়ী হয়নি
২০২৩ ও ২০২৪ সালে মার্কিন চাপের কারণে কিছু বড় চীনা ব্যাংক রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন কমিয়ে দেয়। কিছু জ্বালানি কোম্পানিও সতর্ক হয়। চীনের কিছু বন্দর রাশিয়ার নিষিদ্ধ জাহাজ প্রবেশে বাধা দেয়। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা তখন মনে করেছিলেন, বেইজিং ধীরে ধীরে মস্কো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু সেই মূল্যায়ন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কারণ বাস্তবতা অন্য কথা বলছিল। চীন বুঝতে পারে, পশ্চিমা চাপ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপদ সরবরাহ লাইন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। সেই জায়গায় রাশিয়ার বিকল্প নেই।
প্রতীকী ছবি
সম্পর্কের ভেতরে বাস্তববাদও আছে
রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে অনেক সময় ‘সীমাহীন অংশীদারত্ব’ বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে সম্পর্কটি পুরোপুরি আবেগনির্ভর নয়। চীন খুব হিসাব করে এগোয়। তারা রাশিয়ার বাজারে পশ্চিমা কোম্পানির শূন্যস্থান পূরণ করেছে। সুযোগ নিয়েছে, লাভও করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও বিবেচনা করেছে।
তাই বেইজিং এখনো পুরোপুরি নিজেকে রাশিয়ার সঙ্গে বেঁধে ফেলেনি। এটি কৌশলগত সতর্কতা। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সেই সতর্কতারও সীমা আছে। কারণ ভূগোল বদলানো যায় না।
দুই দেশের শক্তি ভিন্ন, কিন্তু পরিপূরক
রাশিয়ার আছে বিপুল জ্বালানি, খনিজ, কৃষি সম্পদ ও নিরাপদ ভূখণ্ড। চীনের আছে বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা, প্রযুক্তি, পুঁজি ও বিশাল বাজার। দুই দেশ আলাদা আলাদা শক্তির অধিকারী। কিন্তু একত্রে তারা একটি বড় কৌশলগত ব্লকে পরিণত হতে পারে। এই কারণেই পশ্চিমা উদ্বেগ বাড়ছে।
বাণিজ্যে ধাক্কা, কিন্তু সম্পর্কে নয়
২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য কিছুটা কমে যায়। মোট বাণিজ্য নেমে আসে প্রায় ২২৮ বিলিয়ন ডলারে। মূল কারণ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া। এছাড়া রাশিয়ার উচ্চ সুদের হার ও দুর্বল ভোক্তা বাজার চীনা রপ্তানিতেও প্রভাব ফেলে। চীনা গাড়ি রপ্তানিও কমে যায়।
তবু এসব সমস্যা সম্পর্কের ভিত্তি নড়াতে পারেনি। বরং দুই দেশ আরও বাস্তববাদী হয়েছে। ‘নর্দার্ন সি রুট’ এখন বড় কৌশলগত প্রকল্প। ২০২৫ সালের বিজয় দিবসে শি জিনপিংয়ের মস্কো সফর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সফরে দুই দেশ যৌথভাবে ‘নর্দার্ন সি রুট’ উন্নয়নের ওপর জোর দেয়। এই রুট ভবিষ্যতে সুয়েজ খাল বা হরমুজ প্রণালির বিকল্প হতে পারে।
চীনের জন্য এটি শুধু বাণিজ্যিক পথ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ। কারণ বেইজিং এখন বুঝছে, বৈশ্বিক সংঘাতের যুগে নিরাপদ বাণিজ্য রুটই সবচেয়ে বড় শক্তি। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভুল কোথায়? পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখেছেন। তারা ভাবতেন, বড় অর্থনীতি মানেই বড় নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু তারা ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা অবমূল্যায়ন করেছেন।
বাস্তবে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক এখন ‘সমান শক্তির’ সম্পর্ক না হলেও “সমান প্রয়োজনের” সম্পর্কে পরিণত হয়েছে।
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। সামনে কী হতে পারে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন বেইজিংকে ঘিরে। চীন কি সত্যিই রাশিয়াকে পূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করবে? নাকি শুধু সম্পদ সরবরাহকারী হিসেবেই দেখবে?
এই সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো ইউরেশিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করবে। একটি বিষয় অবশ্য এখন পরিষ্কার, মার্কিন চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক অস্থিরতা রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে দুর্বল করার বদলে আরও গভীর করেছে। আর এ কারণেই বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।